EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা
অ অ

একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকা। কিন্তু সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, জুলুম ও অন্যায়ভাবে সম্পদ হরণ সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ইসলামে এসব কর্মকাণ্ডকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সন্ত্রাস বলতে এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যার মাধ্যমে ভয়ভীতি, সহিংসতা, অস্ত্র, হত্যা, হামলা বা হুমকির সাহায্যে ব্যক্তি কিংবা সমাজের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করা হয়। অন্যদিকে চাঁদাবাজি হলো ভয়ভীতি, হুমকি, প্রভাব, বলপ্রয়োগ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ বা সম্পদ আদায় করা। উভয় অপরাধের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—ভয় সৃষ্টি করে অন্যের অধিকার হরণ করা। সন্ত্রাসে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা আক্রান্ত হয়, আর চাঁদাবাজিতে মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টি নিষিদ্ধ

ইসলামে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার পবিত্রতা ও গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির কারণে সমাজে ভয়, অস্থিরতা, অবিচার ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। ফলে এসব কর্মকাণ্ড কোরআনে বর্ণিত ‘ফাসাদ ফিল-আরদ’ বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত ৭৭)

অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ

বৈধ ব্যবসা, শ্রমের বিনিময় কিংবা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নয়—বরং ভয়, হুমকি, বলপ্রয়োগ বা চাপ সৃষ্টি করে অন্যের সম্পদ গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। চাঁদাবাজি এরই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৮)

সম্পদ ও সম্মানের ওপর আঘাত গুরুতর অপরাধ

একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের ওপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। চাঁদাবাজি যেমন মানুষের সম্পদের ওপর সরাসরি আঘাত করে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তা তার সম্মান ও নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে।

বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ), যেমন তা হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এই দিনে, তোমাদের এই মাসে এবং তোমাদের এই শহরে।’ (মুসলিম, হাদিস ১২১৮)

জুলুমের পরিণতি ভয়াবহ

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মূলেই রয়েছে জুলুম। একজন সন্ত্রাসী যখন মানুষকে ভয় দেখায়, তার নিরাপত্তা নষ্ট করে কিংবা জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন সে জুলুম করে। একইভাবে চাঁদাবাজ ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে জুলুমের শামিল হয়।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’ (মুসলিম, হাদিস ৬৭৪১)

অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীর ব্যাপারে সতর্কতা

অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করাকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। এক তাওবাকারী নারী সাহাবির তাওবার প্রসঙ্গে নবী (সা.)-এর একটি বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে এমন তাওবা করেছে যে একজন মাক্স গ্রহণকারীও যদি এমন তাওবা করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।’ (মুসলিম, হাদিস ৪৩২৪)

হাদিসে ‘সাহিবু মাক্স’ বলতে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

মানুষের হক নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়

চাঁদাবাজির সঙ্গে মানুষের অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’-এর বিষয়টি জড়িত। কেউ অন্যায়ভাবে কারও কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে শুধু মুখে তাওবা করাই যথেষ্ট নয়। সম্ভব হলে সেই অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায় করতে হবে।

নবী (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান বা অন্য কিছুতে কোনো জুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার আগেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস ২৪৪৯, ৬৫৩৪; তিরমিজি, হাদিস ২৪১৯)

শান্তিপূর্ণ সমাজের পথে বড় বাধা

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে। উভয়ের মূলে রয়েছে জুলুম, ভয়ভীতি, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণ।

ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সব ধরনের জুলুম থেকে বিরত থাকা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন