কুইন্স লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় নূরজাহান বোসের ‘আগুনমুখার মেয়ে’ | daily-sun.com

কুইন্স লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় নূরজাহান বোসের ‘আগুনমুখার মেয়ে’

ডেইলি সান অনলাইন     ৩ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:২১ টাprinter

কুইন্স লাইব্রেরির পাঠকের পাতায় নূরজাহান বোসের ‘আগুনমুখার মেয়ে’

 

গত ২৮ জুলাই ‘পাঠকের পাতা’ বই ব্যবচ্ছেদ কর্মসূচীর ষষ্ঠ আসরে আলোচনা করলো নূরজাহান বোসের গ্রন্থ আগুনমুখার মেয়ে নিয়ে। অনুষ্ঠানে মূল আলোচক ছিলেন সাংবাদিক, লেখক মনজুর আহমদ, অনুপস্থিত থাকলেও লিখিত বক্তব্য প্রেরণ করেন লেখক পূরবী বসু যেটি অনুষ্ঠানে পাঠ করেন কাজী জহিরুল ইসলাম।

  

 

অন্যান্যের মধ্যে আলোচনা করেন আহমাদ মাযহার, আবদুল্লাহ জাহিদ, মুক্তি জহির, ওবায়েদুল্লাহ মামুন, সৈয়দ ফজলুর রহমান, ফারহানা আজিম শিউলি, লেখক-কন্যা মনিকা জাহান বোস এবং কাজী জহিরুল ইসলাম। এবারের আসরের বাড়তি আকর্ষণ ছিল লেখক নুরজাহান বোসের উপস্থিতি। তিনি তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন, সকলেই বলে আমি অনেক সাহসিকতার সাথে নারীদের সমস্যাগুলো তুলে এনেছি। কিন্তু সব কথা আমি বলতে পারিনি।

 

আমি যা লিখেছি প্রকৃত সমস্যা এর চেয়েও ভয়াবহ। সমস্যা শুধু বাংলাদেশে না, সবখানেই, কোলকাতায় দেখেছি, এমন কি এই খোদ আমেরিকায়ও। বাচ্চা পালন করা ছাড়া মেয়েদের আর কোনো পরিচয় নেই। আর মেয়েরা ঘরে-বাইরে, সবখানে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, আত্মীয়, অনাত্মীয়, চেনা-অচেনা নানান পুরুষের দ্বারা। আমি বলবো, সব বলবো, আরো একটি বই লিখবো, সেখানে সব কথা লিখবো।

  মনজুর আহমদ বলেন, বইটি আমি অনেকদিন আগে পড়েছি, পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশকে পাওয়া যায় এই গ্রন্থে।

 

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা বানে ভেসে যাওয়া এবং সেই ভেসে যাওয়া মানুষকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ তারা এটিকে জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবেই মেনে নিয়েছে। এমনি অসংখ্য ঘটনা নুরজাহান বোস তুলে এনেছেন তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, সকলেই বলছেন মেয়ে লেখকেরা সাহসিকতার সাথে অনেক কথা বলতে পারেন না, নূরজাহান বোস সেই কাজটি করেছেন, আমি বলি, পুরুষ লেখকদেরই বা সেই সাহস কোথায়? নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাংলাদেশের লেখকদের সত্য বলার সাহস খুব কম। আগুনমুখার মেয়ে গ্রন্থটি অনেক সত্য অকপটে প্রকাশ করেছে।

 

 আমি এই গ্রন্থটিকে একটি মাস্টারপিস গ্রন্থ বলতে চাই দুটি কারণে, একদিকে যেমন লেখক তাঁর নিজের জীবনের কথা সেন্সর না করে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তাঁর ভাষা সেই কাটাখালির চরের কাদার মতো নরম এবং খাঁটি, যা এই গ্রন্থটির সাহিত্যমূল্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। লাইব্রেরি ম্যানেজার আবদুল্লাহ জাহিদ লেখক নূরজাহান বোসকে ধন্যবাদ দেন সুদূর মেরিল্যান্ড থেকে কষ্ট করে আসবার জন্যে। তিনি বলেন, আমি এই বইটি পড়েছি এবং এটি নিয়ে লিখেছিও, আমার কাছে এটি একটি অনবদ্য গ্রন্থ মনে হয়েছে।

