EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

যে ভুলগুলো ইবাদত নষ্ট করে দেয়

মাওলানা হানিফ আশরাফি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৭ এএম

যে ভুলগুলো ইবাদত নষ্ট করে দেয়
অ অ

ইসলামে গোপনে অনেক ইবাদত করার কথা আছে গোপনে দান-সদকা করা, মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া, কারো মন ভালো করে দেওয়া, কারো অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করা, গোপনে নেক আমল করা ইত্যাদি। 

কিন্তু শুধু নেক আমল করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেই আমল হেফাজত করাও জরুরি। কত মানুষ বছরের পর বছর ইবাদত করেছেন, অথচ অন্তর বা জিহ্বার কোনো একটি রোগ এসে তাদের আমল নষ্ট করে দিয়েছে বা তার সওয়াব কমিয়ে দিয়েছে। 

এ কারণেই মুসলিম মনীষীরা আমল করার পাশাপাশি আমল সংরক্ষণের প্রতিও গুরুত্ব দিতেন। গোপন ইবাদতকে নষ্ট বা দুর্বল করে দেয়।

এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল হলো 

গোপন রিয়া বা লোক দেখানো: এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর একটি। কারণ অনেক সময় মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না যে তার অন্তরে রিয়া প্রবেশ করেছে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর জন্য আমল শুরু করল, কিন্তু পরে মানুষ তার আমলের কথা জেনে গেলে আনন্দিত হলো, প্রশংসা না করলে কষ্ট পেল, অথবা মানুষ না থাকলে কিছু নেক আমল ছেড়ে দিল। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’(সুরা আল-কাহফ, আয়াত: ১১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি তা হলো ছোট শিরক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, রিয়া।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৬৩০)

নিজের আমল নিয়ে অহংকার করা: কেউ নেক আমল করার পর নিজের প্রতি মুগ্ধ হয়ে যেতে পারে এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে উত্তম মনে করতে পারে। এটিও অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি রোগ। কারণ আমল যত বাড়বে, একজন মুমিনের বিনয়ও তত বাড়া উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। কে তাকওয়াবান, তিনি তা ভালো জানেন।’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত: ৩২)

উপকার করে খোঁটা দেওয়া ও কষ্ট দেওয়া: কেউ গোপনে দান করল, কিন্তু পরে সেই গরিব মানুষটিকে তার দানের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিল। অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখল, তারপর সেই উপকারের কথা বলে তাদের ওপর অহংকার করল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান-সদকা নষ্ট করো না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

ছোট নেক আমলকে তুচ্ছ মনে করা: শয়তানের একটি বড় ফাঁদ হলো মানুষকে বোঝানো যে ছোট আমলের কোনো মূল্য নেই। ফলে মানুষ হাসিমুখে কথা বলা, সামান্য জিকির করা, ভাইয়ের জন্য দোয়া করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া কিংবা সামান্য সদকা করাকে অবহেলা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধেক খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো; যদি তা-ও না পাও, তবে একটি ভালো কথা বলো।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৪০)

তাই কোনো নেক আমলকে হালকা মনে করা যাবে না। দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য অধৈর্য হয়ে যাওয়া: কারো কারো দাবি হলো ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কোনো ফল দেখলাম না।’ কেউ কেউ বলে, ‘মানুষের মধ্যে মীমাংসা করলাম, কিন্তু তারা পরিবর্তন হলো না।’

এগুলো শয়তানের হতাশা সৃষ্টির মাধ্যম হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারো দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে বলে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৩৪০)

গুনাহের পর ইবাদত ছেড়ে দেওয়া: কেউ গুনাহ করে ফেলে, তারপর ভাবে আমি তো গুনাহগার, ‘আমার আর তাহাজ্জুদ পড়ার অধিকার নেই’, ‘আমি কীভাবে দোয়া করব?’, আমি কিভাবে কোরআন পড়ব?’

এটি শয়তানের বড় প্রতারণা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার সেই বান্দারা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৩)

তাই গুনাহের পর তোমার আরো বেশি তাওবা ও নেক আমলের দিকে ফিরে আসা উচিত। ইবাদতের কারণে অন্য মানুষকে তুচ্ছ মনে করা: কেউ নিজের গোপন ইবাদতগুলো ঠিক রাখে, কিন্তু ধীরে ধীরে গুনাহগার মানুষদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। এটি ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথষ্টে যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২১৩)

অন্যের আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং নিজের সংশোধন ভুলে যাওয়া: কেউ কেউ অন্যের ইবাদত কতটুকু, কে কতটা গুনাহ করে, কে কতটা ভুল করছে এসব হিসাব করতে ব্যস্ত থাকে; অথচ নিজের অন্তর ও আমলের দিকে তাকায় না। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত।’(সুরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ১৪)

আমল কবুল হয়েছে কি না এ বিষয়ে দোয়া না করা: মুসলিম মনীষীরা নেক আমল করার পরও ভয় করতেন যে তাদের আমল হয়ত কবুল হয়নি। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাবা নির্মাণ করছিলেন, তখনও তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন: ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৭)

একটু চিন্তা করুন, তাঁরা আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছেন, তবু আমল কবুল হওয়া নিয়ে দোয়া করছেন। তাহলে আমাদের মতো দুর্বল মানুষের কত বেশি আল্লাহর কাছে নিজের আমল কবুলের জন্য দোয়া করা উচিত!

আরও পড়ুন