হলিস লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটো উপন্যাস | daily-sun.com

হলিস লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটো উপন্যাস

ডেইলি সান অনলাইন     ১২ অক্টোবর, ২০১৮ ১৮:৪৯ টাprinter

হলিস লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটো উপন্যাস

 

হলিস লাইব্রেরির পৃষ্ঠপোষতায় আয়োজিত পাঠকের পাতার নবম সভা অনুষ্ঠিত হয় ৬ অক্টোবর । এবারের বই ব্যবচ্ছেদে ছিলো জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ছোটো উপন্যাস ‘সুখবাস’।

এই ধারায় জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ৪টি উপন্যাস লেখেন, যদিও আলোচ্য গ্রন্থ ছিল সুখবাস কিন্তু আলোচকেরা চারটি গ্রন্থ নিয়েই কথা বলেন। অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে, অমল তরণী তার, শূন্য নভে ভ্রমি, স্বপ্নের সীমানায় পারাপার। এবারের মূল আলোচক ছিলেন ড. মাহবুব হাসান।

 

এছাড়া লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন কাজী জহিরুল ইসলাম। নাহার মনিকার আরো একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান আবদুল্লাহ জাহিদ। এ ছাড়া আলোচনা করেন ড. পূরবী বসু। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত উপস্থিত দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং ছোটো উপন্যাসের কাঠামো ব্যাখ্যা করেন। এবারের সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন মুক্তি জহির, নাজনীন মামুন, রওশন হক, ধনঞ্জয় সাহা প্রমূখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ওবায়দুল্লাহ মামুন।

 

‘সুখবাস’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ড. হাসান বলেন, এই উপন্যাসের মূল কাঠামোতে আছে মানুষের পরিযায়ন প্রবণতা।  ‘সে’ চরিত্রটি কি কখনোই কোনো জায়গায় স্থির হতে পেরেছে?  না,  পারেনি। কিংবা বলা যায় স্থির হয়ে বসবাসের যে আকাঙ্ক্ষা, তা নানা কারণে ভেঙে গেছে। এ-উপন্যাসের চরিত্র যেমন সমাজের হয়েও প্রচলিত সমাজের মতো নয়,  তেমনি ভাষাও অপ্রচলিত। ভাষা আমার কাছে মনে হয়েছে কোথাও কোথাও রূপকাশ্রিত। বর্ণনায় কলোক্যালের সঙ্গে ধ্রূপদ শব্দের ব্যবহারও পাই। বাক্যগঠনও সচল নয়। কিছুটা হোচট খেতে হয়।

 

ভাবনার সাথে কেন যেন ঠিক মিলতে চায় না।  জ্যোতিপ্রকাশের ভাষা প্রতীকী, রূপকাশ্রিত,  অ্যালিগরিক্যাল বা মেটাফরযুক্ত। ফলে একের ভেতরে অনেক কিছু পাই আমরা। কাহিনী নেই বলে শতকাহিনী এসে সে চরিত্রের ভেতরে লাফিয়ে পড়ে। ‘সে’ একজন সমাজ পরিবর্তনের কারিগর ছিলেন,  বোঝা যায়,  কিন্তু অস্পষ্ট, নিষিদ্ধ ছবি ঘরে টাঙানোর ঘটনাই তা বলে দেয়। কিন্তু কোথাও এই চরিত্রটি স্থির নয়। ঠিক মানুষের পরিযায়নের স্বভাবের মতো সে কেবল ঘুরপাক খায়। মানুষের নিয়তিই এমন। স্মৃতি, সত্তা,  ভবিষ্যৎ - এই তিনের মিলিত রূপ সুখবাস। কল্পনার এই ব্যবহার বাংলা উপন্যাসকে স্টোরিটেলারদের গৎ থেকে বের করে আনবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, ইতালিয় লেখক জোভানি বোক্কাচ্চো ১৩৫৩ সালে লেখেন ডিকামেরোন। ১৩৪৮ সালে ফ্লোরেন্সে ভয়াবহ প্লেগ দেখা দিলে ৭জন পুরুষ ও ৩জন নারীর একটি দল, অন্য অনেকের মতো, শহর ছেড়ে পালাতে থাকেন। যাত্রাপথে তাঁরা প্রত্যেকে পালাক্রমে গল্প বলেন। সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম আর একদিন প্রার্থনা করা ছাড়া দুই সপ্তাহের ভ্রমণকালে ১০দিনই তাঁরা গল্প বলে কাটান। এভাবে তাঁরা যত্রাপথে ১০০টি গল্প বলেন।

