সাগরপথ নয়, বৈধ পথেই গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
মতিউর রহমান মুন্না, গ্রিস থেকে
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম
ভূমধ্যসাগরের নীল জল অনেক বাংলাদেশির কাছে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নের পথ। তবে সেই পথের প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে থাকে অনিশ্চয়তা, দালালচক্রের প্রতারণা, বিপুল অর্থের ঝুঁকি ও জীবন হারানোর ভয়। তবু ইউরোপে কাজের আশায় প্রতিবছর অনেকে পাড়ি জমান অনিয়মিত ও বিপজ্জনক সাগরপথে। এ পথে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
গত কয়েক বছর ধরে সাগরপথে ইতালিতে প্রবেশকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম অবস্থানে থাকলেও ২০২৬ সালে এসে নতুন এক রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এবার ইতালির পাশাপাশি লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিরাই শীর্ষে উঠে এসেছে।
তবে এই বাস্তবতায় এবার অন্য একটি পথের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, বৈধ শ্রম অভিবাসনের পথ।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নীতি কঠোর করছে, গ্রিসও নিয়েছে কড়াকড়ি অবস্থান। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারের প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে গ্রিক সরকার। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত শ্রম অভিবাসনবিষয়ক সমঝোতা স্মারক নবায়নের বিষয়েও ইতিবাচক বার্তা এসেছে।
গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিসের সঙ্গে সম্প্রতি গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনার বৈঠকে উঠে আসে বিষয়টি। বৈঠকে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি বৈধ শ্রম অভিবাসন সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিক মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হবে এবং বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গ্রিসে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করা আশ্রয়প্রার্থীদের বৈধ থাকার সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
অর্থাৎ গ্রিসের বার্তাটি অনেকটা এমন- অবৈধ পথে নয়, প্রয়োজনীয় শ্রমিক আসুক বৈধ প্রক্রিয়ায়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রম অভিবাসন নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০২২ সালে। ওই সমঝোতার আওতায় প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪ হাজার কর্মী নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গ্রিসে অবস্থানরত প্রায় ১৫ হাজার অনিয়মিত বাংলাদেশিকে বৈধতার আওতায় আনার সুযোগ। কাগজে-কলমে এটি ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বড় একটি সম্ভাবনা। কিন্তু বাস্তবায়নের পথে তৈরি হয় নানা জটিলতা।
বাংলাদেশে গ্রিসের নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বাংলাদেশিদের। ফলে একজন বাংলাদেশি কর্মীর বৈধভাবে গ্রিসে আসার পথ অনেক সময় সহজ ছিল না। ভিসা প্রক্রিয়াকে ঘিরে দালালচক্রের সক্রিয়তা ও নানা অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে একদিকে গ্রিসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রয়োজন ছিল, অন্যদিকে বৈধ পথে আসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই সুযোগ সবার কাছে সহজে পৌঁছায়নি।
কেন বাংলাদেশি কর্মীদের প্রয়োজন গ্রিসের?
গ্রিসের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করে পর্যটন, কৃষি, নির্মাণসহ বিভিন্ন শ্রমনির্ভর খাতের ওপর। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন তৈরি হয়।
কৃষি খাতেও মৌসুমি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। নির্মাণখাতেও দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে। এই শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়ানো হলে দুই পক্ষই লাভবান হতে পারে। গ্রিস পেতে পারে প্রয়োজনীয় কর্মী। বাংলাদেশ পেতে পারে ইউরোপের একটি বৈধ শ্রমবাজার। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসনের বিকল্প হিসেবে তৈরি হতে পারে একটি বৈধ পথ।
এবার দালালের বদলে 'বোয়েসেল'
গ্রিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নিতে চান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এর মাধ্যমে।
এরই ধারাবাহিকতায় গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা সম্প্রতি বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বোয়েসেলের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া কীভাবে আরও দ্রুত, নিরাপদ, নৈতিক ও ব্যয়সাশ্রয়ী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছভাবে কর্মী নির্বাচন, নিয়োগ, ভিসা ও যাত্রার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে গ্রিসে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশিদের দালালনির্ভরতা অনেকটাই কমতে পারে। আর দালালনির্ভরতা কমলে কমতে পারে প্রতারণার ঝুঁকিও।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার বদলে যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার পথ সত্যিই সহজ হয়, তাহলে এটি শুধু কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়। এটি বদলে দিতে পারে ইউরোপে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের একটি প্রচলিত গল্পও। সাগরপথের অনিশ্চয়তার বদলে বৈধ শ্রমবাজার। এখন সেই পথ কতটা বাস্তব হয়, সেটিই দেখার বিষয়।