শুকিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা, অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য স্বল্পতার শঙ্কা | daily-sun.com

শুকিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা, অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য স্বল্পতার শঙ্কা

ডেইলি সান অনলাইন     ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:০৫ টাprinter

শুকিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা, অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য স্বল্পতার শঙ্কা

 

অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে নেয়ার ফলে যদি ভারতের আইকনিক নদী গঙ্গার পানি কমানো হতে থাকে তবে আগামী তিন দশকের মধ্যে গাঙ্গেয় অববাহিকায় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ খাদ্য স্বল্পতায় পড়বে। নতুন এক সমীক্ষায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।


গবেষকেরা সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে বলেন, নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাসের ফলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সমীক্ষায় বলা হয়, উত্তর প্রদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রবাহিত গঙ্গার আশপাশের এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা অব্যাহত থাকলে নদীটির পানিপ্রবাহ হ্রাস পাবে।

 
সমীক্ষার সহ-লেখক জসিহিদে ওয়াদা বলেন, গঙ্গার ভূগর্ভস্থ পানির প্রভাব খুবই জটিল। নদীটির অববাহিকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানি পাম্প দিয়ে টেনে তোলার ফলে গ্রীষ্মকালে পানিপ্রবাহ হ্রাস পায়। গঙ্গার ভাটিতে সমস্যাটি আরো প্রকট।


গ্রন্থের প্রধান লেখক ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি খারাগপুরের সহযোগী অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জি বলেন যে, ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় গ্রীষ্মের মাসগুলোতে ৭০ ভাগ পানিপ্রবাহ হ্রাস পাবে।


এই সমীক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনকে আমলে নেয়া হয়নি। তবে লেখকেরা বলেছেন, তারা জলবায়ুর বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।


নদীটির ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার ধারাটি বৃষ্টিপাত ও হিমবাহের গলিত পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।

গ্রীষ্মকালে কিংবা বর্ষায় তেমন বৃষ্টিপাত না হলে ভূগর্ভস্থ পানিই ৩০ শতাংশের মতো যোগান দেয়। এমনকি অনেক সময় শীর্ণ ধারার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ পানি আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে।


গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে সেচে যে পানি ব্যবহার করা হয়, তার মাত্র ২৭ ভাগ ব্যবহার করা হয় ভূ-পৃষ্ঠের ওপরিভাগের পানি। এখন গঙ্গার প্রবাহ হ্রাস পেলে চাষাবাদে মারাত্মক ক্ষতি হবে।


মুখার্জি বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি, পানিপ্রবাহ হ্রাস পেলে এক কোটি ১৫ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 


গবেষণার সাথে জড়িত না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলম্বিয়া ওয়াটার সেন্টারে পরিচালক উপমানু লাল বলেন, ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির অচয় হলো প্রকৃত দুঃখজনক বিষয়।


তিনি বলেন, উজানে বিভিন্ন বাধ নির্মাণের ফলেও পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে।


দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক এ কে গোসাইঁ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে যদি গঙ্গার অববাহিকা থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হতে থাকে, তবে শুষ্ক মওসুমে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, আমরা অনেক স্থানে গর্ত করে দেখেছি যে অনেক স্থানে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপক মাত্রায় কমে গেছে।


তিনি বলেন, এখন কৃষি খাতের কার্যকারিতা ৩৫ ভাগ। ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ পানি ব্যবহৃত হয় এই খাতে। এখন ফসলের কার্যকারিতা ৩০ থেকে ৬০ ভাগে উত্তীর্ণ করা গেলে পানির প্রাপ্যতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। গৃহস্থালী ও শিল্প খাতে এই পানির ব্যবহার খুবই কম। তিনি বলেন, খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে না হওয়ার কারণেও সমস্যা হচ্ছে।


তিনি বলেন, আরো ভালো পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা গেলে মোট ফসল উৎপাদন বাড়ে। এতে করে পানির ওপর চাপ কমবে।


গবেষকেরা আরো বলেছেন যে পানিপ্রবাহ কম থাকায় গঙ্গার পানি দূষণেও তা প্রভাব সৃষ্টি করছে। তাদের মতে, ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে গঙ্গা। মুখার্জি বলেন, পানির প্রবাহ হ্রাস পেলে দূষিত উপাদানগুলো আরো বেশি করে জমে যায়। এতে করে সেগুলো পরিষ্কার করা আরো কঠিন হয়ে পড়ে।


গঙ্গা আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় পানির মাত্রা ও প্রবাহ হার ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।


গোঁসাই বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা ও উত্তোলনের মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া কোন কোন ধরনের সফল উৎপাদন করা যাবে এবং কোনটি করা যাবে না তাও নির্ধারণ করা উচিত। এক্ষেত্রে জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোর ওপরও আলোকপাত করা উচিত।


তিনি বলেন, কৃষক হয়তো এমন ফসল ফলাতে চাইবে যার বিপুল পানির প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। যেসব ফসল ফলাতে পানির প্রয়োজন কম হয়, সে সব ফসলের দিকে নজর দেয়া উচিত।


তিনি বলেন, পানি ব্যবহার করার একটি সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এটি খুব তাড়াতাড়ি করা প্রয়োজন। গঙ্গা অববাহিকার ১১টি রাজ্যের সবারই এ নিয়ে চিন্তা করা উচিত। প্রতিটি রাজ্য যদি আলাদা আলাদা করে চিন্তা করে তবে তেমন লাভ হবে না। তিনি বলেন, গঙ্গা বেসিন অথোরিটি থাকলেও তা তেমন কার্যকর নয়। এটিকে আরো কার্যকর করতে হবে। তিনি বলেন, এ কাজের জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাও থাকতে হবে, সমাজকে সার্বিকভাবে এই সমস্যাটিকে বুঝতে হবে।

 

লেখক: সাহানা ঘোষ

 

-সূত্র: মনগ্যাবে ডট কম অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top