প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর প্রদর্শনী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর | daily-sun.com

প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর প্রদর্শনী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর

ডেইলি সান অনলাইন     ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ১৬:৪৬ টাprinter

প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর প্রদর্শনী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রত্ননাটক করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এরই ধারাবাহিকতায় আড়াই হাজার বছরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’ মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

আগামী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রযোজনায় ড. সেলিম মোজাহারের রচনায় ও লিয়াকত আলী লাকীর নির্দেশনায় নাটকটি প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে।

 

চুড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০-২২ নভেম্বর বগুড়ার মহাস্থানগড়ে মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমি প্রযোজিত এই প্রত্ননাটকটি ৩৫০ জন শিল্প-কলাকুশলীর অংশগ্রহণে নির্মিত প্রত্ননিদর্শন মহাস্থানগড়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপনা।

 

আগামী ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় উদ্ধোধনী মঞ্চায়নের উদ্ধোধন করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ, প্রধান অতিথি হিসেব উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক।

 

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মঞ্চসারথি আতাউর রহমান, বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক আবদুস সেলিম, প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, বগুড়া জেলার জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ, বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূইঞা বিপিএম।

 

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের যে প্রাচুর্যময় সম্ভার রয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনসমূহ তার মধ্যে অন্যতম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই নির্দশনগুলোর মধ্যে বগুড়ার মাহাস্থানগড় বিশেষ তৎপর্যপূর্ণ। মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী একসময় বাংলার রাজধানী ছিল।

প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে জনপদ গড়ে উঠেছিল। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত মহাস্থানগড়কে ২০১৬ সালে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

 

প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন সময়ের নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছিলো। ‘মহাস্থান’ প্রত্ননাটকের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন সময়ের শাসন শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থানটি একসময় ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও পরণত হয়েছিলো। ধর্মের বাণী বুকে নিয়ে কেউ মানবতার কথা বলেছেন কেউ আবার মানুষের অধিকার নষ্ট করেছেন। এসব কীর্তি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ‘মহাস্থান’ নাটকে।

 

এ প্রসঙ্গে নাটকটির নির্দেশন লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘ পৃথিবীতে এভাবে আর্কিও ড্রামার ইতিহাস নেই। এর কাজ প্রত্ন-ইতিহাসকে দুশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করে শিল্পে রূপ দেয়া। মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমগ্র বাঙলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প। মহাস্থান, কোটি বছরজুড়ে এ-মাটির জেগেওঠার কথা। হাজার হাজার বছর ধরে তার মানব বসতির কথা। ’ নাট্যকার সেলিম মোজহার বলেন, ‘বাঙলার প্রাচীনতম রাজধানী পুন্ড্রনগরের ‘মহাস্থন’কে কেন্দ্রভূমিতে রেখে-মহামুনি গৌতম বুদ্ধের বাঙলায় আগমনকাল থেকে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ কালব্যক্তির এ-নাট্য-আখ্যানে পুরো গল্পটাকে এক সাথে বলার চেষ্টা হয়েছে। বাঙ্গালা অঞ্চলের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পট ও তার পরিবর্তনের ইতিহাসের ‘জানা ও জনপ্রিয়’ গল্পপ্রবাহ এ-নাটকের অখ্যানভাগ।

 

মহাস্থান নাটকে আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে সময়ের পরম্পরায় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত সময়কালকে একক গ্রন্থনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই নাটকে প্রাচীন শিকারযুগ থেকে শুরু করে বৈদিকযুগ, আদিবাসি পর্ব, রামায়নের গীত, কালিদাসের কাব্য, চর্যাপদ, সুফিসামা, বৈষ্ণব পদাবলী, ব্রাহ্মসংগীত, লোকগান, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ব্রতচারীদের গান, পঞ্চকবির গান, ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস, কাব্য-গীত ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা পালাগানরূপে প্রকাশিত হয়েছে।

 

নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাস ঐতিহ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি আমাদের যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের আলোকিত অধ্যায় রয়েছে, সেটাই মহাস্থান নাটকের মধ্যদিয়ে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ইতোপূর্বে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর স্থাপনা নিয়ে দুইটি প্রত্ননাটক মঞ্চস্থ করেছে। ২০ এপ্রিল ২০১৪ রবিবার নওগাঁস্থ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে দেবাশীষ ঘোষের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছিলো দেশের প্রথম প্রত্ননাটক ‘সোমপুর কথন’। বৌদ্ধ বিহারে প্রত্ননাটকটি উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও বিশিষ্ট নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর এমপি।

 

নরসিংদী জেলার উয়ারী বটেশ্বর খননের মাধ্যমে যে আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হয়েছে, সেই নিদর্শনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে মঞ্চনাটক ‘উয়ারী-বটেশ্বর’। তানভীর আহমেদ সিডনীর রচনায় এটির নির্দেশনা দিয়েছেন সরাট প্রামানিক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ৬ জুন ২০১৪ নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, নাসির উদ্দীন ইউসুফসহ অনেকে। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক সারা আরা মাহমুদ।

 

এছাড়াও নাট্য প্রযোজনা নির্মাণের অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ‘প্রত্ন আর্ট ক্যাম্প ২০১৮’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ জন চিত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে দিনব্যাপী মহাস্থানের ১০টি স্থানে এই আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। স্থানগুলো হলো নগর রক্ষা দেয়াল (জাদুঘর), ভাসু বিহার, বেহুলার বাসরঘর, ঘবিন্দ ভিটা, জুগির ভবন, বৈরাগির ভিটা, জাহাজ ঘাট, তোতারাম প-িত বাড়ি, পশুরামের ভবন, জিয়ুত কুন্ঠ জাদুঘরের ড্রইং। এছাড়াও বগুড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের দশজন শিক্ষার্থী আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছেন। আর্ট ক্যাম্পে শিল্পীরা মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন স্থাপনার ক্যানভাস পেইন্টিং ও স্কেচ করেন। আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী চিত্রশিল্পীরা হলেন- আরিফুর রহমান তপু, কুন্তল বাড়ৈ, কাপিল চন্দ্র রায়, শারমিন আক্তার লিনা, কামরুন নাহার ময়না লুম্বিনী দেওয়ান, পল্লব কুমার মোহন্ত, তিতাস চাকমা, আকাশ চন্দ্র সরকার এবং সুজন মাহাবুব।


Top