 

এই কাহিনীই ডিকামেরোন। এটিকে নভেলা বলে অভিহিত করা হয়। ইতালিয় শব্দ নভেলা মানে নতুন। এ-থেকেই উপন্যাসের একটি নতুন ফর্ম তৈরী হয়, যেটি নভেলা নামে পরিচিতি পায়। ফ্রান্সের লেখকেরা এই ফর্মটিকে গ্রহণ করেন এবং এই ফর্মে লিখতে শুরু করেন। বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসিকা বলা হয় কলেবরে ছোটো উপন্যাসকে, এ ছাড়া নভেলা বা নভেলেটের অনুকরণে তেমন কোনো কাজ হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

 

তবে আমাদের দেশে ৫/৬ ফর্মার যে উপন্যাসগুলো রচিত হয় এগুলোকে আমরা অনায়াসেই ‘নভেলা’ বা ‘নভেলেট’ গোত্রে ফেলতে পারি। প্রথমবারের মতো একজন বাঙালি লেখক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, প্রকাশ করলেন ‘শূন্য নভে ভ্রমি’, ‘অমল তরণী তার’, ‘স্বপ্নের সীমানায় পারাপার’ এবং ‘সুখবাস’ নামে যে চারটি ছোটো  গ্রন্থ রচনা করেছেন, এগুলো উপন্যাস নয়, গল্প নয়, বড় গল্প নয়, এগুলো হচ্ছে ‘ছোটো উপন্যাস’। তিনি উপন্যাসের বা গল্পের এই আঙ্গিককে বলছেন একটি ভিন্ন শিল্প মাধ্যম।

 

 

তিনি বলেন, ‘বিস্তৃত জীবনজমিনের খবরও সেখানে থাকে, কিন্তু শিল্পসৌকর্যের ব্যবহার, ভাষার ভিন্নতা তাকে স্বাতন্ত্র্য দেয়। সেই অর্থে আধুনিক ছোটো গল্পের সঙ্গেই তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় বেশি। ইঙ্গিতপূর্ণ, ধ্বনিময়, প্রতীকী ভাষার ব্যবহারে আকস্মিক দৃশ্যপট উন্মোচনে বিস্তৃত জীবনের চিহ্ন সর্বত্র ছড়ানো কিন্তু ছোটোগল্পের ভূবনেই তাঁর যাতায়াত বেশি। এক বোহেমিয়ান যুবক, কি তাঁর পরিচয়, কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কিছুই তার যায় না জানা, শুধু জানা যায় সে ভালোবাসে আকাশ, শূন্য নীল আকাশ। মাটির বিছানায় শুয়ে দেখে সে শরতের নীল আকাশ।

 

