শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত আইয়ুব বাচ্চু | daily-sun.com

শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত আইয়ুব বাচ্চু

ডেইলি সান অনলাইন     ১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ১৩:৫২ টাprinter

শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত আইয়ুব বাচ্চু

 

অনুরাগী ও ভক্তের শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত কিংবদন্তি ব্যান্ড শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। শেষবারের মতো কিংবদন্তি এ শিল্পীকে দেখতে শহীদ মিনারে ভীড় করেন হাজারও ভক্ত।

শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতারাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় প্রয়াত এ শিল্পীকে। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও শ্রদ্ধা জানিয়েছে তার প্রতি।


শ্রদ্ধা জানাতে আসা অনেকের চোখেই ছিল জল। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানোর এ পর্বের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।


শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে কিংবদন্তি এ সঙ্গীতশিল্পীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছে। এর আগ সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি স্কয়ার হাসপাতাল থেকে রওনা দেয়।


শ্রদ্ধা জানাতে এসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, তার গানে ছিল দেশ মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তিনি এদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতকে অনেক উপরে নিয়ে গেছেন। তার অবদান এ জাতি ভুলবে না।

 


নাছির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, আইয়ুব বাচ্চু ছিল প্রচন্ড আবেগী। এ আবেগ তার জন্য কখনো ছিল সহায়ক, কখনো বাধা। তবে তিনি কখনো অন্য কারো জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াননি। প্রয়োজনে নীরবে সরে গেছেন, কারো সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাননি; ব্যান্ডের জন্য তার যে লড়াই সেটা এ প্রজন্মের জন্য তা আদর্শ শিক্ষা।


শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফা বলেন, আইয়ুব বাচ্চু ক্ষণজন্মা। তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ড আন্দোলনের একজন অন্যতম পথিকৃৎ। সুরে সুরে তিনি তিন প্রজন্মকে এক সুঁতোতে বেঁধেছিলেন। তার মতো শিল্পী সবার জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণা।


কথা সাহিত্যিক ও সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, আইয়ুব বাচ্চু শুধু এ দেশে নয়, সীমানা পেরিয়ে ওপার বাংলাতেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তার গান এদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অমূল্য সম্পদ। তিনি বেঁচে থাকবেন ভক্ত অনুরাগীদের মাঝে গেয়ে যাওয়া অসম্ভব সব জনপ্রিয় গানের মাধ্যমেই।


শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে জুমার নামাজের পর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মগবাজারে কাজি অফিস গলিতে আইয়ুব বাচ্চুর গান তৈরির কারখানা ‘স্টুডিও এবি কিচেন’-এ শেষবারের মতো তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় জানাজা। চ্যানেল আইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ আবারও স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে।  


এরপর রাতে সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা তার মরদেহ নিয়ে যাবেন তার জন্মস্থান চট্টগ্রামে। সেখানে শনিবার (২০ অক্টোবর) জানাজা শেষে শহরের পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে আইয়ুব বাচ্চুকে দাফন করা হবে।

 


প্রসঙ্গত, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পথে বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে তিনি মারা যান। বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের এই কিংবদন্তীর মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন এ জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী। তিনি একাধারে গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট তিনি।


এর আগে তিনি দশ বছর সোলস ব্যান্ডের সাথে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সঙ্গীতজগতে তার যাত্রা শুরু হয় ফিলিংসের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। অত্যন্ত গুণী এই শিল্পী তার শ্রোতা-ভক্তদের কাছে এবি (AB) নামেও পরিচিত। তার ডাক নাম রবিন। মূলত রক ঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিকাল সঙ্গীত এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন তিনি।


তার কণ্ঠ দেয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। গানটির কথা লিখেছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি সোলস ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত রক্তগোলাপ আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম প্রকাশিত একক অ্যালবাম। এই অ্যালবামটি তেমন একটা সাফল্য পায়নি। আইয়ুব বাচ্চুর সফলতার শুরু তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ময়না (১৯৮৮) এর মাধ্যমে।


১৯৯১ সালে বাচ্চু এলআরবি ব্যান্ড গঠন করেন তিনি। এই ব্যান্ডের সাথে তার প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম এলআরবি প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। এটি বাংলাদেশের প্রথম দ্বৈত অ্যালবাম। এই অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম ‘সুখ’ ও ‘তবুও’ বের হয়। সুখ অ্যালবামের ‘সুখ’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রূপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’ উল্লেখযোগ্য গান।

 


‘চলো বদলে যাই’ সঙ্গীত জগতে অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। গানটির কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন আইয়ুব বাচ্চু নিজেই। ১৯৯৫ সালে তিনি বের করেন তৃতীয় একক অ্যালবাম কষ্ট। সর্বকালের সেরা একক অ্যালবামের একটি বলে অবিহিত কড়া হয় এটিকে। এই অ্যালবামের প্রায় সবগুলো গানই জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’। একই বছর তার চতুর্থ ব্যান্ড অ্যালবাম ঘুমন্ত শহরে প্রকাশিত হয়। তিনি অনেক বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ বাংলা ছবির অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান। এটি তার গাওয়া প্রথম চলচ্চিত্রের গান।


২০০৯ সালে তার একক অ্যালবাম বলিনি কখনো প্রকাশ হয়। ২০১১ সালে এলআরবি ব্যান্ড থেকে বের করেন ব্যান্ড অ্যালবাম যুদ্ধ। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। ছয় বছর পর তার পরবর্তী একক অ্যালবাম জীবনের গল্প (২০১৫) বাজারে আসে। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। গানের কথা লিখেছেন সাজ্জাদ হোসাইন এবং সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আইয়ুব বাচ্চু নিজে।


আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘রূপালি গিটার’, ‘রাত জাগা পাখি হয়ে’, ‘মাধবী’, ‘ফেরারি মন’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘বার মাস’, ‘হাসতে দেখ’, ‘উড়াল দেব আকাশে’। ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি,’ ‘সেই তুমি কেন অচেনা হলে’, ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘মেয়ে ও মেয়ে’, ‘কবিতা সুখ ওড়াও’, ‘এক আকাশ তারা’ গানগুলো ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে।


গিটারে তিনি সারা ভারতীয় উপমহাদেশে বিখ্যাত। জিমি হেন্ড্রিক্স এবং জো স্যাট্রিয়ানীর বাজনায় তিনি দারুনভাবে অণুপ্রাণিত। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও আছে। ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত এই মিউজিক স্টুডিওটির নাম এবি কিচেন। তিনি ২০১০ সালে ঈদের জন্য নির্মিত ট্রাফিক সিগন্যাল ও হলুদ বাতি শিরোনামের নাটকে অভিনয় করেন।


২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর বাচ্চু ফুসফুসে পানি জমার কারণে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণের পর তিনি সুস্থ হন।


২০১৪ সালের ১৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে 'টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১৪'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে 'বিসিবি সেলিব্রেশন কনসার্ট'-এ অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন নিয়ে মাইলস ব্যান্ডের হামিন আহমেদের সাথে বাচ্চুর বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্বের সূত্রে বাচ্চু ও তার ব্যান্ড এলআরবি বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সদস্যপদ প্রত্যাহার করে।

 

 


Top