পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বজগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক মহান আল্লাহ তাআলা। মানুষ পৃথিবীতে তাঁর সৃষ্টির একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। পৃথিবীর সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের জীবনধারণের জন্য আল্লাহর দেওয়া অনন্য নিয়ামত। এসব সম্পদ ভোগ করার অধিকার মানুষের রয়েছে, তবে তা অপচয়, ধ্বংস কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়ার অধিকার কারও নেই। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বনি আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশভূষা গ্রহণ করো এবং খাও, পান করো ও অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনযাপনে সংযম ও অপচয় পরিহারের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকৃতির সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পানি, খাদ্য, জ্বালানি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়; বরং তা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার অন্যতম কারণ।
পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি নিষিদ্ধ
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ কেবল সামাজিক সচেতনতার বিষয় নয়; বরং সৎ নিয়ত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এসব কাজ করলে তা ইবাদতের মর্যাদা লাভ করতে পারে। কারণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সৃষ্টিজগতের প্রতি সদয় আচরণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর জমিনে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না, আর আল্লাহকে ভয় ও আশার সঙ্গে ডাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহর অনুগ্রহ মুহসিনদের খুব নিকটে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৬)
এই আয়াতে পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পর বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংস করাও এ ধরনের বিপর্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। নদী-নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলে পানি দূষণ, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য পানিতে মিশিয়ে দেওয়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট করা এবং অবৈধভাবে বনভূমি উজাড় করার ফলে মানুষসহ অসংখ্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও মারাত্মক সংকট তৈরি করে।
যখন মানুষ আল্লাহর বিধান ও নৈতিকতার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে, তখন ব্যক্তিস্বার্থ ও ভোগবিলাসের কারণে প্রকৃতির ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালায়। অথচ একজন মুমিনের জন্য অন্যের ক্ষতি হয় কিংবা সৃষ্টিজগতের প্রতি অকারণে নিষ্ঠুরতা করা হয়—এমন কোনো কাজে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ
ইসলাম শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং সব জীব ও সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে দুটি বিষয় মনে রেখেছি। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বস্তুর প্রতি সদয় আচরণ করা ফরজ করেছেন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৪০৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোনো প্রাণী বা সৃষ্টির প্রতি অকারণে নিষ্ঠুরতা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণিকুলের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। মানুষের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীর জীবনধারণের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রকৃতির কল্যাণে কাজ করাকে ইসলাম শুধু দায়িত্ব হিসেবেই দেখেনি; বরং এর জন্য পরকালীন প্রতিদানের সুসংবাদও দিয়েছে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা থেকে পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তবে তা তার পক্ষ থেকে সদকা বলে গণ্য হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩২০)
এই হাদিসে উপকারভোগী হিসেবে শুধু মানুষের কথা বলা হয়নি; বরং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের পাশাপাশি অন্য প্রাণীর উপকারে আসে—এমন কাজও সদকা হিসেবে গণ্য হয়। একটি গাছ রোপণ ও তার পরিচর্যা শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ায় না; বরং তা জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অক্সিজেন সরবরাহ এবং প্রাণিকুলের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রাণীর প্রতি দয়ায়ও রয়েছে সওয়াব
প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শনের বিষয়টি ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় প্রচণ্ড পিপাসার্ত হয়ে পড়েন। তিনি একটি কূপে নেমে পানি পান করেন। কূপ থেকে উঠে একটি কুকুরকে পিপাসায় কাতর অবস্থায় মাটি চাটতে দেখে তাঁর মনে হলো, কুকুরটিরও তাঁর মতোই পিপাসা পেয়েছে। তখন তিনি আবার কূপে নেমে নিজের মোজায় পানি ভরে মুখ দিয়ে সেটি ধরে ওপরে উঠে কুকুরটিকে পানি পান করান। আল্লাহ তাআলা তাঁর এ কাজ কবুল করেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
এ ঘটনা শুনে সাহাবিরা জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ প্রাণীর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই পুণ্য রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামে প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনও সওয়াবের কাজ। কোনো প্রাণীকে ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দেখলে সামর্থ্য অনুযায়ী তার উপকার করা উচিত। তবে মানুষের নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে তা দায়িত্বশীল ও মানবিক উপায়ে করতে হবে। অকারণে কোনো প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা যাবে না।
প্রকৃতি রক্ষায় প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শুধু রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়েও প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্যেক মুমিনের উচিত ইবাদতের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রকৃতির কল্যাণে সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখা।
এ জন্য অপ্রয়োজনে পানি ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করা, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা, বেশি বেশি গাছ লাগানো ও সেগুলোর পরিচর্যা করা, নদী-নালা ও জলাশয় দূষণ থেকে বিরত থাকা এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনসম্মতভাবে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পৃথিবী শুধু মানুষের ভোগের জায়গা নয়; এটি অসংখ্য জীব ও প্রাণীর আবাসস্থল। মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে প্রতিটি প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা আমাদের কর্তব্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতির কল্যাণে করা প্রতিটি ভালো কাজই ইবাদতের অংশ হতে পারে।
তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; বরং এটি একজন মুমিনের নৈতিকতা, ধর্মীয় দায়িত্ব ও পরকালীন জবাবদিহিরও অংশ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি সদয় হতে এবং পৃথিবীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।