জামিন পেলেন ভিকারুননিসার শিক্ষক হাসনা হেনা | daily-sun.com

জামিন পেলেন ভিকারুননিসার শিক্ষক হাসনা হেনা

ডেইলি সান অনলাইন     ৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৮:৩৩ টাprinter

জামিন পেলেন ভিকারুননিসার শিক্ষক হাসনা হেনা

 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে গ্রেফতার শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ রবিবার (৯ ডিসেম্বর) বিকেলে এ জামিন মঞ্জুর করেন।

পল্টন থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক জালাল উদ্দীন বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।


তিনি জানান, পুলিশ রিপোর্ট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।


এর আগে বৃহস্পতিবার (৬ ডিসেম্বর) বেলা ৩টা ২০ মিনিটে ডিবি পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে। এ সময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামরুল ইসলাম।


আবেদনে তিনি আরও বলেন, শিক্ষিকা জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে সুষ্ঠু তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেন। অপরদিকে শিক্ষিকার আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন তার জামিন চেয়ে আবেদন করেন।


শুনানিতে আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। প্রধান শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীর (অরিত্রী) অভিভাবককে ডাকতে বলায় উনি ডেকেছেন। এর বেশিকিছু তিনি জানেন না।

তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হেমায়েত হোসেন শুনানিতে বলেন, তিনি শিক্ষিকা নামের কলঙ্ক। তার জামিন নামঞ্জুর করা হোক।


উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সাইদ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।


এর আগে বুধবার (৫ ডিসেম্বর) রাত ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়।

 


গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, আমার কাজ হলো কোনো মেয়ে যদি ঝামেলা করে তাহলে তার বাবা-মাকে নিয়ে প্রিন্সিপালের কাছে দাঁড় করানো। এ ক্ষেত্রে মোবাইল পাওয়ায় আমি তাই করেছিলাম। এ ছাড়া আমার কোনো দায় নেই। অরিত্রির বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। অধ্যক্ষ আমাকে যা বলেছেন আমি তাই করেছি।


এদিকে শিক্ষিকা হাসনা হেনার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙালেন প্রতিষ্ঠানটির সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হাসিনা বেগম। রবিবার (৯ ডিসেম্বর) দুপুর পৌনে ১টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির বেশকিছু শিক্ষককে নিয়ে গেটের বাইয়ে এসে ‘অনশন’ কর্মসূচি পালন করা শিক্ষার্থীদের পানি পান করান তিনি।


এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের প্রতি ভালোবাসার টানে তোমরা আন্দোলনে নেমেছো। তোমাদের এই ভালবাসায় আমরা অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু আমরা ক্লাসে বসে থাকবো আর তোমরা ক্লাস বর্জন করে বাইরে বসে অনশন করবে তা হতে পারে না। অনশন করতে হয় সবাই একসাথে কবরো। ’


তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে তাই আইনিভাবে এটি মোকাবেলা করা হবে। আইনের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এ অবস্থায় তোমরা যদি আন্দোলন অব্যাহত রাখ তাহলে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করবে। ’


পরে তিনি শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান এবং অন্যান্য শিক্ষকদের সহযোগিতায় তাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিয়ে যান।

 


এর আগে সকাল ১০টা থেকে শিক্ষক হাসনা হেনার মুক্তির দাবিতে প্রতিষ্ঠানটির মূল ক্যাম্পাসের গেটের সামনে বসে প্রায় দু’শ শিক্ষার্থী ‘অনশন’ কর্মসূচি পালন করে।


এ ছাড়া দুপুরে দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে একটি স্মারকলিপিও জমা দিয়েছে তারা।


এসময় এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হাসনা হেনা আপার মুক্তির দাবিতে আমরা আজ সকাল থেকে অনশন আন্দোলন শুরু করেছি। যতক্ষণ আমার মাকে (শিক্ষক) ফিরে না পাচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই অনশন ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে। ’


তিনি আরও বলেন, ‘বিচার চাইতে গিয়ে কেন অবিচার হবে? আমরা অরিত্রীর আত্মহত্যার প্ররোচনার বিচার দাবি করেছি, অথচ বিচারের নামে করা হচ্ছে অবিচার। আমাদের মায়ের মতো ক্লাস শিক্ষক হাসনা হেনা আপাকে গ্রেফতার করে জেলে নেয়া হয়েছে। তার মুক্তি ছাড়া আমরা ক্লাসে ফিরে যাব না। ’


এদিকে একই দাবিতে গত শুক্রবার ও শনিবার বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ক্লাস বয়কট করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আজ রবিবার কলেজ শাখার শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না গিয়ে কলেজ ইউনিফর্ম পরে বেইলি রোডের ১নং গেটের সামনে রাস্তার পাশে বসে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।  
 

দেখা গেছে, ‘আইন তোমাকে ধিক্কার, যদি নির্দোষ শিক্ষিকার স্থান হয় কারাগারে’; ‘ফিরব না ফিরব না, মাকে ছাড়া ফিরব না’; ‘মুক্তি চাই, মুক্তি চাই, আমার মায়ের মুক্তি চাই’; ‘মাকে ছাড়া ফিরব না’; ‘বিচার করতে গিয়ে কেন অবিচার’- এমন নানা স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের চারপাশে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা। তারাও শিক্ষার্থীদের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন।

 


একই ভাবে শনিবার আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড রয়েছে। সেগুলোতে ‘আমার মায়ের অপমান মানবো না, মানবো না’; ‘আমার মা নির্দোষ, নির্দোষ, নির্দোষ’; ‘মুক্তি চাই মুক্তি চাই আমার মায়ের মুক্তি চাই’; ‘হাসিনা আপার মুক্তি চাই সুষ্ঠু তদন্ত চাই’; ‘যাদের হাতে মানুষ গড়া, তাদের কেন হাতকড়া’; ‘শিক্ষক যদি সম্মান না পায় এমন শিক্ষার দরকার কী?’; ‘মাকে ছাড়া ফিরবো না’; ‘অরিত্রী আমার বোন হলে, হেনা আপাও আমার মা’; ‘নির্দোষের মুক্তি চাই’য়ের মতো বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে।


প্রসঙ্গত, গত সোমবার (৩ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় শিক্ষার্থী অরিত্রি। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।


অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষার সময় অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়ার পর তার বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে ‘অপমান করেছিলেন’ অধ্যক্ষ। সে কারণে ওই কিশোরী আত্মহত্যা করেন। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, অরিত্রী রবিবার (২ ডিসেম্বর) বার্ষিক পরীক্ষায় মোবাইল ফোনে নকলসহ ধরা পড়েছিলেন। এ ঘটনার পর থেকে উত্তেজনা চলছে বেইলি রোডের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে।


গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্টন থানায় ‘আত্মহত্যার প্ররোচণাকারী’ হিসেবে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আখতার ও প্রভাতী শাখার শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনার বিরুদ্ধে মামলা করেন অরিত্রীর বাবা।


এ ঘটনায় ভিকারুননিসার শিক্ষক আতাউর রহমান, খুরশিদ জাহান এবং গভর্নিং বডির সদস্য ফেরদৌসী বেগমকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও র‌্যাবকে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর প্রেক্ষিতে ওই রাতেই হাসনা হেনাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৬ ডিসেম্বর) শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।


এ ব্যবস্থা নেয়ার পরও ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরা স্কুলের সামনে দিনভর বিক্ষোভ দেখায়। তাদের দাবি ছিল, অরিত্রীর বাবা-মায়ের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষকে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যকে পদত্যাগ করতে হবে।


এ পরিস্থিতিতে পর্ষদ চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার বৃহস্পতিবার বিকেলে শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে ধাপে ধাপে সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে যায়।


এদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে তিন শিক্ষককে বরখাস্তের পর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ এবং প্রভাতী শাখার প্রধান পদে নতুন দুই শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।     


প্রতিষ্ঠানটির নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়েছেন কলেজ শাখার অর্থনীতির শিক্ষক সহকারী অধ্যাপিকা হাসিনা বেগম। আর প্রভাতী শাখার প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন মহসিন তালুকদার।


ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার শুক্রবার (৭ ডিসেম্বর) রাতে এ কথা জানান।

 


Top