রোনালদো-নেইমারের বিদায়: আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির অবসর কবে?
ক্যারিয়ারের সব ট্রফি (ব্যালন ডি'অর, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা) জেতা হয়ে যাওয়ায় এখন তার কোনো নতুন রেকর্ড গড়ার চাপ নেই। তিনি এখন কেবল 'মুহূর্তগুলো উপভোগ' করছেন।
সোনালী প্রজন্মের মহীরুহরা ব্যাকস্টেজে, স্পটলাইটের নিচে একাকী লিওনেল মেসি। ছবি: রয়টার্স
বিশ্ব ফুটবলের এক সোনালী যুগের মহীরুহরা যখন একে একে আন্তর্জাতিক মঞ্চের ব্যাকস্টেজে চলে যাচ্ছেন, তখন স্পটলাইটের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন একজনই— লিওনেল মেসি।
২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউটের চূড়ান্ত পর্বে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিদায় ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক পরম শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। এর পরপরই ইনজুরি আর ফর্মের সাথে লড়তে থাকা নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানা সেই বিষাদকে যেন আরও বাড়িয়ে দিল। অন্যদিকে জার্মান প্রাচীর ম্যানুয়েল নয়ারও গ্লাভস জোড়া তুলে রেখে ইতি টেনেছেন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের।
সমসাময়িক প্রায় সব মহাতারকাই যখন একে একে বিদায় নিচ্ছেন, তখন ফুটবল বিশ্বের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সবাই তো যাচ্ছেন, মেসি কবে বিদায় নেবেন? কখন আসবে সেই অমোঘ ক্ষণ?
এক যুগের অবসান
গত দেড় দশক ধরে ফুটবল বিশ্ব শাসিত হয়েছে রোনালদো-মেসি দ্বৈরথে। এর সাথে যোগ হয়েছিল নেইমারের শৈল্পিক ড্রিবলিং আর নয়ারের 'সুইপার-কিপার' বিপ্লব। কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে দৃশ্যপট বদলে গেছে। ৪১ বছর বয়সে এসে স্পেনের কাছে হেরে রোনালদোর আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। নেইমার আল-হিলালে যোগ দেওয়ার পর থেকে চোটের সাথে লড়ছেন, ব্রাজিলের জার্সিতে তাকে আগের ফর্মে দেখা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। আর নয়ার গ্লাভস জোড়া তুলে রেখে জার্মান ফুটবলের এক ঐতিহাসিক যুগের ইতি টেনেছেন।
এই দলছুট তারকাদের মাঝে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি যেন একাই ধরে রেখেছেন এক সোনালী যুগের ঐতিহ্য।
বিদায় নেওয়া এই তারকাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। ৪১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পর্তুগালের জার্সিতে খেলেছেন রেকর্ড ২৩৩টি ম্যাচ, যেখানে তার নামের পাশে রয়েছে বিশ্বরেকর্ড গড়া ১৪৬টি গোল! অন্যদিকে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা শৈল্পিক ফরোয়ার্ড নেইমার দেশের হয়ে ১৩০ ম্যাচে করেছেন সর্বোচ্চ ৮০টি গোল।

কেবল গোলদাতাই নন, সদ্য বিদায় নেওয়া জার্মান প্রাচীর ম্যানুয়েল নয়ারও জার্মানির জার্সিতে ১২৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে গোলপোস্টের নিচে এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে ২৩টি ম্যাচ খেলে ইতিহাসে একজন গোলরক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ডটিও এখন তার দখলে।
এই তিন তারকার বিদায়ের মানে হল—আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে এক ধাক্কায় হারিয়ে গেল ৪৯৪টি ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং ২২৬টি আন্তর্জাতিক গোলের এক অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান! আর ঠিক এখানেই লিওনেল মেসির টিকে থাকাটা ফুটবল বিশ্বের জন্য এক পরম বিস্ময়।
মেসি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
কাতার বিশ্বকাপে অমরত্বের স্বাদ পাওয়ার পর মেসির ফুটবল থেকে আর নতুন কিছু পাওয়ার নেই। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে তিনি এখন খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে। সেখানেও তার জাদুকরী ফর্ম অক্ষুণ্ণ। তবে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।
এবারের বিশ্বকাপে মাঠে নেমেই ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে প্রতিটি ম্যাচ শেষেই ভক্তদের মনে ভয় জাগে— এটাই কি তবে প্রিয় জাদুকরের শেষ ম্যাচ?
রোনালদো-নেইমারদের বিদায়ের আবহ যখন ফুটবল বিশ্বকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে, তখন লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যেন এক অতিপ্রাকৃতিক রূপকথা। আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে তিনি এ পর্যন্ত খেলেছেন রেকর্ড ২০৩টি ম্যাচ, যেখানে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছেন অবিশ্বাস্য ১২৪ বার!

আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ১টি বিশ্বকাপ, ২টি কোপা আমেরিকা এবং ১টি ফিনালিসিমা জয়ী এই মহাতারকা ৩৯ বছর বয়সে এসেও যেভাবে আলবিসেলেস্তেদের আক্রমণভাগ একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তা বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
বিদায় নিয়ে খোদ মেসির ভাবনা কী?
নিজের অবসর নিয়ে মেসি সবসময়ই বাস্তববাদী। তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন, জোর করে বা কেবল রেকর্ডের জন্য তিনি মাঠে থাকবেন না। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছেন, 'আমি জানি যেদিন মনে হবে আমি আর পারফর্ম করতে পারছি না, দলক সতীর্থদের সাহায্য করতে পারছি না, সেদিনই আমি বুটজোড়া তুলে রাখব। এটা পুরোপুরি নির্ভর করছে আমার ফিটনেস এবং আমি ভেতর থেকে কেমন অনুভব করছি তার ওপর।'
বর্তমানে মেসি প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন। কোনো ট্রফি জেতার বাড়তি চাপ নেই, নেই সমালোচকদের জবাব দেওয়ার তাগিদ। সব পেয়ে তৃপ্ত এক 'ফুটবল ঈশ্বর' এখন স্রেফ আনন্দের জন্য খেলছেন।
২০৩০ বিশ্বকাপ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনি সবসময়ই মেসির সিদ্ধান্তের ওপর সব ছেড়ে দিয়েছেন। স্কালোনির স্পষ্ট কথা, 'মেসি যতদিন চাইবে, ও আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলবে। ১০ নম্বর জার্সিটা সবসময় ওর জন্যই বরাদ্দ।'
এদিকে, ইন্টার মায়ামির সাথে মেসির বর্তমান চুক্তি রয়েছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। অনেকেই ধারণা করছেন, মেসি যদি নিজেকে ফিট রাখতে পারেন, তবে ২০৩০ সালের শতবর্ষী বিশ্বকাপেও মেন্টর বা অল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে আলবিসেলেস্তেদের ডাগআউটে দেখা যেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিদায়ের সানাই যে খুব দ্রুতই বাজতে চলেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মেসি বিদায় নিলে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ কী?
মেসি যখনই বিদায় নেবেন, আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটা বিশাল শূন্যস্থান তৈরি হবে— তা নিশ্চিত। তবে আলবিসেলেস্তেরা এখন আর কেবল একজন 'মেসি-নির্ভর' দল নয়। হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্তিনেস কিংবা আলেক্সিস মাক অ্যালিস্টারদের মতো একঝাঁক বিশ্বজয়ী তরুণ এখন দলের হাল ধরেছেন। স্কালোনির অধীনে এই তরুণ দলটির পরিপক্কতা প্রমাণ করে, জাদুকরের বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনার ফুটবলের সূর্য এত সহজে অস্তমিত হচ্ছে না। বরং এক নতুন ট্যাকটিক্যাল যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।
মেসির বিদায়ে বাণিজ্যিক মঞ্চে লাগবে বড় ধাক্কা
মেসির মাঠের বিদায় কেবল ফুটবলীয় ক্ষতি নয়, এটি বিশ্ব ফুটবলের বিশাল বাণিজ্যিক বাজারের জন্যও এক বড় ধাক্কা। ইন্টার মায়ামি থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার জার্সি বিক্রি, ব্রডকাস্ট স্বত্ব আর স্পনসরশিপের যে জোয়ার মেসি একাই ধরে রেখেছেন, তার বিদায়ের পর সেখানে বড় ধরণের রূপান্তর আসবে। ক্রীড়া বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, মেসির বুটজোড়া তুলে রাখার দিনটি হবে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল এবং আবেগঘন মুহূর্ত।
ফুটবল কি তার সৌন্দর্য হারাবে?
ফুটবল কখনো কোনো একক ব্যক্তির জন্য থেমে থাকে না। পেলে গেছেন, ম্যারাডোনা গেছেন, ফুটবল তার নিজস্ব গতিতেই চলেছে। কিন্তু রোনালদো, নেইমার, নয়ারদের পর মেসি যেদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে 'আলবিদা' বলবেন, সেদিন কেবল একটি যুগেরই অবসান ঘটবে না। সেদিন ফুটবল খেলাটাই তার চিরচেনা রূপের একটা বড় অংশ হারাবে।
রঙ্গমঞ্চের আলো একে একে নিভে যাচ্ছে। জাদুকরের শেষ জাদুটা তাই যত দিন সম্ভব চোখ ভরে দেখে নেওয়াই এখন ফুটবলপ্রেমীদের একমাত্র সান্ত্বনা।