EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

মেসি-নেইমার অবসরের পর কি থাকবে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল উন্মাদনা?

পেলে-ম্যারাডোনার পর মেসি-নেইমার, তারপর কে? বাংলাদেশের ফুটবল-আবেগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

মেসি-নেইমার অবসরের পর কি থাকবে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল উন্মাদনা?

আনন্দ শোভাযাত্রায় পাশাপাশি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকরা, উৎসবের রঙে রঙিন রাজপথ। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

পেলে-ম্যারাডোনার হাত ধরে শুরু হওয়া এই ভালোবাসা কি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে, নাকি মেসি-নেইমারের বিদায়ের সাথেই থেমে যাবে ছাদের পতাকা আর পাড়ার প্রীতি ম্যাচ?

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, ছাদ, রিকশার হুড ছেয়ে যায় নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজ পতাকায়। অথচ মাঠে খেলছে না বাংলাদেশ, তবু যেন লড়াইটা নিজের দেশেরই। এই ভালোবাসার কেন্দ্রে এখন লিওনেল মেসি আর নেইমার— কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস বলে, তারকারা চিরকাল মাঠে থাকেন না। প্রশ্ন হলো, একদিন যখন তাঁরাও পেলে-ম্যারাডোনার মতো জার্সি তুলে রাখবেন, তখনও কি কোটি বাংলাদেশি একইভাবে রাত জেগে চিৎকার করবে 'আর্জেন্টিনা' বা 'ব্রাজিল' বলে?

বাংলাদেশে ফুটবলের সোনালী দিন বলা হয় সত্তর ও আশির দশককে। তখন বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল মাঠে বসে খেলা দেখা, এখনকার মতো এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। সেই সময় থেকেই পেলের কারণে ব্রাজিল আর ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনা সমর্থনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ, আর সেই আসরেই দিয়েগো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে গভীর দাগ কাটে। মূলত সেখান থেকেই ব্রাজিল সমর্থকদের বিপরীতে আর্জেন্টিনার শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হতে শুরু করে।

অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ ফুটবলে একেবারেই পিছিয়ে বা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও কখনো লড়াই করতে পারে না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বাংলাদেশ ফুটবল দল নিয়মিতই ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয় এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) অধীনে প্রতি বিশ্বকাপের আগেই এশীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলে।

বাংলাদেশ প্রথমবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয় ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপকে সামনে রেখে। ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত সেই বাছাইপর্বে ঘরের মাঠে ইন্দোনেশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ পায় ঐতিহাসিক প্রথম জয়। আর সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশ প্রথম রাউন্ডে মালদ্বীপকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নেয়, যেখানে অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবাননের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ছয়টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করে দলটি।

তবে বাছাইপর্বে অংশ নিলেও বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইরানের মতো এশিয়ার শীর্ষ ফুটবল-শক্তিগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার ব্যবধান এবং দেশের ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ঘাটতি। ফলে বাছাইপর্বেই আটকে থাকা এই যাত্রা, আর নিজের দেশকে বিশ্বমঞ্চে দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ থেকেই হয়তো বাংলাদেশের কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলকে বেছে নিয়েছে নিজেদের 'দ্বিতীয় জাতীয় দল' হিসেবে।

মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রধান খেলা ক্রিকেট হলেও ক্রিকেট বিশ্বকাপে এমন বাঁধভাঙা উন্মাদনা দেখা যায় না। এমনকি এখনই যখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল জিম্বাবুয়ে সফরে টেস্ট ম্যাচ বাজেভাবে হেরেছে, সেই খবর অধিকাংশ মানুষের কানেই পৌঁছায়নি। কারণ একটাই— ফুটবলের আমেজে মত্ত পুরো দেশ। বিশ্বকাপ ফুটবলের এই এক মাস আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের অগ্রাধিকার বদলে দেয়।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই পেলে, ম্যারাডোনা বা রোনালদিনহোর খেলা সরাসরি দেখেননি, দেখলেও তখন বয়স কম থাকায় খেলা বোঝার ক্ষমতা ছিল সীমিত। যেমন ১৯৯৯ সালে জন্ম নেওয়া একজনের প্রথম বিশ্বকাপ স্মৃতি হতে পারে ২০১০ সালের স্পেন বিশ্বকাপ— তখনও ফুটবল বোঝার বয়স হয়নি পুরোপুরি। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— মেসি, নেইমার যেদিন থাকবেন না, সেদিন কি নতুন প্রজন্মের কাছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল একই রকম আবেগের জায়গা থাকবে?

ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। ম্যারাডোনা-পেলের সময়ের পর তাঁরা অবসরে গেলেও উন্মাদনা থামেনি— বরং সময়ের সাথে আরও শক্তিশালী হয়েছে, মেসি-নেইমারের হাত ধরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই সমর্থন আসলে শুধু একজন খেলোয়াড়কেন্দ্রিক নয়— এটি দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, লাতিন আমেরিকার ফুটবল-সংস্কৃতি এবং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা পারিবারিক ঐতিহ্যের ফসল। বাবার হাত ধরে যে সমর্থন শুরু হয়, তা সন্তানের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়— এভাবেই বংশপরম্পরায় টিকে আছে এই ভালোবাসা।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের তুলনায় আর্জেন্টিনার সমর্থক বাংলাদেশে দ্রুত বেড়েছে, আর এই বৃদ্ধির পেছনে টেলিভিশন সম্প্রচার ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বকাপের সময় পত্রিকাগুলো বিশেষ ফিচার পাতা প্রকাশ করে, টিভি টকশোতে চলে সমর্থকদের চুলচেরা বিশ্লেষণ, আর সামাজিক মাধ্যম হয়ে ওঠে বিতর্ক আর উদযাপনের মঞ্চ। এই সম্মিলিত মিডিয়া-উপস্থিতিই নতুন প্রজন্মের কাছেও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে জীবন্ত রাখছে, এমনকি কোনো নির্দিষ্ট তারকা ছাড়াও।

মেসি বা নেইমার হয়তো একদিন মাঠ ছেড়ে দেবেন, ঠিক যেভাবে ছেড়েছিলেন পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদিনহো। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের যে শিকড় গত পাঁচ দশক ধরে গেঁথে গেছে, তা কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। নতুন কোনো তারকা হয়তো মেসির উত্তরসূরি হয়ে আসবেন, আর বাংলাদেশের কোটি মানুষ নতুন নামেই মেতে উঠবে— পতাকা উড়বে ছাদে, উল্লাস হবে পাড়ার মোড়ে, শুধু নায়কের নামটাই হয়তো বদলে যাবে।

আরও পড়ুন