ফাঁস প্রশ্নে ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের রেকর্ড, ফল বাতিল ও ডিনের পদত্যাগ দাবি | daily-sun.com

ফাঁস প্রশ্নে ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের রেকর্ড, ফল বাতিল ও ডিনের পদত্যাগ দাবি

ডেইলি সান অনলাইন     ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:৩৮ টাprinter

ফাঁস প্রশ্নে  ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের রেকর্ড, ফল বাতিল ও ডিনের পদত্যাগ দাবি

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের অধীনে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রথমবর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ অবশেষে স্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর পরও সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে।

যেখানে পাস করেছে রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে এ পরীক্ষা বাতিল এবং ‘ঘ’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের পদত্যাগ দাবি করেছেন প্রগতিশীল শিক্ষার্থীরা। অন্যথায় ভিসি কার্যালয় ও ডিন কার্যালয় ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা।


এরই মধ্যে এ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার দাবিতে আমরণ অনশনে বসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী।


বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান মঙ্গলবার (১৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ৩টায় কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসে ফল ঘোষণা করেন। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৭০ হাজার ৪৪০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৮ হাজার ৪৬৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ৪৮ হাজার ৫৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ হাজার ৯৩৬, মানবিক বিভাগের আট হাজার ৭০৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে চার হাজার ১৬৯ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১৩ হাজার ১৩৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে দুই হাজার ৩৫৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।


সেই হিসাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট শিক্ষার্থীর ২৬ দশমিক ২১ শতাংশ উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিভাগ ভিত্তিক হিসাবে বিজ্ঞান বিভাগের ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ, মানবিক বিভাগের ৪৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন।

 


গত শুক্রবার (১২ অক্টোবর) ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শুরুর পৌনে এক ঘণ্টা আগে হাতে লেখা প্রশ্ন ফাঁস হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। হাতে লেখা প্রশ্নের বাংলায় ১৯টি, ইংরেজিতে ১৭টি, সাধারণ জ্ঞান ৩৬টি (বাংলাদেশ ১৬, আন্তর্জাতিক ২০) মোট ৭২টি প্রশ্ন হুবহু মিলে যায়।


সেদিন সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কপিগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান কয়েকজন সাংবাদিক। সেটি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী প্রক্টর সোহেল রানার কাছে জমা দেন তারা। পরীক্ষা শেষে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন হুবহু মিলে যায়।


তাৎক্ষণিক সহকারী প্রক্টর সোহেল রানা বলেন, পরীক্ষার আগে প্রশ্নগুলো বের হলে সেটি ফাঁস হওয়া বলা যেতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালে বের হলে সেটাকে প্রশ্ন ফাঁস বলা যাবে না। আমার মনে হয় কেউ পরীক্ষার হল থেকে ছবি তুলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ চক্রকে আমরা ধরার চেষ্টা করছি। আর এটি হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ক্যাম্পাসের বাইরে কেন্দ্র বেশি হওয়ায়। এ সমস্যাগুলো ক্যাম্পাসের বাইরের কেন্দ্রগুলোতে হয়ে থাকে।


প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এবারের ঘ ইউনিটের ভর্তি ফলাফল নিকট অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। ২০১৩-১৪ সেশনে ঘ ইউনিটে পাসের হার ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৪-১৫ সেশনে ছিল ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ২০১৫-১৬ সেশনে ৯ দশমিক ৯১, ২০১৬-১৭ সেশনে ৯ দশমিক ৮৩ এবং ২০১৭-১৮ সেশনে ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অথচ এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ২১ শতাংশে। যা আগের ফলের দ্বিগুণেরও বেশি।


এমনকি চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন ইউনিটের ফলাফলেও দেখা গেছে এত সংখ্যক শিক্ষার্থী কোনো ইউনিটে পাস করেননি। প্রশ্ন ফাঁসের প্রভাবে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।  


ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এনে পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো।


এদিকে শনিবার (১৩ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগে ৬ জনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এ ঘটনায় রাজধানীর শাহবাগ থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামরুল আহসান।


মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা পরীক্ষার দিন রাত ১২টা ৫ মিনিট থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত প্রশ্নফাঁস করে। তারা মোবাইল সিমকার্ড, ইন্টারনেট, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে ডিজিটাল সিস্টেমে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন দফতরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং তা স্থানান্তর করে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করে আসছিল।


রবিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, সিআইডি প্রশ্নপত্র জালিয়াতি চক্রের ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতাররাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছি। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। কেউ অপরাধ করে ছাড় পাবে না।


গ্রেফতাররা হলেন- জাহিদুল ইসলাম (৪৫), ইনসান আলী রকি (১৯), মোস্তাাকিম হোসেন (২০), সাদমান সালিদ (২১), তানভির আহমেদ (২১) ও আবু তালেব (১৯)।


প্রশ্নফাঁস নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে ভিসি বলেন, তদন্ত কমিটি ডিজিটাল জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস বা ডিজিটাল জালিয়াতি যাই হোক, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার যেকোনো পর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলেও তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ভর্তি বাতিল করা হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।  


প্রশ্ন ফাঁসের পরেও পরীক্ষা কেন বাতিল করা হবে না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এর সঙ্গে জড়িত। অল্প কয়েকজনের জন্য হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে খেলা করার সুযোগ নেই। অভিযুক্তদের বহিষ্কার করা হলে যেসব আসন শূন্য হবে সেখানে নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে কিনা- এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন তিনি।


যারা পাস করেছেন, শুধু তাদের নতুন করে পরীক্ষা নেয়া যায় কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে ভিসি জানান, সেটি করার সুযোগ নেই।


এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। তার কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল- পরীক্ষার আগে যদি একজন শিক্ষার্থীও প্রশ্ন পেয়ে থাকে তাহলে তাকে প্রশ্নফাঁস বলা যাবে কিনা এবং উন্নত দেশের মতো ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন কিনা? উত্তরে কোনো কথা বলেননি তিনি। পরে এর উত্তর দেন প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস বা ডিজিটাল জালিয়াতি যাই হোক না কেন প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

 

প্রসঙ্গত, গত ৮ অক্টোবর প্রকাশ করা হ‌য় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে চারুকলা অনুষদভুক্ত ‘চ’ ইউনিটের অধীনে ১ম বর্ষ বিএফএ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষার ফল। ‘চ’ ইউ‌নি‌টের ১৩৫টি আসনের বিপরীতে অংকন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১ হাজার ৩৮৩জন। এর মধ্যে ২৬৯ জন ভ‌র্তিচ্ছুক পাস ক‌রেছে। অর্থাৎ পাশের হার ১৯.৪৫ শতাংশ।


এর আগে গত ৩ অক্টোবর প্রকাশ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষের ‘ক’ ইউনিটের অধীন প্রথম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার ফল। এতে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩.০৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।  


এবার বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৭৭ হাজার ৫৭২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১০ হাজার ১১৭ জন। ‘ক’ ইউনিটের অধীনে আসন রয়েছে ১ হাজার ৭৫০টি।


এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাবি’র ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে কলা অনুষদভুক্ত ‘খ’ ইউনিটের ১ম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এ বছর ‘খ’ ইউনিটে ৮৬ শতাংশ ভর্তিচ্ছু ফেল করেছেন। অর্থাৎ পাশের হার ১৪ শতাংশ।   


এবার ‘খ’ ইউনিটে ২ হাজার ৩৭৮ আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ৩৫ হাজার ৭২৬ জন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৩৩ হাজার ৮৯৭ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৪ জন। তবে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৪ হাজার ৭৪৭  জন, বা ১৪ শতাংশ।    


এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত ‘গ’ ইউনিটের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সম্মান শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই ইউনিটে শতকরা পাসের হার ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ‘গ’ ইউনিটের ওই পরীক্ষায় এবার অংশ নেয় ২৫ হাজার ৯৫৮ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। এরমধ্যে পাস করে ২ হাজার ৮শ ৫০ জন। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ হাজার ২ জন।


‘গ’ ইউনিটের অধীনে আসন রয়েছে ১ হাজার ২৫০টি।

 

আরও পড়ুন:

 

ঢাবির 'ঘ' ইউনিটের ফল প্রকাশ, পাসের হার ২৬.২১ শতাংশ

 

ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ফল প্রকাশ স্থগিত


ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ


মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রতারণায় ডিজিটাল আইনে প্রথম মামলা

 

 


Top