নাগরিকত্ব বিতর্কে আতঙ্ক বাড়ছে আসামে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে | daily-sun.com

নাগরিকত্ব বিতর্কে আতঙ্ক বাড়ছে আসামে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে

ডেইলি সান অনলাইন     ১০ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:১৮ টাprinter

নাগরিকত্ব বিতর্কে আতঙ্ক বাড়ছে আসামে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে

 

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ – যাদের অধিকাংশই মুসলিম – তারা তাদের ভারতীয় পরিচয় প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে নাগরিকত্ব হারাতে পারেন।


চলতি বছরের ৩০ জুলাইন ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) প্রকাশিত হয়েছে। যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়েছিল, তাদের নাগরিকত্বের সুযোগ রাখা হয়েছে এই তালিকায়। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আসাম রাজ্যের মানুষের জন্য যখন এই তালিকা তৈরি করা হলো এবং চুড়ান্ত খসড়া যখন প্রকাশ করা হলো, সেখানে দেখা গেলো ৪০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। ফলে বাদ পড়া মানুষেরা অনেকটা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন।


আসামের ৩২ মিলিয়ন মানুষ তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু এর মধ্যে চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। করিমগঞ্জ, শিলচর এবং ধুবরি জেলার অনেকে বলেছেন, তারা ১৯৭১ সালের বহু আগে এখানে এসেছেন কিন্তু তাদেরকে নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না এবং ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে।


সরকারের এ ধরণের পদক্ষেপের কারণে রাজ্যের অনেক মুসলিম দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন যে, যে কোন সময় কোন কারণ ছাড়াই তাদের ফেরত পাঠানো হতে পারে। যারা এই আতঙ্কের মধ্যে আছেন, তাদের একজন স্থানীয় মুসলিম মোহাম্মদ আজমল।

তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সব রকম কাগজপত্র তিনি জমা দিয়েছেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার নাম তালিকায় আসেনি।


আজমল বলেন, “কোন একটা বিষয় রয়েছে। আমাদের রাজ্যে মারাত্মক কিছু একটা হচ্ছে এবং আমরা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। আমরা কেন ভাববো না যে, মুসলিমদের ফেরত পাঠানোর জন্য একটা পরিকল্পিত এজেন্ডার অংশ এটা, যাতে করে ভোট ব্যাংক রক্ষা করা যায়। ”


৬২ বছর বয়স্ক আজমল আরও বলেন যে, ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ রাজ্যে বসবাসের পর, ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে এখন ষড়যন্ত্র চলছে যাতে তার মতো লাখ লাখ মানুষকে রাজনৈতিক কারণে ফেরত পাঠানো হয়।


এদিকে, এ ধরণের ধারণাও রয়েছে যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যারা বর্তমানে আসামের ক্ষমতায় রয়েছে, তারা এবং কেন্দ্রী সরকার এই তালিকাকে ব্যবহার করে তাদের হিন্দু ভোট ব্যাংক রক্ষা করতে চাচ্ছে। কারণ আগামী বছরের এপ্রিলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।


১ আগস্ট বিজেপি নেতা টি রাজা সিং আসামের নাগরিক তালিকা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেন। তিনি বলেন বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিমরা ভারতের জন্য আতঙ্কের বিষয় এবং তারা যদি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে না যায়, তাহলে তাদের গুলি করে মারা উচিত।


রাজা এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি কেন্দ্রীয় সরকারকে বলবো, তাদেরকে ফেরত পাঠান। আর তারা যদি না যায়, তাহলে অন্যান্য দেশে যেটা করা হয়, বিপজ্জনক অনুপ্রবেশকারীদের তারা গুলি করে মারে, ভারতেও ঠিক সেটা করতে হবে। রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে যারা শান্তিপূর্ণভাবে ভারত ছেড়ে না যাবে, তাদেরকে গুলি করে মারতে হবে আমাদের। ”


তার বিবৃতি নাগরিক সমাজ ও মুসলিম গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তারা এই বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে এবং দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।


নয়াদিল্লী ভিত্তিক সমাজ কর্মী তালিব হোসেন বলেন, “এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বিজেপি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। গরিব অভিবাসী এবং মুসলিমদের দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এই ধরণের ব্যক্তিদের মাধ্যমে দলটি ধর্মীয় গেম খেলছে যাতে তারা ভোট ব্যাংক রক্ষা করতে পারে। ”


তিনি আরও বলেন যে, জনগণকে বিভাজিত করে শাসন করার জন্য এই নাগরিক তালিকা বিজেপির একটি কৌশল মাত্র। “এতদিন সরকার কোথায় ছিল? কেন হঠাৎ করে তারা তালিকা নিয়ে হাজির হলো যখন নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি আছে? আর কেনই বা ৪০ লাখ মানুষকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে”?


পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক সোমেন্দ্র চ্যাটার্জি বলেন, এই তালিকা “জাতিগত টার্গেটের” একটি অংশ ছাড়া কিছু নয়। তিনি আরও বলেন যে, যাদেরকে তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে, তারা আগের নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দেয়নি। তিনি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে  বলেন, “এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বিজেপি আগামী নির্বাচনে সেই সব ভোটারদের চায় না, যারা তাদের রাজনীতির বিরোধী। তাই এই তালিকা তৈরির মাধ্যমে তারা ভোটের বিজয়কে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। ”


রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজন ভট্টাচার্য বলেন, এই তালিকা যতটা না প্রশাসনিক একটি পদক্ষেপ, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। তিনি নয়াদিল্লীতে মিডিয়াকে বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল এনআরসিকে সঠিক পথে নিচ্ছে না। বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন যে, অবৈধ অভিবাসীদের গুলি করে মারা হোক”।


তবে, বিরোধী দলসহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবাদ হওয়ার কারণে সরকার তাদের জায়গা থেকে কিছুটা সরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। ১ আগস্ট তারা এটা বলেছেন যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, এটা একটা খসড়া তালিকা মাত্র এবং চুড়ান্ত তালিকা এখনও তৈরি হয়নি।


কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং পার্লামেন্টকে বলেন, “আমি পরিস্কার করে বলতে চাই যে এটা একটা খসড়া মাত্র এবং চুড়ান্ত এনআরসি নয়। আইন অনুসারে প্রত্যেকে তাদের নাগরিকত্বের দাবি প্রমাণের জন্য সুযোগ পাবেন। ”


সিং বলেন, সকলের দাবি এবং আপত্তির নিষ্পত্তির পরেই কেবল চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, “এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয় এবং আমি সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করবো যাতে তারা কোন আতঙ্ক সৃষ্টি না করেন। ”


তবে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, এই প্রক্রিয়া মানুষের জন্য চরম হয়রানির সমতুল্য কারণ বিজেপি এটা নিয়ে রাজনীতি করছে। ইন্ডিয়া টুডের সাথে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “এখানে যেটা চলছে, সেটা এক ধরণের তামাশা। অভিবাসীরা সন্ত্রাসী নয়। জাতিসংঘও এমনকি বলেছে যে, কোন অভিবাসী যদি অন্য কোন দেশে আসে তাহলে এটা ওই সরকারের দায়িত্ব যে তাদেরকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়া। বিজেপি আগুন নিয়ে খেলছে এবং দেশে তারা একটা গৃহযুদ্ধ শুরু করবে। এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই এটা বন্ধ করা উচিত। ”


লেখক: উমর শাহ


- সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top