যে কারণে রোজাদার আল্লাহর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হয়
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য রোজাদারের উচিত তাঁর রোজার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকা, যা রোজার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
মুফতি আবদুল্লাহ নুর
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
রোজা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। রোজার প্রতিদানের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেই।’ এক বর্ণনায় এসেছে, আমি নিজেই তার প্রতিদান হয়ে যাই। কিন্তু রোজাদারের কিছু ভুলের কারণে সে আল্লাহর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য রোজাদারের উচিত তাঁর রোজার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকা, যা রোজার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেমন- অনর্থক কথা ও কাজ, পরনিন্দা, মানুষের দোষ প্রচার ইত্যাদি।
রোজাদারের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সে তার প্রবৃত্তি, খাদ্য ও পানীয় আমার জন্য পরিহার করেছে।’ রোজাদার ব্যক্তি খাদ্য, পানীয় ও যেৌন আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়গুলো পরিহার করার বিনিময়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা বলেন, ‘আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এসব বৈধ চাহিদা পরিত্যাগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং এজন্য তাকে সেসব বিষয়গুলোও ত্যাগ করতে হবে, যা আল্লাহ সব সময়ের জন্য তার ওপর হারাম করেছেন। যেমন- মিথ্যা বলা, খেয়ানত করা, বিশ্বাসভঙ্গ করা, প্রতারণা করা, জুলুম করা, অপবাদ দেওয়া, মানুষের জান-মাল ও সম্মান নষ্ট করা ইত্যাদি। এসব বিষয়গুলো সব সময়ই হারাম। আর রোজাদারের জন্য তা আরো গুরুতর হারাম হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য নবি কারিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ত্যাগ করেনি, তারা পানাহার ত্যাগ আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০৪)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করাই রোজা নয়, রোজা হলো অনর্থক ও অশ্লীলতা পরিহারের নাম।’ (মুসনাদে হাকিম, হাদিস: ১৫৭০)
হারাম বিষয়গুলো ত্যাগ না করে শুধু বৈধ বিষয়গুলো ত্যাগ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি হারাম কাজে লপ্তি হলো কিন্তু আবার হালাল জিনিস ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশা করল, তার উদাহরণ হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে ফরজ ইবাদত ত্যাগ করে, কিন্তু নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশা করে।
একাধিক হাদিসের কিতাবে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, মহানবী (সা.)- এর যুগে দুজন নারী রোজা রাখে। দিনের শেষভাগে ক্ষুধা ও পিপাসা তাদের কাতর করে ফেলে, এমনকি তারা মৃত্যুর উপক্রম হয়। তারা লোক মারফত মহানবী (সা.)- এর কাছে রোজা ভেঙে ফেলার অনুমতি চায়। নবিজি (সা.) তাদের কাছে একটি পাত্র পাঠান এবং বলেন, তাদেরকে বোলো, এই পাত্রে তারা যা খেয়েছিল তা বমি করে ফেলতে। তাদের একজন তাতে প্রবাহিত রক্ত ও তাজা গোশত বমি করল। অপরজনও অনুরূপ বমি করল। তাদের বমিতে পাত্র পূর্ণ হয়ে গেল।
এই ঘটনা দেখে মানুষ আশ্চর্য হলো। নবিজি (সা.) বললেন, ‘এই দুই নারী এমন বিষয় থেকে রোজা রেখেছে, যা আল্লাহ তাদের জন্য হালাল করেছেন এবং এমন বিষয় ভক্ষণ করেছে, যা আল্লাহ তাদের জন্য হারাম করেছেন। তারা দুইজন একসঙ্গে বসেছে এবং মানুষের গিবত করেছে। এটা হলো, তারা মানুষের যে গোশত খেয়েছে তা।’ (তাখরিজুল ইহইয়া: ১/৩১৫)
আল্লাহ আমাদেরকে এমন পরিণতি থেকে রক্ষা করেন। এটা অত্যন্ত ভয়ের কথা যে, মানুষ দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকে, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করে অথচ তারা কিছু পাপাচারে লপ্তি হয়ে যাবতীয় নেক ও প্রতিদান ধ্বংস করে ফেলে। রোজাদারের জন্য আবশ্যক হলো হারাম কাজ থেকে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রক্ষা করা। সুতরাং সে হারাম কথা বলা থেকে জিহ্বাকে বিরত রাখবে, হারাম বিষয় শ্রবণ করা থেকে কানকে বঁাচাবে, হারাম দৃষ্টি থেকে চোখ হেফাজত করবে। মন্দ চিন্তা থেকে মন-মস্তিষ্ককে রক্ষা করবে। হারাম খাবার ও পানীয় থেকে নিজের পাকস্থলীকে বঁাচাবে। তবেই সে রোজা তার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হবে। নতুবা এই রোজা পরকালে তার জন্য আক্ষেপের বিষয় হবে।
আল্লাহ সবাইকে যথাযথভাবে রোজা রাখার তাওফিক দিন। আমিন।
-699ca4671fccf.jpg)