শিক্ষার্থীদের সঠিক বিকাশে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভূমিকা | daily-sun.com

শিক্ষার্থীদের সঠিক বিকাশে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভূমিকা

সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন     ১১ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৩:২৯ টাprinter

শিক্ষার্থীদের সঠিক বিকাশে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভূমিকা

সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, নরসিংদী।

পৃথিবীর সব মহামানব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন আপন চরিত্রবলে। তারা তাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন।

একটা দেশ ও জাতির জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। কোন দেশ বা জাতির টেকসই উন্নয়নে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা অত্যাবশ্যকীয়।

 

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি না পেলে কখনোই পূ্র্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার নৈতিকতা ও মূল্যবোধই তাকে পাকিস্তানীদের অনৈতিক নিগ্রহ থেকে বাঙ্গালীকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তাই বলা যায় মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও পরিশীলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বৈশল্যকরণী ও প্রথম সূর্যসিঁড়ি হলো নৈতিকতা। নীতির প্রতি মূল্যায়ন, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকেই আসে নীতিবোধ আর এই নীতিবোধ থেকেই নৈতিকতা। অর্থাৎ নিয়ম থেকে নীতি, আর নীতি থেকে নৈতিকতা। অপরদিকে  নিজের বুদ্ধি ও সক্ষমতার দ্বারা প্রত্যেকটি জিনিস ও কাজের ভালো-মন্দ, দোষ-গুণ বিচার বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করার মানসিকতাই হলো মূল্যবোধ।

 

সুষ্ঠু, গতিশীল সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম আর এ ধরণের শিক্ষা মূলত একটি চলমান প্রশিক্ষণ।

এটা শেখার জন্য ব্যবস্থাপনা, অনুশীলন ও চর্চার প্রয়োজন জরুরি। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার বীজ গ্রোথিত হয় পরিবারে কিন্তু বিকশিত হয় সমাজে। এই সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ার ধাপ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রে নিহিত। শিশুর বা সন্তানের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উৎস হলেন তার মাতা-পিতা ও অভিভাবকেরা। শৈশবে শেখা মূল্যবোধই প্রতিটি শিশু তাদের পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নানাভাবে বিকাশ ও পরিচর্যা করে থাকে। সে জন্য খোদ মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দেরও নৈতিক গুণাবলি ধারণ করতে হবে। তাদের জীবন ও কর্ম সন্তানের জীবনে সরাসরি প্রতিফলিত হয়। তাঁরা যদি সৎ ও সুন্দর পরিশীলিত চরিত্র ও মার্জিত আচরণের অধিকারী হন, সন্তানেরা দেখে দেখেই তা আয়ত্ত করবে। সন্তানেরা তাদেরই প্রতিবিম্ব হবে।

 

এই শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হবে আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিবেন শিক্ষকরা। শিক্ষাজীবন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন ও চর্চার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। আমাদের দেশে শিক্ষার তিনটি স্তর রয়েছে যেমন প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা। তন্মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরটি যে কোন শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন বিকাশে সর্বোচ্চ সহায়ক সময়। প্রাথমিক শিক্ষাই একজন শিক্ষার্থীর অঙ্কুরোদগমের সময়। তাই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। কোমলমতি শিশুদের মননে শৈশব থেকেই জাগ্রত করতে হবে নীতিবোধ। শিক্ষকরা তাদের অভিভাবক হিসেবে সততা, দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা দেবেন। আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মের কোন বিকল্প নেই কথাটি মাথায় রেখে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চাকেন্দ্র হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমকে বেগবান করতে হলে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নৈতিক শিক্ষা সম্বলিত গল্প, কবিতা, ছড়া ও উপন্যাস ইত্যাদির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত কাজগুলো নিয়ে শ্রেণীকক্ষে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভালো কাজ করতে উৎসাহিত এবং খারাপ কাজে নিরুৎসাহিত  করতে হবে। তারা যেন তাদের আশেপাশের মানুষদের সুখে দুঃখে, বিপদে, আনন্দে পাশে থাকে তা শেখাতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনের জানালা খুলে দিতে হবে যাতে ঠিকমতো তাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে।

 

এক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব শিক্ষকদেরই নিতে হবে। তাদেরও নৈতিক গুণাবলির অধিকারী হতে হবে। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে দেশে জঙ্গিবাদ, মাদক, ধর্ষণ, সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের এই সংকটকালে শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক গুণাবলির বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার কোনো বিকল্প নেই। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অন্তরে ধারণ করাতে শিক্ষকদের সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই আমাদের শিক্ষার্থীরা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে নৈতিকতাসম্পন্ন, আদর্শবান ও মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে।

 

বিদ্যালয়ের স্তর পার করে যখন একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণ করে তখন তার ভেতরে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটা বিকশিত হয়। আগে যেই মূল্যবোধ ছিলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক তা পূর্ণতা লাভের পথে পরিব্যাপ্ত হয় সামাজিক পরিমণ্ডলে। শৈশবের শিখে আসা ধ্যান-ধারণার বীজটি তখন চারাগাছ থেকে বৃক্ষে পরিণত হওয়ার পথে ধাবিত হয়।

 

আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তায় সমাজে কেন্দ্রীভূত হওয়া চেতনা ও নীতি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক একটি রূপ ধারণ করে। আশৈশব লালন করা নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধ (ethics, morals and values) তখন সমাজ ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সাহচর্যে নৈতিকতার চর্চা হয় নিজস্ব স্বকীয়তায়। কিন্তু যেই নৈতিকতার বীজটি অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে পরিপূর্ণ বৃক্ষে রূপান্তরিত হলো তার সূচনা হয়েছিলো সেই শৈশবের স্কুল ঘরটিতে। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চার বিকল্প নেই।

 

এছাড়াও শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রায় প্রতিটি ধর্মেই করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বলা আছে। ধর্মের প্রকৃত পাঠই শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে কেউ যাতে শিক্ষার্থীদের ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের উপর পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রভাব প্রকট।

 

সুতরাং আমাদের সমাজ জীবনের প্রতিচ্ছায়া শিক্ষার্থীর মন, মানস ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অনুশীলন যেহেতু সমাজের দ্বারাই পূর্ণতা পায় এজন্য সহায়ক পরিবেশ; ন্যায়বিচার, সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে৷ নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ অনুশীলন মানুষকে তার শেকড়কে ভালবাসতে শেখায়, তার মাটিকে ও মানুষকে আপন করে নিতে শেখায় এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বকীয়তা অর্জন করেছি সেই স্বকীয়তা সততার মাধ্যমে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের মননে তা প্রোথিত করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এ দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী তার পরিবার, বিদ্যাপীঠ ও সমাজ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ পাবে।

 

সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন: জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, নরসিংদী।


Top