 

মুক্তি জহির বলেন, মেয়েদের সমস্যাগুলো একজন নারী লেখক যেভাবে বুঝবেন পুরুষ লেখক সেভাবে বুঝবেন না। আমি সেই দক্ষিণাঞ্চলের মেয়ে, বইটি পড়তে পড়তে সেই অঞ্চলের নারীদের করুণ জীবন কাহিনী চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। নূরজাহান বোস সেই জীবন থেকে উঠে আসা মানুষ। অন্য নারীদের সাথে তাঁর পার্থক্য হল, অন্যেরা সেই জীবন যাপন করেছেন আর তিনি তাঁর যাপনকে নিজের মতো করে তৈরী করে নিয়েছেন এবং সেই যাপনকেই জীবন করে তুলেছেন এবং এই গ্রন্থে তা জীবন্ত করে তুলেছেন।

 

 আহমাদ মাযহার বলেন, অনেক কথাই বলা হয়ে গেছে, আমি একটি দিক হাইলাইট করতে চাই, প্রাপ্তির আশায় বা হারানোর ভয়ে আমাদের লেখকেরা অনেক কথাই বলতে চান না বা বলতে পারেন না, নূরজাহান বোস এইসবের উর্ধে উঠে লিখেছেন। আনন্দবাজার সংস্করণটি অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে, ঢাকার সংস্করণে ব্যক্তি পরিচয়ের একটি তালিকা যোগ করতে পারলে গ্রন্থটি আরো সমৃদ্ধ হতো। ওবায়েদুল্লাহ মামুন বলেন, নিজের পরিবারের ত্রুটিগুলোকেও তিনি ছাড় দেননি, প্রকাশ করেছেন জনসম্মুখে। পূরবী বসু তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘আগুনমুখার মেয়ে’, নূরজাহান বোস লিখিত একখানি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। পুরো ভারত উপমহাদশে প্রথম নারী আত্মজীবনী লেখক হলেন রাসসুন্দরী দেবী ।

 

 তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থের  নাম ‘আমার জীবন’। আর যদি শুধু বাংলার কথা বলি,  বাংলায় প্রকাশিত প্রথম আত্মজীবনীও (নারীপুরুষ নির্বিশেষে)  রাসসুন্দরীর “আমার জীবন।   সত্য লিখতে ভয় পায় মেয়েরা, যেমন জ্যোতির্ময়ী দেবী বলেছেন, আমরা সত্য বলি না। মেয়েরা সতী হন, কিন্তু সত্যশীলা, সত্যভাবিনী, সত্যব্রতী নন। হতে পারেন না। আর তাই এমন অকপটে নিজের জীবনের ভালো-মন্দের, সুখের-অশান্তির, নিগ্রহের-আদরের  প্রকাশ নূরজাহান বোসের এই গ্রন্থটিকে অত্যন্ত সুখপাঠ্য ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে পাঠককূলের কাছে।

 

 

 নূরজাহান বোসের বয়স যখন ৭১, তখন, অর্থাৎ ২০০৯ সালে,  তাঁর প্রথম গ্রন্থ “আগুনমুখার মেয়ে” (আত্মজৈবনিক ) প্রকাশিত হয় সাহিত্য প্রকাশ থেকে।  প্রকাশের সাথে সাথে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। সত্তোরত্তর বয়সে জীবনের প্রথম গ্রন্থ রচনা করে নূরজাহান বোস অনন্যা  ও বাংলা একাডেনী পুরস্কার সহ বহু সম্মাননা ও স্বীকৃতি পান। এটা নিঃসন্দেহে এক বিস্ময়কর ঘটনা।   নূরজাহানের জন্ম  বাংলাদেশের এমন এক  প্রত্যন্ত অঞ্চলে যার বিবরণ পড়লে মনে হয় সভ্যতার আলো বঙ্গোপসাগরের ওপর ভেসে থাকা এই দ্বীপের গহীন বৃক্ষবুননী অতিক্রম করে সেখানকার মাটি স্পর্শ করতে পারেনি তখনো।

