শবে বরাতেও যাদের ক্ষমা নেই
‘শবে বরাতের মহিমান্বিত রাতেও শিরক, হিংসা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীসহ ৫ শ্রেণির মানুষকে ক্ষমা করেন না মহান আল্লাহ; প্রয়োজন খাঁটি তওবা।’
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ইসলাম ধর্মে কিছু রাতকে এমন মর্যাদাপূর্ণ করা হয়েছে, যেগুলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমা লাভের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে।
শাবান মাসের মধ্যরাত যা শবে বরাত নামে পরিচিত, এটি তেমনই এক মহিমান্বিত রাত। হাদিস শরিফে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলা হয়েছে। এই রাতে আল্লাহ তাআলা অগণিত বান্দার গুনাহ ক্ষমা করেন, রিজিকের ফয়সালা করেন এবং স্বীয় রহমতের দুয়ার প্রশস্ত করে দেন।
এই বরকতময় রাতেও কিছু মানুষ এমন আছে, যারা নিজেদের কিছু মারাত্মক অপরাধের কারণে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। নিম্নে এমন কয়েকটি শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করা হলো-
শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি (মুশরিক): যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কাউকে শরিক করে, তার জন্য ক্ষমার বিষয়টি অত্যন্ত দুরূহ। শিরক এমন গুরুতর অপরাধ, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি এ পাপ ক্ষমা করেন না।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তাঁর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করাকে ক্ষমা করেন না, তবে এর চেয়ে ছোট অপরাধ তিনি যাকে চান ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮) সুতরাং শিরকের ওপর অটল থেকে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি শবে বরাতের রহমত থেকেও বঞ্চিত থাকবে।
বিদ্বেষে আক্রান্ত ব্যক্তি (মুশাহিন): যার অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতায় কলুষিত, সে-ও আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া কারও প্রতি শত্রুতা লালন করা মারাত্মক গুনাহ।
ইমাম আওজায়ি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ‘সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।’
রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পরস্পর শত্রুতায় লিপ্ত দুই ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত মিলমিশ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ক্ষমা স্থগিত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)
ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী: অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়ংকরতম অপরাধগুলোর একটি। নবিজি (সা.) এ অপরাধকে কুফরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাদিস শরিফে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ এবং তাকে হত্যা করা কুফরি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৭৬)
হত্যাকে রসুলুল্লাহ (সা.) সেই সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা মানুষের ইহকাল ও পরকাল ধ্বংস করে দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৬৬)
এ অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিও শবে বরাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী: রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। এটি আল্লাহর অভিশাপ ডেকে আনে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের সম্পর্কে বলেন, ‘ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির ও দৃষ্টিহীন করেন।’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২২-২৩)
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪)
এমনকি তাদের আমলও আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। (আদাবুল মুফরাদ, আয়াত: ৬১)
তাই শবে বরাতসহ ফজিলতপূর্ণ রাতগুলোতেও তারা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে।
টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী: পুরুষদের জন্য অহংকারের উদ্দেশ্যে টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখা শরিয়তে নিষিদ্ধ ও হারাম। এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্কতা প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকারের প্রদর্শনের জন্য কাপড় ঝুলিয়ে হাঁটে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে তাকাবেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘টাখনুর নিচে ঝুলে থাকা কাপড় জাহান্নামের শাস্তির কারণ হবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৩৩১)
এ ছাড়া পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি এবং নেশায় আসক্ত মানুষও শবে বরাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে বলে হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তবে সব কিছুর পরও আল্লাহ তাআলার রহমত অসীম ও সীমাহীন। কেউ যদি আন্তরিক অনুতাপের সঙ্গে তওবা করে, গুনাহ পরিত্যাগ করে এবং ভবিষ্যতে আর সে পথে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকেও ক্ষমা করে দেন। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা তওবা করে, ইমান আনে ও সৎকর্মে আত্মনিয়োগ করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলো নেকিতে রূপান্তর করে দেন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭০)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ, রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।