যে সাহাবির কোরআন তিলাওয়াত শুনে কেঁদেছিলেন মহানবী (সা.)
মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন পবিত্র কোরআনের নিবেদিতপ্রাণ খাদেম। কোরআন শেখা, বোঝা, মুখস্থ করা, তিলাওয়াত করা এবং অন্যদের শিক্ষা দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান সাধনা। তাঁর তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্য ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একবার তাঁর মুখে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হিজরতের প্রায় ৩৭ বছর আগে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম প্রচারের সূচনালগ্নেই তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ ব্যক্তি। ইসলামের জন্য দুবার হিজরত করেন এবং দ্বিনের পথে অসংখ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিচয় দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বদর, উহুদ, খন্দক ও বাইআতে রিদওয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোতে অংশগ্রহণ করেন।
ইসলামের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি ও আত্মত্যাগ ছিল প্রশংসনীয়। ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কায় কুরাইশদের নির্যাতনের ভয়ে মুসলমানরা প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে সাহস পেতেন না। কিন্তু হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সাহসিকতার সঙ্গে একদিন কাবাঘরের কাছে গিয়ে কোরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর মক্কায় তিনিই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন।
তিনি সুরা আর-রহমানের কিছু অংশ পাঠ করতে থাকেন। এ সময় কুরাইশ নেতারা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্মম নির্যাতন চালায়। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও কোরআনের বাণী প্রচারের সাহস ও দৃঢ়তা হারাননি তিনি। (উসদুল গাবাহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৮২)
তিলাওয়াত শুনে অশ্রুসিক্ত মহানবী (সা.)
একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতে বললেন। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আর আমি আপনাকে তা পড়ে শোনাব?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি অন্যের মুখ থেকে কোরআন শুনতে ভালোবাসি।’
তখন তিনি সুরা নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে যখন এই আয়াতে পৌঁছালেন—‘অতঃপর যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব, তখন কী অবস্থা হবে?’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪১)
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এতটুকুই যথেষ্ট।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাকিয়ে দেখলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৬৩)
তিলাওয়াতের প্রশংসায় মহানবী (সা.)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাঁর তিলাওয়াতের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনকে সেভাবে বিশুদ্ধ ও সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করতে ভালোবাসে, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছে, সে যেন ইবনে উম্মে আবদের (আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ) তিলাওয়াত অনুসরণ করে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৪৩৪০)
অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কোরআন শেখার জন্য চারজন সাহাবির নাম উল্লেখ করেন। তাঁদের মধ্যে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-ও ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা চার ব্যক্তির কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা করো—আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম মাওলা আবি হুজাইফা, উবাই ইবনে কাব ও মুআজ ইবনে জাবাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭১৩)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) শুধু কোরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াতেই পারদর্শী ছিলেন না; বরং কোরআনের অর্থ, ব্যাখ্যা ও বিধিবিধান সম্পর্কেও ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। সাহাবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও মুফাসসির হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে বহু সাহাবি ও তাবেয়ি কোরআন, হাদিস ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেছেন।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দ্বিনের খেদমত, কোরআনের শিক্ষা ও ইসলামের প্রচারে ব্যয় করা এই মহান সাহাবি ৩২ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
আল্লাহ তাআলা এই মহান সাহাবির প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং আমাদের তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে কোরআনের প্রকৃত খাদেম হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।