শান্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন সু চি | daily-sun.com

শান্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন সু চি

ডেইলি সান অনলাইন     ২৩ জুলাই, ২০১৮ ১১:৩৬ টাprinter

শান্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন সু চি

- অং সাং সু চি

 

মিয়ানমারের বহু দশকের পুরনো গৃহযুদ্ধ অবসানে যে পাংলং-২১ শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিলো তার তৃতীয় দফা গত ১৬ জুলাই কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। জাতীয় বীর অং সাংয়ের কন্যা এবং বর্তমানে দেশটির কার্যত নেতা অং সাং সু চি ২০১৬ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেক আশা নিয়ে  গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে শান্তি আলোচনা শুরু করেছিলেন।

কিন্তু সাবেক সামরিক শাসক থিয়েন সিয়েন যে সমস্যা রেখে গেছেন এবং স্বায়ত্বশাসিত সেনাবহিনীকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তার অফিসের যে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা সু চি’র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমক্রেসি (এনএলডি)’র সাফলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


প্রায় দুই বছর ব্যক্তিগতভাবে শান্তি প্রচেষ্টা চালনোর পর এখন মনে হচ্ছে যে তাতমাদাও নামে পরিচিত সেনাবাহিনী সু চিকে কোনঠাসা করে ফেলেছে। দেশটির বিভিন্ন জাতিগত গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে পেশিশক্তির ব্যবহার করে চলেছে তাতমাদাও।


২০১৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর ও ২০১৭ সালের মে মাসে যে দুই দফা এবং সম্প্রতি শেষ হওয়া তৃতীয় পাংলং২১ আলোচনায় দেখা গেছে যে সেনাবাহিনীই সেখানে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে।


সেনাবাহিনীর মধ্যে ২০০৮ সালের সংবিধান পরিবর্তনের কোন ইচ্ছা দেখা যায়নি। এই সংবিধানে সেনাবহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অথচ স্থায়ী ও অর্থবহ শান্তির জন্য একটি ফেডারেল ইউনিয়ন গঠন করতে হলে ওই সংবিধানের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করে জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপগুলো।


তৃতীয় পাংলং২১ সম্মেলনে সামরিক বাহিনী অনঢ় মনোভাবের পূর্ণ প্রদর্শনী ঘটে। উদ্বোধনী বক্তব্যে সেনা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং সাফ জানিয়ে দেন যে মিয়ানমারের জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি সেনাবাহিনী, কোন জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপ, এমন কি রাজনৈতিক দলও নয়।


১২ জুলাই সরকারি দৈনিক গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার পত্রিকাতেও একই কথার প্রতিধ্বনি করা হয়।

 

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং


সেনাপ্রধানের বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কথা উল্লেখ একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া যা দেশটির জাতিগত সশস্ত্রগ্রুপগুলোর অবস্থানকে ছাপিয়ে গেছে। এরপরই ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে মানবাধিকার একটিভিস্ট, রাজনীতিবিদ ও কম্যুনিটি কর্মীরা প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেন, ‘তাতমাদাও আমার প্রতিনিধিত্ব করে না। ’


২০১১ সালে সাবেক আর্মি জেনারেল থিয়েন সিয়েন প্রথম শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর কথা ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮০’র দশকের পর এমন তীব্র সংঘাত আর দেখা যায়নি। সংঘাতে সবেচেয়ে বেশি ভুগতে হয় কাচিন ইনডিপেনডেন্ট আর্মিকে (কেআইএ)। তাতমাদাওয় কেআইএ-র অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।


কেআইএ এবং এর মিত্র দলগুলো, যারা দেশের ৮০% সশস্ত্র জাতিগত গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদেরকে শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী হওয়ার বদলে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগদানের অনুমতি দেয়া হয়।


স্বায়ত্বশাসন সম্বলিত ফেডারালিজম গড়ে তুলতে কোন উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর আগে এসব দলকে কথিত ‘ন্যাশনওয়াইড সিজফায়ার এগ্রিমেন্ট’ (এনসিএ) সই করতে হবে বলে তাতমাদাও ও সু চি সরকার চাপ দিয়ে যাচ্ছে।


সরকার দাবি করছে যে এ পর্যন্ত ১০টি সশস্ত্র সংগঠন এনসিএ সই করেছে। কিন্তু আসলে এসব গ্রুপের মধ্যে মাত্র চারটি- কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, ডেমক্রেটিক কারেন বুদ্ধিস্ট আর্মি, রেজুলেশন কাউন্সিল অব শান স্টেট এবং নিউ মন স্টেট পার্টি’র সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। বাকি ছয়টি গ্রুপ এনজিও ধরনের, তাদের তেমন কোন রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই।


কিন্তু কেআইএ, তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ), ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) ও আরকারন আর্মি’র মতো শক্তিশালী সশস্ত্র গ্রুপগুলো এবং তাদের মিত্র শান ও কোকংরা এনসিএ সই করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ এটা সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনের নামান্তর।


অন্যদিকে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ব্যাপারে বাইরের দুনিয়ার শুধু চীনকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশী চীন এবং দেশটিতে চীনের গভীর ভূ-কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূল থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং ভারত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য চীন মিয়ানমারে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের চেষ্টা করছে।


চীন তার কৌশলগত লক্ষ্য হাসিলের জন্য মিয়ানমারে যেসব কার্ড খেলতে পারে তার একটি হলো শান্তি প্রক্রিয়া। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সফট পাওয়ার ডিপ্লোম্যাসি, ইত্যাদি।


অবশ্য চীন নিজের স্বার্থে মিয়ানমারের সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে এনসিএ সই করতে চাপ দিচ্ছে না বলে বলে পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই অভিযোগ করা হয়। চীনের যেসব মধ্যস্থতাকারী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সঙ্গে কথা বলেন তারা শুধু চীন সীমান্তে সংঘাত পরিহার করে চলার জন্য চাপ দেন।


মিয়ানমারের যুদ্ধে চীনের গোপন হাত থাকা নিয়ে তাতমাদাও খুবই সন্দিহান। তাই মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে শান্তির দৃশ্যপট থেকে বাইরে রাখতে তাতমাদাও অনেক বেশি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে সেনাবাহিনীর ভেতরের সূত্রগুলো জানায়।


আর সে কারণেই সেনা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রসঙ্গ তার বক্তব্যে টেনে এনেছেন।


তবে এটা ঠিক পশ্চিমাদের চেয়ে চীনের কৌশল অনেক বেশি সুক্ষ্ম। অনেক পশ্চিমা দেশ মিয়ানমারের জটিল জাতিগত ইস্যুগুলো ভালোভাবে বোঝেও না।


১৬ জুলাই সমাপনী অধিবেশনে সু চি যে বক্তব্য দেন তাতে মনে হয় শান্তিপ্রক্রিয়া তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তিনি শান্তির একটি কাঠামো গড়ে তুলতে ধৈর্য্য ও কৌশলগত ভিশনের কথা বলেন। কিন্তু সেই ভিশন কি হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।


তিনি শুধু বলেন, ‘আমাদের সম্মেলন থেমে যাচ্ছে না, এটা উল্টো দিকেও হাটছে না, এটা অনেক কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ’


লেখক: বার্টিল লিন্টনার


-সূত্র: এশিয়া টাইমস অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top