 

বিখ্যাত চিন্তাবিদ বরিশালের  সন্তান কেম্ব্রিজের অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরী দেশ পত্রিকায় নূরজাহান বোসের আগুনমুখার মেয়ে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নূরজাহানের জন্মস্থানকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, আগুনমুখা বরিশালের একটি নদীর নাম। গাঙ্গেয় বদ্বীপ যেখানে সমুদ্রকে প্রায় স্পর্শ করেছে , বরিশাল জেলার সেই অঞ্চল বহু নদনদী আর পলিমাটির তৈরি চরে আকীর্ণ। আর-ও ছ’টি নদীর সঙ্গে মিলে আগুনমুখার রূপ ভয়াল, তরঙ্গবহুল। যুগে যুগে সর্বধ্বংসী নিষ্করুণ এই নদী অত্যাচারিতা মেয়েদের কোলে ঠাঁই দিয়েছে, তাঁদের সর্বদুঃখের শেষ আশ্রয় হয়ে। নূরজাহান এই আগুনমুখার চরের এক গ্রাম কাঁটাখালির মেয়ে। “

 

 

এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে আসা, বসত করা আলোকিত, স্পষ্টবাদী, নির্ভীক, এবং অত্যন্ত আধুনিকমনস্ক নূরজাহান বোসের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে আসে। এই বৃহৎ পৃথিবীর সন্ধান পেতে, সেখানে চলাচলের সুযোগ লাভ করতে সংগ্রামী নূরজাহানের দৃঢ় সংকল্প  ও কঠিন পরিশ্রম  /অধ্যাবসায় -এর কৃতিত্ব-ই প্রধান হলেও কিছু মানুষের সহযোগিতাও এই দুস্তর পথ পরিক্রমায় সাহায্য করেছে সন্দেহ নেই।

 

 এর ভেতর তাঁর  মা ছাড়া  যাঁদের কথা উল্লেখ করতেই হয়, তাঁরা হলেন অসাধারণ মানব দরদী, বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত একসঙ্গে জেলখাটা দুই বন্ধু, দেশের বিখ্যাত দুই রত্ন  - নূরজাহানের দুই স্বামী, তাঁর গৃহশিক্ষক, রাজনীতিবিদ চাচা আবদুল করিম, মনোরমা মাসিমা, আজীবন অবিবাহিতা, স্বার্থহীন শান্তিদিদি, প্রমুখ।

 

 

দশ বছর বয়সে সেই যে বেরিয়েছেন নূরজাহান, তার এই জীবনভর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাত্রা আর কখনো থামেনি।  প্রথমে কাঁটাখালি থেকে পটুয়াখলি,  এরপর বরিশাল, বরিশাল থেকে  ঢাকা, সেখান থেকে করাচী, তারপর কেম্ব্রিজ, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা, তারপর ওয়াশিংটন, স্বামীর গবেষনা সংক্রান্ত কর্মোপলক্ষে কিছুদিন  ইথিওপিয়া।   স্বামীর মারাত্মক অসুস্থতার জন্যে বিদেশের পরিপূর্ণ সাজানো গোছানো ঘরসংসার সব ছেড়ে আবার স্থায়ীভাবে স্বদেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত আগুনমুখা  তীরের মেয়ে স্বামী, এক পুত্র, দুই কন্যা নিয়ে স্থায়ী নিবাস গেড়েছিল পটোমাক নদীর ধারে পৃথিবী বিখ্যাত চেরী ব্লজমের শহর, যুক্তরাষ্ট্রের  রাজধানী ওয়াশিংটনে।   স্বামী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের বিশাল কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সরকারেরে দেয়া সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পদকভূষিত স্বদেশ বোস।

 

