হেরে যাওয়া ম্যাচ যে কৌশলে জিতলেন স্কালোনি
২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচে স্কালোনি এমন কী করলেন, যাতে বদলে গেল জয়ের প্রেক্ষাপট
ম্যাচ শেষে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে উদযাপনে মাতেন লিওনেল মেসি। এই জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। ছবি: রয়টার্স
স্কোরবোর্ডে তখন আর্জেন্টিনা ০-২ মিশর। ৬৬ মিনিট চলছে, গ্যালারিতে মিশরীয় সমর্থকদের উল্লাস আর আলবিসেলেস্তে শিবিরে পিনপতন নীরবতা। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা তখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। ঠিক এই মুহূর্তে ডাগআউট থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন লিওনেল স্কালোনি— আর তাতেই বদলে গেল পুরো ম্যাচের রং।
প্রথমার্ধেই দুঃস্বপ্ন শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার। ১৫ মিনিটে মারওয়ান আত্তিয়ার কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে আর্জেন্টিনাকে চমকে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম। এরপর ২১ মিনিটে মেসি পেনাল্টি নষ্ট করেন— মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের অতিমানবীয় সেভে। বিরতির আগেই আরও অন্তত তিনটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট হয় আর্জেন্টিনার, প্রতিবারই শোবেইরের প্রতিরোধে।

দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র চলতে থাকায় ৬৬ মিনিটে বড় ঝুঁকি নেন স্কালোনি— একসাথে দুই পরিবর্তন। রদ্রিগো দি পলের বদলে মাঠে নামান লউতারো মার্তিনেজকে, নিকোলাস তালিয়াফিকোর জায়গায় নিকো গঞ্জালেসকে। কিন্তু বদলি নামার ঠিক পরের মিনিটেই, ৬৭ মিনিটে হাসান-জিকো যুগলবন্দিতে ব্যবধান ২-০ করে ফেলে মিশর। মনে হচ্ছিল, স্কালোনির জুয়া বুঝি উল্টে গেল।
কিন্তু ঠিক এখান থেকেই আসল খেলা শুরু। বদলি নামা দুই আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে সামনে রেখে মিশরের রক্ষণে চাপ বাড়াতে থাকে আর্জেন্টিনা। ৭৯ মিনিটে ফল মেলে— ডান দিক থেকে মেসির নিখুঁত ক্রসে হেডে গোল করেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। ব্যবধান তখন ২-১।
মেসির ইতিহাস গড়া সমতা
চার মিনিট পর আসে ম্যাচের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। ডান দিক থেকে বল ক্রস করেন মেসি। লউতারো মার্তিনেজ দারুণ এক টাচে বলটা জিইয়ে রাখেন। এরপর গঞ্জালো মন্তিয়েল বলটা মেসির দিকে ঠেলে দেন। আর মেসি নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। ৮৩ মিনিটে ম্যাচে সমতা ফেরে, ২-২।
এই গোলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক কীর্তিও। চলতি বিশ্বকাপে নিজের অষ্টম গোল করে মেসি স্পর্শ করেছেন গিয়ের্মো স্তাবিলের ৯৬ বছরের পুরনো রেকর্ড— ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে এক আসরে ৮ গোলের কীর্তি, যা এতদিন কোনো আর্জেন্টাইনের ছিল সর্বোচ্চ। এই গোলেই এমবাপ্পে-হালান্ডকে (৭ গোল করে) পেছনে ফেলে এককভাবে গোল্ডেন বুট দৌড়ের শীর্ষে উঠে যান মেসি।

তারপরও থামেনি আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯০+২) লউতারো মার্তিনেজের ক্রস থেকে হেডে জয়সূচক গোলটি করেন এনজো ফার্নান্দেজ। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ ২৪ মিনিটে পরপর তিন গোলে ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
শুধু আর্জেন্টিনার লড়াই দিয়েই এই ম্যাচের গল্প শেষ হয় না। মিশরও লড়েছে সমান তালে, বরং বেশিরভাগ সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতেই। প্রথমার্ধে গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর একাই আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে আটকে রাখেন— মেসির পেনাল্টি ঠেকানো থেকে শুরু করে ম্যাক অ্যালিস্টার ও আলভারেজের নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করা, সব মিলিয়ে তার পারফরম্যান্স ছিল ম্যাচের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।

মোহাম্মদ সালাহকে ঘিরে গড়া আক্রমণভাগও একেবারে চুপ ছিল না— ৬৭ মিনিটে হাসানের বাড়ানো বলে গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন মোস্তফা জিকো। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় উঠে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এমন লড়াই মিশরের ফুটবল ইতিহাসেই একটা বড় অর্জন হয়ে থাকবে, যদিও শেষ মুহূর্তের হৃদয়ভাঙা হারে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন থেমে গেল আটলান্টাতেই।
পরিসংখ্যানও বলছে, এই জয় আর্জেন্টিনার জন্য কতটা বিরল। এর আগে বিশ্বকাপে দুই গোলে পিছিয়ে থাকা কোনো ম্যাচেই কখনো জেতেনি তারা— আগের ১৩টি ম্যাচেই হেরেছে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, প্রথমে গোল হজম করার পর ২০০৬ সালের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ জিতল আলবিসেলেস্তেরা।