কখনো আকাশে যদি মেঘ করে, আকাশ যদি ঢেকে যায় দূরাগত মেঘে, তখন সে নিখোঁজ হয়ে যায়। চলে যায় দূরে কোথাও, যেখানে আছে স্বচ্ছ আকাশ, মেঘের আবর্জনাহীন, মুক্ত নীলাকাশ। আকাশই ভালোবাসে সে। আর কিছু নয়। আকাশই তাঁকে টানে। আর কিছু নয়। না সংসার, না সন্তান, না অন্য কোনো পার্থিব বন্ধন। এ-ই এই গ্রন্থের প্রতিবাদ্য। ভীষণ প্রতীকী। কিন্তু কী ভীষণ শক্তি নিয়ে ঢুকে পড়ে পাঠকের মনন-রাজ্যে, তছনছ করে দেয় বোধের জমিন। এই যে একজন মানুষ, কেউ জানে না তাঁর পরিচয়, কোত্থেকে এসেছে, কোথায় সে যাবে, সবই অস্পস্ট। স্পষ্ট যা তা হলো সে ভালোবাসে আকাশ। এর মধ্যে এই বিশ্ব চরাচরে মানুষের আসা-যাওয়ার খেলা খুঁজে পাই আমরা। আবার যখন সে খোঁজে মুক্ত আকাশ তখন টের পাই এক স্বাধীনতাকামী সমাজের উপস্থিতি।

 

 

লেখক শূন্য নভে ভ্রমণ করাতে করাতে আমাদের নিয়ে যান বাংলাদেশের অন্তরের ভেতরে। রাতের অন্ধকারে মাছ শিকারে বেরিয়েছে গ্রাম্যবালা। ছোটাছুটির সুবিধের জন্য অন্ধকারের আড়াল উপজীব্য করে গায়ের দীর্ঘ বসন খুলে রাখে ডাঙ্গায়, নেমে পড়ে জলে, মাছের খোঁজে।

 

 

তিনি আরো বলেন, আধুনিক কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পঙক্তিগুলোর মধ্যে পারম্পর্য ভেঙে দেয়া। অথচ বাক্যের মধ্যে পারম্পর্য তৈরী করাই আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের লক্ষ্য। যে কারণে আমাদের কথাসাহিত্য বেশ সরল। পশ্চিমের গদ্য লেখকেরা অবশ্য আধুনিক কবিতার ফর্মটিকেই অনুসরণ করেন। বাক্যের মধ্যে, প্যারাগ্রাফের মধ্যে বা অধ্যায়ের মধ্যে পারম্পর্য ভেঙে দিয়ে তারা পাঠককে কিছুটা সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করেন।

 

এতে পাঠকের ভাবনার নদীতে ঢেউ ওঠে, পাঠক ভাবতে থাকেন, ইত্যবসরে ভেঙে যাওয়া পারম্পর্যগুলো একটি সুবৃহৎ ক্যানভাসে নিয়ে জুড়ে দেন লেখক, দাঁড় করান একটি পূর্নাঙ্গ অবয়ব। লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, তাঁর ছোটো উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে, এই কাব্যিক ভাষা এবং কাঠামোটি অনুসরণ করেছেন।

 

ড. পূরবী বসু বলেন, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তাঁর ভাষাকে সকলের চেয়ে আলাদা রাখতে চেয়েছেন। তাঁর গল্পও যেমন ভিন্ন, উপন্যাসও ভিন্ন, তাই এগুলো ছোটো উপন্যাস, উপন্যাস নয়। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত নিজেও বলেন, হাজার হাজার উপন্যাস লেখে হয়েছে, আরো ৫/৭টি উপন্যাস না হয় আমি যোগ করলাম বাংলা সাহিত্যে, তাতে কি হত, তাঁর চেয়ে বরং আমি ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেছি।

 

আমার ছোটো উপন্যাসে বৃহৎ ক্যানভাসের সবই আছে, শুধু বিস্তৃতি নেই, প্রতীকী। পারম্পর্য ভেঙে দিয়েছি। কিন্তু মাল মশলা সবই আছে, পাঠক গল্পটি তৈরী করে নিতে পারবে।

পাঠকের পাতার দশম সভা অনুষ্ঠিত হবে ১৭ নভেম্বর দুপুর আড়াইটায়। দশম সভার নির্বাচিত গ্রন্থ মনজুর আহমেদের ‘অমৃতপথযাত্রী’।   

 


Top