এনআরসি: আরেকটি সঙ্ঘাত উসকে না দেয় আদালত | daily-sun.com

এনআরসি: আরেকটি সঙ্ঘাত উসকে না দেয় আদালত

ডেইলি সান অনলাইন     ৪ আগস্ট, ২০১৮ ১৬:১০ টাprinter

এনআরসি: আরেকটি সঙ্ঘাত উসকে না দেয় আদালত

 

ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) নিয়ে আসামে যে সঙ্কট চলছে, সেটা মূলত সুপ্রিম কোর্টের তৈরি। চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে ৩০ জুলাই।

এতে বাদ পড়েছে আসামের প্রায় ৪০ লাখ অধিবাসী। যদিও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং খোদ সুপ্রিম কোর্ট সবাইকে আশ্বস্ত করেছে যে, এই তালিকা একটা খসড়া মাত্র এবং সবাই তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ পাবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যা হয়ে এসেছে, তাতে এই আশ্বাসে বাদ পড়া মানুষরা খুব একটা ভরসা পাবে বলে মনে হয় না।


প্রক্রিয়ার মূল: আসাম পাবলিক ওয়ার্কসের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়েছিল যাতে রাজ্যের অবৈধ ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় এবং ১৯৯৫ সালের সিটিজেনশিপ অ্যাক্টের অধীনে নাগরিকদের তালিকা তৈরি করা হয়। সেই আবেদনের সূত্রেই শুরু হয় এই এনআরসি তৈরির প্রক্রিয়া। আসাম অ্যাকোর্ডের ধারাবাহিকতাতেই এই এনআরসি তৈরির কথা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর যারা আসামে এসেছিল তাদেরকে অবৈধ নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করেছিল অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই তাদের সাথে রাজ্য সরকারের চুক্তি হয় যেটা আসাম অ্যাকোর্ড নামে পরিচিত।


যদি প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৫১ সালে।

কিন্তু পরে সেখানে ত্রুটি পাওয়া গিয়েছিল বলে বর্তমানে ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী এনআরসি তৈরি করা হচ্ছে।


২০০৯ সালে মামলা দায়ের করা হলেও মামলাটি গতি পায় ২০১৩ সালে। সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেয় তালিকা তৈরির গতি বাড়াতে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে খসড়া তৈরির সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা রক্ষা করা যায়নি এবং অনেক দেরি করে পরে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই এর কাজ শেষ হলো। আসামের ৩.৩ কোটি জনসংখ্যার সবাইকে সরকার ঘোষিত দলিলপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে যে আইনগতভাবে তারা ভারতের নাগরিক। অথচ এ প্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক জটিলতা ও ঘাটতি রয়ে গেছে।


খামখেয়ালি গণনা: নাগরিকত্ব যেহেতু একটা আইনি ব্যাপার, আইনি সিস্টেমের অধীনে এটা প্রতিষ্ঠিত বা বাতিল হয়, তাই সবাই আশা করবে যে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে এখানে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো এখানে সেটা হয়নি। অস্বচ্ছ ‘ফ্যামিলি ট্রি’ যাচাই প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ইচ্ছে মতো গ্রাম পঞ্চায়েতের সনদ বাতিল করা সহ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি এবং জটিলতা রয়ে গেছে।


এই ভুলগুলো সামান্য নয়। পারিবারিক পরিচয় অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অনেক ঘটনা এমন দেখা গেছে যে, খসড়া তালিকায় বাবার নাম থাকলেও ছেলের নাম বাদ পড়েছে। এই ধরনের ভুল অবশ্যই দূর করা উচিত ছিল। যাদের পঞ্চায়েত সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে, এই সংখ্যাটা প্রায় ৪৫ লাখ। যে পরিমাণ লোক চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, সংখ্যাটা তার চেয়ে সামান্য বেশি।


পঞ্চায়েত সনদ বাদ দেয়ার সাথে একটা বিচারিক দিকও রয়েছে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, মনোয়ারা বেওয়া বনাম ভারত সরকারের মামলায় গৌহাটি হাইকোর্ট ঘোষণা দিয়েছিল যে গ্রাম পঞ্চায়েতের দেয়া সার্টিফিকেটের উপর নির্ভর করে এনআরসিতে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। এ কারণে যে বিপুল সংখ্যক নারী তাদের বিয়ের পরিচয় প্রমাণের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট ব্যবহার করেছে, তারা ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেছেন। সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক বিষয়টাকে বিবেচনা থেকে সরিয়ে দেননি। আসাম সরকারও এর বিরুদ্ধে কোন আপিল করেনি। বরং ডিসেম্বরে এসে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দিয়েছে যে পঞ্চায়েত সার্টিকেটের উপর নির্ভর করা যাবে তবে সেই সনদের সত্যতা আদালত যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। তবে এতেও শেষ পর্যন্ত ঝামেলার সমাধান হয়নি। বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনার জন্য সেটাকে আবার গৌহাটি হাইকোর্টে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই সার্টিফিকেটের উপর যে লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য ঝুলে আছে, তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এখন শুধু প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাদের পরিচয়ই প্রমাণ করতে হবে না, বরং সনদের যথার্থতাও আদালতের সামনে প্রমাণ করতে হবে।


শীর্ষ আদালতের ভূমিকা: এরপরও, এই সব বিষয়ের কিছুই আদালতের হিসেবে বিবেচনা পায়নি। নাগরিকদের পরিচয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেয়ে একটি সময়সীমার মধ্যে এনআরসির কাজ শেষ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করা জরুরি মনে করেননি।


আরও বড় একটি প্রশ্নও রয়ে গেছে এবং নয় বছরেও আদালত যেটা উত্থাপনের প্রয়োজন মনে করেনি। এই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি কি? তালিকা নিয়ে আপত্তি এবং সংশোধনী প্রক্রিয়া যদি যথাযথভাবে সম্পন্নও করা হয়, এর পরও বহু ব্যক্তি থেকে যাবেন, যারা তাদের পরিচয় প্রমাণ করতে পারবেন না। তাৎক্ষণিকভাবে তারা ভোট দেয়ার অধিকার হারাবেন। কিন্তু এর অর্থ হলো নতুন আরেকটি সমস্যার শুরু হবে। এই লাখ লাখ মানুষের স্ট্যাটাস কি হবে, যারা হঠাৎ করে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়েছে?

সত্তর বছর পরে ভারত আবার যে নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, সেদিকে বিশ্ববাসীর নজর রয়েছে। জাতি পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং পরিচয় নিয়ে এই উপমহাদেশে বহু সঙ্ঘাত হয়েছে। এখন এটা শুধু আশাই করা যায় যে, সুপ্রিম কোর্টের একটা প্রতিষ্ঠান যাতে এই ধরনের আরেকটি সঙ্ঘাত উসকে না দেয়।


- লেখক: অলোক প্রসন্ন কুমার, ব্যাঙ্গালুরুর বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসির সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো


- সূত্র: দ্য হিন্দু অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top