আসামের নাগরিকত্ব খামখেয়ালিপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল | daily-sun.com

আসামের নাগরিকত্ব খামখেয়ালিপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল

ডেইলি সান অনলাইন     ৪ আগস্ট, ২০১৮ ১৩:২৭ টাprinter

আসামের নাগরিকত্ব খামখেয়ালিপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল

 

আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) নিয়ে রাজনৈতিক উন্মাদনা সৃষ্টির মূলে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত গর্ব ও আত্মবিশ্বাসী আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। নিবন্ধন হালনাগাদ করার এবারের ব্যবস্থাটি ছিল ১৯৫১ সালের পর প্রথম।

এর লক্ষ্য ছিল আসামে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের শনাক্ত করা এবং অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিতদের সরিয়ে দেয়া। এই প্রক্রিয়ায় কয়েক দশক বিস্তৃত নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয়। কেবল আসামে বসবাসরত বর্তমান অধিবাসীদের নয়, তাদের পূর্বপূরুষদের পরিচিতিও জানা দরকার হচ্ছে। তিন বছর কাজ করার পর জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে ৩.২৯ কোটি আবেদনকারীর মধ্য থেকে ৪০ লাখের বেশি লোকের আবেদন বাতিল করেছে। ভুল ধারণা, ভুল, অসামঞ্জস্যতা, এবং অনেক সময় স্বেচ্ছাচারমূলক কারণে এসব লোক তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।


এমন একটি দেশে নথিপত্রের মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে যে দেশে নথিপত্র সংরক্ষণের রেকর্ড খুবই দুর্বল। বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে, তাদের পূর্বপুরুষেরা ১৯৭১ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করেছে। যেখানে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এসব প্রমাণপত্র দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে গ্রামের গরিব মানুষেরা, তারাই রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, সামনে পড়েছে পর্বতপ্রমাণ জটিলতার।

বেশির ভাগ লোকই ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন ও ১৯৭১ সালের আগের ভোটার তালিকার ওপর নির্ভরশীল। এনআরসি উভয়টিই জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু ১৯৫১ সালের নিবন্ধনে নানা জটিলতা রয়েছে। তাতে অনেক ভুল, শূন্যতা রয়েছে। আবার ১৯৭১ সালের আগের যে ভোটার তালিকা অনলাইনে আপলোড করা হয়েছে, তার অনেক স্থান ছেঁড়া, নামগুলো অস্পষ্ট, এমনকি বাদও পড়েছে। এসব নথিপত্রের শূন্যতা পূরণ করার জন্য জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের লোকজন সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন, দরজায় দরজায় গেছেন তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য। তবে এই প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে নির্ভর করেছে স্মৃতি ও শোনা কথার ওপর। এগুলো শনাক্ত করার নির্ভরযোগ্য পন্থা নয়।

 


আরো খারাপ বিষয় হচ্ছে, গত বছর থেকে আদালত ও জাতীয় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ উভয়েই একের পর এক বিধান জারি করেছে, স্থগিতও করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছরের প্রথম দিকে গৌহাটি হাই কোর্ট রায় দেয়, পঞ্চায়েতের ইস্যু করা সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে ৪৮ লাখ লোকের আবেদন বাতিলের তালিকায় ফেলা হলো। এদের বেশির ভাগই ছিল বিবাহিত নারী, অশিক্ষিত বা খুবই কম শিক্ষিত। তাদের কাছে পঞ্চায়েতের নথিই ছিল শেষ ভরসা। কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্ট ওই আদেশ বাতিল করে পঞ্চায়েতের নথি গ্রহণ করতে বলে। তবে ওই সনদ যথাযথভাবে সত্যায়িত করে নিতে বলে। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, তাদেরকে পঞ্চায়েতের সনদপত্রগুলো আইনসম্মত নয় এমন নথি হিসেবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট লোকজনকে আরো কিছু নথিপত্র পেশ করতে বলে।


তারপর এলো ‘মূল অধিবাসী’র বিষয়টি। এনআরসি জানায়, কাজের সুবিধার্থে তারা নিজেদের মতো করে এই বিষয়টি সৃষ্টি করেছে, যাতে খতিয়ে দেখার কাজটিতে সুবিধা পাওয়া যায়। এদিকে মুসলিমদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে যে মুসলিম শ্রেণি বলেও কিছু একটা তৈরি করা হবে। এ ধরনের কাজের ফলে এনআরসি প্রণয়নের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বাঙালি মুসলিমরা শুরুতে এনআরসিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কারণ তারা মনে করেছিলেন, তালিকা হলে তারা নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করতে পারবেন এবং তাদেরকে আর ‘অবৈধ অভিবাসী’ কথাটি শুনতে হবে না। কিন্তু সময় যতই গড়াচ্ছে, তাদের আশা ততই হতাশায় পরিণত হচ্ছে। এমনকি এনএরসি কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, তারা গ্রহণ করার চেয়ে বাদ দেয়ার কাজই বেশি করছেন।


পরিশেষে আসছে দাফতরিক ভুল, যেমন ভুল তথ্য ও বানান ভুল। এই ভুলের কারণে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রথম ১৫ লাখ লোক চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটিই হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্ট দুই পরিবারের একটি তালিকায় স্থান পেয়েছে, অপরটি পায়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাদ পড়া পরিবারটি তার পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারলেও নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। এমনকি যমজ দুজনের একজন তালিকায় স্থান পেয়েছে, অপরজন পায়নি- এমন ঘটনাও দেখা গেছে। এসব ঘটনা হাস্যরসের সৃষ্টি করবে, যদি না আসামের পরিচিতির বেদনাদায়ক ভঙ্গুরতার বিষয়টি প্রকাশ না করেন। আর আমলাতান্ত্রিক খামখেয়ালির কারণে কারো অধিকার যদি বাতিল করা হয়, তবে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।


- লেখক: ইপসিতা চক্রবর্তী


- সূত্র: স্ক্রল.ইন অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top