EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ২০২৬

কীভাবে মাত্র দুই শটে ২ গোল করল স্পেন, ফ্রান্সের ১৪ শট কেন হল ব্যর্থ?

পরিসংখ্যানে পিছিয়ে থেকেও ২-০ গোলে জিতে ১৬ বছর পর ফাইনালে স্পেন; পেদ্রো পোরো-ওয়ারজাবালের গোলে হতাশ কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

কীভাবে মাত্র দুই শটে ২ গোল করল স্পেন, ফ্রান্সের ১৪ শট কেন হল ব্যর্থ?

পেনাল্টি থেকে গোল স্পেনের। ম্যাচের ২২ মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের নেওয়া স্পট-কিক ঠেকাতে ব্যর্থ হন ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনান। ১৪ জুলাই, ২০২৬, ডালাস স্টেডিয়াম, আরলিংটন, টেক্সাস। ছবি: এপি

অ অ

টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে বল দখলে খুব বেশি এগিয়ে ছিল না কেউই। শটের সংখ্যায় বরং ফ্রান্সই ছিল স্পষ্ট এগিয়ে— ১৪টি শট, যেখানে স্পেনের পায়ে বল গিয়েছে মাত্র ১০ বার। তবু ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা রইল স্পেন ২, ফ্রান্স ০। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক— মাত্র দুটি শট লক্ষ্যে রেখে কীভাবে দুটোই গোলে পরিণত করল স্পেন, আর ফ্রান্সের ১৪ শটের ভিড়ে কেন একবারও কাঁপল না উনাই সিমোনের জাল?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে দুই কোচের দর্শনের সংঘর্ষে। দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বারবার, কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন খেলেছে হিসেবি, নিখুঁত ও নির্মম দক্ষতায়— যেখানে প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর মানসিকতাই হয়ে উঠেছিল ম্যাচের নির্ধারক শক্তি।

সংখ্যার বিচারে ফ্রান্স ছিল অনেকটাই এগিয়ে। ৯০ মিনিটে তারা শট নিয়েছে ১৪টি, স্পেনের বিপরীতে যা ১০টি। অন-টার্গেট শটেও ফরাসিরা এগিয়ে— ৪টি বনাম স্পেনের ২টি। কর্নারের হিসেবেও ব্যবধান বিশাল, ৭-১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। বল দখলেও কাছাকাছি লড়াই— স্পেন ৫১%, ফ্রান্স ৪৯%।

হতাশায় মুখ ঢাকলেন এমবাপে — বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর হতাশ কিলিয়ান এমবাপে। ছবি: এপি 

তবু জয় এসেছে স্পেনের ঘরে। কারণ, গোলরক্ষক উনাই সিমোনের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং নিজেদের মাত্র দুটি অন-টার্গেট শটকেই দুই গোলে রূপান্তরের অসাধারণ দক্ষতা— এই দুই সমীকরণেই ভেঙে পড়ে ফ্রান্সের সব পরিসংখ্যানগত আধিপত্য।

২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দল বল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়ার কৌশলে খেলত। ২০২৬ সালের এই স্পেন খেলছে ভিন্ন দর্শনে— বল দখলে বিশাল কোনো ব্যবধান তৈরি না করেও, বল পায়ে এলেই তারা হয়ে উঠছে নিখুঁত ও গতিশীল।

গোল না পেলেও ম্যাচের চিত্রনাট্য লিখেছেন স্পেনের দুই তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস। ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে পুরো ম্যাচ ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করেছেন তারা। মাঝমাঠে রদ্রি ও দানি ওলমোর যুগলবন্দী ফ্রান্সের আক্রমণাত্মক ট্রানজিশনগুলো বারবার থামিয়ে দিয়েছে। ম্যাচের ২২ মিনিটে লুকাস দিনিয়ের ফাউলে পাওয়া পেনাল্টি থেকে মিকেল ওয়ারজাবালের গোল স্পেনকে দিয়েছিল মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা, যা তারা আর হাতছাড়া করেনি।

ম্যাচের ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর পাস থেকে বক্সে ঢুকে শট নিচ্ছেন স্পেনের রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোরো, যা পরাস্ত করে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে। ছবি: এপি 

ম্যাচের সবচেয়ে বড় ট্যাকটিক্যাল চমক ছিল ডিফেন্ডারদের ব্যবহার করে আক্রমণে ওঠা। ৫৮ মিনিটে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ যখন মাঝমাঠ সামলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই স্পেনের রাইট-ব্যাক পেদ্রো পোরো দানি ওলমোর পাস থেকে বক্সে ঢুকে যে শট নেন, তা ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে কোনো সুযোগই দেয়নি। এই গোলেই কার্যত ভেঙে যায় দেশমের রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা।

রিয়াল মাদ্রিদের তারকা কিলিয়ান এমবাপে পুরো ৯০ মিনিট ছায়ার মতো ঘুরে বেরিয়েছেন, কার্যকর কোনো ফিনিশিং ছাড়াই। ওসমানে দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলা গতি দিয়ে চেষ্টা করলেও স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেননি। খেলার শেষদিকে ৮৬ মিনিটে কঠোর ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন এমবাপে নিজেই— যা ফরাসি শিবিরের ক্রমবর্ধমান হতাশারই প্রতিফলন।

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর মাঠ ছাড়ছেন ফ্রান্স দলের কোচ দিদিয়ের দেশম। মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, আরলিংটন, টেক্সাস। ছবি: এপি

এই জয়ে স্পেন দীর্ঘ ১৬ বছর পর— ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের পর প্রথমবার— বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে পা রাখল। সেবার জাভি-ইনিয়েস্তাদের টিকিটাকা ফুটবল বিশ্ব জয় করেছিল। ২০২৬ সালে এসে লুইস দে লা ফুয়েন্তের নতুন প্রজন্ম যেন সেই হারানো গৌরবই ফিরিয়ে আনছে।

২০১২ সাল থেকে ফ্রান্সের ডাগআউটে থাকা দিদিয়ের দেশমের রক্ষণাত্মক কৌশলের কি তবে অবসান ঘটতে চলেছে? সময়ই দেবে তার উত্তর। তবে পাউ কিউবারসির মতো তরুণদের পরিপক্বতা জানান দিচ্ছে, ফাইনালের মঞ্চে স্পেন শুধু ফেবারিট হিসেবেই যাচ্ছে না— বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের সাম্রাজ্য নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই নামছে তারা।

আরও পড়ুন