এই গ্রন্থ শুধু একটি চরবাসী নারীর জীবনসংগ্রাম ও তার উত্তরণে পরিশেষে জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হবার কাহিনীই কেবল নয়। এই বই এই জনপদের উত্থানপতনের রাজনীতি, সাতচল্লিশের দেশ ভাগ, দেশ ত্যাগ বা উৎখাতের পর উদ্বাস্তুদের দুর্ভোগ, সমাজ পরিবর্তন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও ভৌগলিক আবেষ্টনী বদলানোর চমৎকার প্রতিচ্ছবি।

 

 সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে ও পরে  হিন্দুমুসলমান সম্পর্ক, অবিশ্বাস, এই দুই ধর্মের লোকের ভেতর সামান্য কারণে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি, আবার কোথাও কোথাও চরম সখ্যতা, ধর্মীয় দাংগা, সংসারের ভেতরে  এবং বাইরে নারীর অবস্থান নিখুতভাবে বর্নিত হয়েছে। নূরজাহানের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা গ্রন্থের রন্ধে রন্ধে বিবৃত। তার নেতৃত্বের ক্ষমতা প্রথম উন্মোচিত হয় ভাষা আন্দোলনের সময় যখন স্কুলের মেয়েদের ক্লাশ থেকে বের করে এনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অনুসারীদের সঙ্গে রাস্তায় মিছিলে  নিয়ে যান তিনি ও আরো কয়েকজন মেয়ে।

 

 

অসময়ে স্বামীর মৃত্যুর পর  লড়াকু, সাহসী, স্পষ্টবাদী, অষ্টাদশী বিধবা মা নূরজাহানের জীবন যুদ্ধ শুরু হয়।  আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় পড়াশোনা জরুরী  হয়ে পড়ে।  ইমাদের ঘনিষ্টতম বন্ধু যে নূরজাহান-ইমাদের বিয়ের ঘটকালির সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিলেন এবং বিবাহের প্রতিটি খুঁটিনাটিতে অংশগ্রহণ করেছেন,  সেই মেধাবী ছাত্র ও জেলখাটা বিখ্যাত বামপন্থী ছাত্রনেতা স্বদেশ বোসের  সাহায্যে ও শ্বশুরবাড়ির সহযোগীতায় নূরজাহান আইএ ও বি এ পাশ করেন। চিরকুমারী শান্তিদিদি  এই দুঃসময়ে মেয়েদের স্কুলের হোস্টেলের সুপারের কাজটি দিয়ে প্রভূত সাহায্য করেন নূরজাহানকে।

 

 

ভিন্ন ধর্মের স্বদেশ বোসকে বিয়ে করার ব্যাপারে শুধু পরিবার বা বরিশালবাসী-ই আপত্তি তোলেনি, আপত্তি ওঠে পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস থেকেও। বরিশালে তো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাড়ার লোকজন ছুটে আসে স্বদেশসহ সকলকে খুন করার জন্যে। হুমকি দেওয়া চিঠি আসতে  থাকে ক্রমাগত, যার জের চলে বিয়ের দুই দশক পরেও।  

 

এরপর নূরজাহান  বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সংসার, স্বামী, পুত্রকন্যার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে আমেরিকায়  নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান। স্বদেশ বসু যিনি ইমাদ উল্লাহ্‌ মারা যাবার পর নূরজাহানের আই এ,ও  বিএ পড়ার সময়  মস্ত বড় সহায়ক ছিলেন, এম এ পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেখান নি।

 

কে জানে এই প্রাক্তন বামপন্থী  নেতার বুকেও চিরন্তন এক পুরুষ লুকিয়ে ছিল কিনা যে মনে করে সংসারের প্রয়োজন না হলে মেয়েদের পড়াশোনা বা রোজগারের কোন দরকার নেই। ওয়াশিংটনের ক্যাথোলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Social Work এ মাস্টার্স ডিগ্রী করার পর নূরজাহান  বিভিন্ন জায়গায় সমাজসেবার কাজ করেন, নার্সিং হোম, ক্রিসচিয়ান চ্যারিটি,  হাসপাতালের নিবিড় পর্যনবেক্ষণ বিভাগ,  নারী কল্যাণমূলক এঞ্জিও ইত্যাদি।  পরে সংহতি বলে নিজেই নারী কল্যাণে নিবেদিত একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। প্রতিবছর সেই সংস্থার মাধ্যমে বেশ কিছু নারীর ভাগ্য উন্নয়ন ঘটে, বাংলাদেশে।

