EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

ইসলামে যে ৪ ধরনের উপহার দেওয়া-নেওয়া নিষিদ্ধ

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ এএম

ইসলামে যে ৪ ধরনের উপহার দেওয়া-নেওয়া নিষিদ্ধ
অ অ

ইসলামী সমাজব্যবস্থায় উপহার আদান-প্রদান পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। উপহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং দূর হয় ক্ষোভ-বিদ্বেষ। তবে সব ধরনের উপহার দেওয়া-নেওয়া ইসলামে বৈধ নয়। উপহারের আড়ালে ঘুষ, ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা কিংবা অন্যায়ভাবে কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো বিষয় থাকলে তা ইসলামী বিধানের পরিপন্থি হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপহার আদান-প্রদানে উৎসাহ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং তার প্রতিদানও দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৪)

তবে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্ব বিবেচনা করা জরুরি। ইসলামে নিষিদ্ধ বা নিন্দনীয় এমন চার ধরনের উপহার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১. সরকারি দায়িত্ব পালনের সুবাদে উপহার গ্রহণ

সরকারি বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে কিংবা অবৈধ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে উপহার দেওয়া হলে তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

সুনান আত-তিরমিজির একটি হাদিসে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অভিশাপের কথা বর্ণিত হয়েছে। (হাদিস: ১৩৩৭)

আবু হুমায়দ আস-সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে সদকা সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালন শেষে ওই ব্যক্তি বললেন, এগুলো সদকার সম্পদ, আর এগুলো তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছে।

এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন করেন, তিনি নিজের বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকলে কি এমন উপহার পেতেন? এরপর তিনি দায়িত্ব পালনের সুবাদে পাওয়া উপহার গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪২৫)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সরকারি দায়িত্ব বা পদমর্যাদার কারণে পাওয়া উপহারকে সাধারণ সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে অন্যায় সুবিধা বা স্বার্থের সম্পর্ক থাকলে তা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হতে পারে।

২. সুপারিশ বা কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে উপহার

কাউকে বৈধ কাজে সহযোগিতা করা কিংবা তার জন্য সুপারিশ করা ভালো কাজ। তবে সেই সহযোগিতা বা সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণের বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করার কারণে উপহার পায় এবং তা গ্রহণ করে, তাহলে সে সুদের একটি বড় দরজায় প্রবেশ করল। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)

অর্থাৎ, ব্যক্তিগত স্বার্থের বিনিময়ে সুপারিশ বা উপকার করাকে উৎসাহিত করা হয়নি। বিশেষ করে পদ, দায়িত্ব বা প্রভাব খাটিয়ে কাউকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করা অনৈতিক এবং পরিস্থিতিভেদে ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

৩. ঋণের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ

বিপদে পড়া কাউকে ঋণ দেওয়া ইসলামে প্রশংসনীয় কাজ। তবে ঋণ দেওয়ার কারণে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়া সুদের সঙ্গে সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।

আবু বুরদা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে সালামের (রা.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাঁকে খেজুর ও ছাতু খাওয়ানোর এবং থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) তাঁকে সতর্ক করে বলেন, যেখানে সুদের লেনদেন ব্যাপক, সেখানে কারও কাছে পাওনা থাকলে সেই ব্যক্তি উপহার হিসেবে সামান্য কিছু দিলেও তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ, তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৪২)

এ বিষয়ে সুনান ইবনে মাজাহর একটি হাদিসেও ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে উপঢৌকন বা বাহনে চড়ার মতো সুবিধা গ্রহণ না করার নির্দেশ এসেছে। তবে ঋণের সম্পর্কের আগে থেকেই দুজনের মধ্যে এমন উপহার আদান-প্রদানের প্রচলন থাকলে তা ভিন্ন বিষয়। (হাদিস: ২৪৩২)

অতএব, ঋণের কারণে শর্তসাপেক্ষে বা প্রত্যাশিত অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। আগে থেকে প্রচলিত স্বাভাবিক সৌজন্য এবং ঋণের বিনিময়ে পাওয়া সুবিধার মধ্যে পার্থক্যও বিবেচনায় রাখতে হবে।

৪. সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করে উপহার দেওয়া

সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও আচরণে ন্যায়বিচার বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া এক সন্তানকে বেশি সম্পদ বা দামি উপহার দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়।

নু’মান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁর বাবা তাঁকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখার জন্য তাঁর মা অনুরোধ করেন। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তাঁর সব সন্তানকে একই ধরনের দান করেছেন কি না। বাবা যখন জানান, তিনি তা করেননি, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ এরপর নু’মানের বাবা তাঁর দেওয়া দান ফিরিয়ে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৬)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাবা-মায়ের ন্যায়বিচার বজায় রাখা উচিত। বিশেষ কোনো যৌক্তিক কারণ থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে; তবে অকারণে এক সন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা উচিত নয়।

উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি

ইসলামে উপহার ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু উপহারের আড়ালে ঘুষ, ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা কিংবা অন্যায় বৈষম্য তৈরি হলে তার উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। তাই উপহার দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও ইসলামী বিধান মেনে চলা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন