তথ্যবিকৃতি: ক্ষমা চাওয়া উচিত মিয়ানমারের | daily-sun.com

তথ্যবিকৃতি: ক্ষমা চাওয়া উচিত মিয়ানমারের

ডেইলি সান অনলাইন     ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১৭:০০ টাprinter

তথ্যবিকৃতি: ক্ষমা চাওয়া উচিত মিয়ানমারের

 

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে মিয়ানমারের দুটি সরকারি ওয়েবসাইটে নিজেদের বলে দেখানোয় সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও’কে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়।


গত বছর আগস্টে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী শুদ্ধি অভিযান শুরু করলে সেখান থেকে সাত লাখের বেশি মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

 
বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিম কোণে নয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি দ্বীপ – সেন্ট মার্টিন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই এই দ্বীপের মালিকানা বাংলাদেশের। মিয়ানমারের পপুলেশন বিভাগ ও আরেকটি ওয়েবসাইট সম্প্রতি তাদের মানচিত্র হালনাগাদ করে। এতে সেন্ট মার্টিনকে তাদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়।


মিয়ানমারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত কাজের জন্য শনিবার ছুটির দিনে রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও-কে তলব করে ঢাকা। বাংলাদেশে পররাষ্ট্র দফতরের সমুদ্র বিভাগের সচিব খোরশেদ আলম ও’র হাতে একটি প্রতিবাদলিপি ধরিয়ে দেন।


দূতের সঙ্গে সচিবের বৈঠকটি এক ঘন্টা স্থায়ী হয়েছিলো বলে জানা যায়। দূত স্বীকার করেন যে মানচিত্রে ভুল করে এটি দেখানো হয়েছে।

মিয়ানমার দূত জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি তার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং বাংলাদেশের কঠোর প্রতিবাদের বিষয়টি জানাবেন।


বাংলাদেশর কঠোর প্রতিবাদের মুখে রবিবার দিন শেষে মিয়ানমারের জনসংখ্যা বিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে সেন্ট মার্টিন সংশ্লিষ্ট তথ্য সরিয়ে নেয়া হলেও দ্বীপটিকে এখনো মিয়ানমারের মতো একই রঙ্গে দেখা যাচ্ছে। তবে এতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে অন্য রং ও শেডে দেখানো হয়েছে। এর আগে সেন্ট মার্টিনের উপর কমপিউটারের কারসর রেখে ক্লিক করা হলে যে বিস্তারিত তথ্য ভেসে উঠতো এখন আর তা দেখা যায় না।


মিয়ানমারের এই ‘তথ্যবিকৃতি’র ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে গত আগস্টে রোহিঙ্গা সংকটের উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লেখা একটি নতুন বইয়ে বিদ্রোহী প্রশিক্ষণের ছবি দেখানো হয়, যা আসলে ছিলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ছবি।


মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরে স্বীকার করে যে ভুল করে দুটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।


এ ব্যাপার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মিয়ানমার সরকারের এ ধরনের কাজ ‘অগ্রহণযোগ্য। ’


তিনি বলেন, মিয়ানমার অনেক দিন ধরেই সেন্ট মার্টিন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিতর্ক করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল ইস্যুটির নিস্পত্তি করেছে এবং দ্বীপটি যে বাংলাদেশের সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এই কাজের জন্য মিয়ানমারকে ক্ষমা চাইতে হবে।


মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র নিয়ে বিরোধ: ১৯৩৭ সালে মিয়ানমার যখন আলাদা হয় তখন সেন্ট মার্টিন ছিলো ব্রিটিশ ভারতের অংশ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয় এই দ্বীপ। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ জন্ম নেয়।


বাংলাদেশের দীর্ঘ অবতল আকৃতির সমুদ্র তটরেখার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ ছিলো অনিবার্য। দেশের কক্সবাজার জেলার দক্ষিণ উপকূল থেকে নয় কিলোমিটার দূরে এবং মিয়ানমারের উপকূল থেকে আট কিলোমিটার দূরে নাফ নদীর মুখে সেন্ট মার্টিনের অবস্থান।


দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৭৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা হয়। এতে সেন্ট মার্টিনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকার করা হয়। তবে নাফ নদীতে যাওয়া আসার পথে সেন্ট মার্টিনের চারদিকে বাংলাদেশের জলসীমায় মিয়ানমারের নৌযান অবাধে চলাচল করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়।


কিন্তু ১৯৯৮ সালের ৭ অক্টোবর মিয়ানমার নৌবাহিনী সেন্ট মার্টিনের অদূরে বাংলাদেশী জেলেদের নৌকাবহরে হামলা চালিয়ে কয়েকজন জেলেকে হত্যা করলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক বছর পর ১৯৯৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার নৌবাহিনী আবারো হামলা চালিয়ে এক বাংলাদেশী জেলেকে হত্যা করে। বাংলাদেশ সরকার দুটি ঘটনাতেই মিয়ানমার সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।


বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়: দীর্ঘ তিন দশক ব্যাপক আলোচনার পরও দুই দেশ তাদের সমুদ্র সীমা ও বিশেষ অর্থনৈতিক জোন নিয়ে ঐক্যমতে পৌছাতে ব্যর্থ হয়। দ্বিপাক্ষিকভাবে সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়ে ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের সমুদ্র বিষয়ক আইন (আনক্লস) অনুযায়ী বিষয়টি নিস্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়।


২০১২ সালের ১৪ মার্চ সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (আইটিএলওএস) বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয় এবং বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের ১১১,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা (ইইজেড) হিসেবে দেয়া হয়, যা আকারে প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারদিকে ১২ মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশের টেরিটরিয়াল-সি হিসেবে ঘোষণা করে আইটিএলওএস। মিয়ানমার দাবি করেছিলো দ্বীপটি অর্ধেক করে ভাগ করে দিতে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।


তবে ট্রাইব্যুনাল দুই দেশের ইইজেড ও কনন্টিনেন্টাল সেলফের মধ্যে ইকুইডিস্টেন্স লাইন চিহ্নিত করতে সেন্ট মার্টিনকে বেজ পয়েন্ট ধরার অনুমতি বাংলাদেশকে দেয়নি।


সেন্ট মার্টিনের বর্তমান অবস্থা: ১৯৮৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অনাবাসিক বাংলাদেশী ও বিদেশীদেরকে শুধু সেন্ট মার্টিন যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতো। তবে এখন আবাসিক বাংলাদেশীরাও সেখানে যেতে পারে।


এই দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা সাত হাজারের মতো। তাদের জীবিকার প্রধান উৎস মাছ ধরা ও পর্যটন। এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।


বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজার উন্নয়ন মাস্টার প্লানের আওতায় সেন্ট মার্টিনকে একটি বিশেষ ও ব্যয়বহুল আইল্যান্ড রিসর্টে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

 

- সূত্র: দি ওয়্যার অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top