 

  

কাটাখালির কন্যা,  আগুনমুখার মেয়ে নূরজাহান জীবনে বহু বড় মানুষের সান্নিধ্যে আসেন।   ইমাদের মৃত্যুর পরে তাকে ও ইমাদের মাকে যুবলীগ ঢাকায় সম্বর্ধনা দেয় যেখানে দলনেতা শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নূরজাহানের। শেখ মুজিব তাকে কাছে টেনে এনে কথা বলেন এবং দোয়া করেন। সেখানে আওয়ামী-লীগের তখনকার দিনের সকল বড়ো নেতারাই উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আজিমপুর গোরস্থনে ইমাদউল্লাহ্‌র কবরের কাছে।  

 

ওয়াশিংটনে ক্রিসচিয়ান চেরিটির  কাজ করার সময়ে মাদার তেরেসা সেখানে গেলে অভ্যর্থনা দলকে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল নূরজাহানকে।  নূরজাহান তেরেসা ও তার অনুসারীদের মতো নীল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে অভ্যর্থনা দলের একেবারে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং অভ্যর্থনাকালে মাদার তেরেসার সঙ্গে সামান্য বাক্যালাপ করার সুযোগ পান। মাদার তেরেসা নূরজাহানকে তার দেশের মেয়ে বলে নৈকট্য প্রদর্শন করেন।   

 

এছাড়া নূরজাহান বোস ও স্বদেশ বোসের সখ্যতা ছিল  দেশীবিদেশী বহু বিখ্যাত লোকের সংগে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনঃ   দুই অশোক মিত্র, অশোক রুদ্র, তপন রায় চৌধুরী, অন্নদাশংকর রায়, নবনীতা দেব সেন, নিরোদ শ্রী চৌধুরী,  মহিউদ্দীন আহমেদ, মনোরমা বসু মাসিমা,  সুফিয়া কামাল, কামাল ও হামিদা হোসেন, রেহমান সোবহান, অমর্ত্য সেন।

 

 

নূরজাহান বোসের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ “আগুনমুখার মেয়ে” শুধু লেখকের কঠিন সংগ্রামময় জীবনের কাহিনী নয়। এর পরতে পরতে আছে নারী নির্যাতন, বহুবিবাহ, নারী ও শিশুর প্রতি  যৌন আগ্রাসন, বাল্যবিবাহ, উপপত্নী ও দাসী সম্ভোগের স্পষ্ট ও খোলামেলা বিবরণ। বালিকা নূরজাহান নিজেও এক বৃষ্টিমুখর রাতে নৌকোয় করে যাবার সময় এক বৃদ্ধ আত্মীয়ের যৌন লালসার শিকার হয়ে কোনমতে নিজেকে রক্ষা করেছেন।

 

পড়ালেখা শিখে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে ও উন্নত জীবন গড়তে গিয়ে পরিবারের সেই বয়স্ক আত্মীয়ের বাড়িয়ে দেওয়া আগ্রাসী হাত থেকে একাধিকবার  নিজেকে প্রাণপন চেষ্টা করে বাঁচিয়েছেন নূরজাহান।    এই অভিজ্ঞতায়  নূরজাহান ঘৃণায় বমি করে দিলেও ভয়ে অন্য কাউকে তা বলতে পারেন নি।   কিন্তু সেদিন থেকে তার কাছে বমন প্রক্রিয়াটি একটি প্রতিবাদের ভাষা বা মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

আশা করবো জীবনের বাকি দিনগুলোকে অর্থময় ও সার্থক করে তুলতে নূরজাহান বোস তাঁর বৈচিত্র্যময় যাপিত জীবনের বর্ণিল অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞানের আলোকে আরো কিছু লিখে আমাদের সাহিত্যকে, আমাদের মননকে শাণিত ও সমৃদ্ধ করবেন।  

 

 


Top