স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে হত্যা: খুনি নিজেই ছিলেন প্রতিবাদ আন্দোলনে সোচ্চার! | daily-sun.com

স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে হত্যা: খুনি নিজেই ছিলেন প্রতিবাদ আন্দোলনে সোচ্চার!

ডেইলি সান অনলাইন     ১০ জুলাই, ২০১৮ ১৫:১৪ টাprinter

স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে হত্যা: খুনি নিজেই ছিলেন প্রতিবাদ আন্দোলনে সোচ্চার!

- প্রবীর চন্দ্র ঘোষের খুনি ও বন্ধু পিন্টু দেবনাথ

 

বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে হত্যা করে অত্যন্ত কৌশলে খুনি পিন্টু দেবনাথ নিজেই নেমে পড়েন নিখোঁজ বন্ধুকে খুঁজতে। পরিবারকে দিতে থাকেন নানা সান্ত্বনা। নিখোঁজ বন্ধুকে খুঁজে পেতে থানা পর্যন্ত যান খুনি নিজেই। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। খুন হওয়া ব্যক্তির মোবাইলের সিম উদ্ধারের পরেই বের হয়ে আসে খুনির আসল চেহারা। ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জ শহরের। নিখোঁজের ২১ দিন পর শহরের আমলাপাড়া এলাকার বন্ধুর বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে কালীরবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষের ৫ টুকরা খন্ডিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।


সোমবার (৯ জুলাই) রাত ১১টার দিকে আমলাপাড়ার ১৫ কে সি নাগ রোডের রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে অভিযান চালায় পুলিশ। তারা সেপটিক ট্যাংক খুলে ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে ৩টি বস্তায় প্রবীর ঘোষের ৫ টুকরো খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে। তবে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার হলেও উদ্ধার হয়নি দুই পায়ের হাটুর নিম্নাংশ। এ বাড়ির ২য় তলায় প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বন্ধু পিন্টু দেবনাথ ভাড়া থাকতেন।

পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বন্ধু পিন্টু দেবনাথ ও বাপন ওরফে বাবুকে ভৌমিককে গ্রেফতার করেছে।


জানা গেছে, শহরের কালীরবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ প্রায় ২ যুগ ধরে পারিবারিকভাবে স্বর্ণ ব্যবসা করে আসছেন। ১৮ জুন রাতে প্রবীর চন্দ্র ঘোষের মোবাইলে কল এলে তিনি রাত সাড়ে ৮টায় বাসা থেকে বের হয়ে কালীরবাজারে এসে নিখোঁজ হন। রাত সাড়ে ১০টা থেকে প্রবীরের মোবাইলে ফোন দিয়েও তাকে পাচ্ছিলেন না পরিবারের কেউ। সর্বশেষ রাত ১টা ১৪ মিনিটে ওই মার্কেটের অপর ব্যবসায়ী গোপীনাথের মোবাইল থেকে প্রবীরকে ফোন দিলে সেটি রিসিভ করা হয়। ১১ সেকেন্ড রিসিভ থাকলেও অপর প্রান্ত থেকে কারও কথা শুনতে পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া গেলে পরের দিন ১৯ জুন প্রবীরের বাবা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।  


১৮ জুন কালীরবাজার স্বর্ণ মার্কেট ও বঙ্গবন্ধু সড়কের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিসি টিভি ফুটেজে দেখা গেছে, প্রবীর চন্দ্র ঘোষ রাত ৯টা ২৫ মিনিটে কালীরবাজার রোড থেকে মূল সড়কে বেরিয়ে আসছেন। এরপর সর্বশেষ তাকে জাতীয় পার্টির কার্যালয় ঘেঁষা গলি দিয়ে রাত ৯টা ৩১ মিনিটে বের হতে দেখা গেছে।


২১ জুন বিপ্লব চন্দ্র ঘোষের মোবাইলে তার বড় ভাই নিখোঁজ প্রবীরের ব্যবহৃত মোবাইল থেকে একটি ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) দেয়া হয়। যেখানে লেখা ছিল- ‘কালীরবাজারের রাঘোব বোয়ালরা এর সঙ্গে জড়িত। উনাকে বিবি রোড (বঙ্গবন্ধু রোড) থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। ওকে পেতে মুক্তিপণ লাগবে ১ কোটি টাকা। চলে আসবে গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নিচে। এ ক্ষুদে বার্তা পাওয়ার পর বিল্পব চন্দ্র ঘোষ সদর মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। এরপর প্রবীর ঘোষকে উদ্ধার অভিযানে নামে পুলিশ।    

 


অনুসন্ধানে নেমে পুলিশ প্রথমে বাপন ওরফে বাবুকে ভৌমিককে আটক করে। পরে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সোমবার (৯ জুলাই) দুপুরে প্রবীরের বন্ধু পিন্টু দেবনাথকে আটক করে পুলিশ। রাত ১১টার দিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু স্বীকার করে প্রবীরকে সে হত্যা করেছে।


এদিকে ঘটনার পর থেকে প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে উদ্ধারের দাবিতে প্রশাসনের কাছে স্মারক লিপি, মানববন্ধন ও কর্মবিরতি পালন করেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। পুলিশ সূত্র জানায়, সেই আন্দোলনেই খুনি পিন্টু সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। প্রত্যেকটি কর্মসূচিতেই সে যোগ দিয়ে নিজেকে কৌশল খাটিয়ে বাঁচার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু প্রবীর ঘোষের মোবাইল সিম সব রহস্যের উদঘাটন করে দেয়।


প্রবীর ঘোষের সন্ধানকালে তার ব্যবহৃত মোবাইলটি কুমিল্লা সীমান্ত এলাকায় ব্যবহার হওয়ার সন্ধান পায় পুলিশ। তারা মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে গিয়ে এর বাহক বাপন ভৌমিককে গ্রেফতার করে। বাপন ভৌমিক পুলিশকে জানায় পিন্টু তাকে এ মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করতে দিয়েছে। পুলিশ বাপনকে গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসে। এরপরপরই গ্রেফতার করা হয় প্রবীরের বন্ধু পিন্টু দেবনাথকে।


জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু দেবনাথ ও বাপন ভৌমিক জানায়, প্রবীর ঘোষের লাশ আমলাপাড়ার ১৫ কে সি নাগ রোডের রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে রয়েছে। এ তথ্য পাওয়ার পরপরই পুলিশ বাড়িটিকে ঘিরে রাখে। পরে ডোম নিয়ে এসে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে তল্লাশি অভিযান চালায়। অনেক দিন হয়ে যাওয়ায় লাশটির খণ্ডগুলো বিকৃত হয়ে গেছে। পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।


প্রবীরের পারিবারিক সূত্র জানায়, কিছু দিন আগে ভারতের কলকাতায় প্রবীর ঘোষের বন্ধু পিন্টু দেবনাথের ওপেন হার্ট সার্জারী হয়। এই প্রবীর ঘোষই ভারতে পিন্টুর চিকিৎসার জন্য সকল সহযোগিতা করেন।


পুলিশ বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছে, প্রবীর ঘোষের এক ভাই দীর্ঘদিন থেকে ইতালি অবস্থান করছেন। ওই ভাইয়ের দেয়া টাকা নিয়েই প্রবীর ও পিন্টু স্বর্ণ ও সুদের ব্যবসা করছিলেন। এই টাকার একটি বিশাল অংশ পিন্টুর কাছে গচ্ছিত ছিলো। প্রবীর এ টাকার জন্য কিছুদিন ধরে পিন্টুকে চাপ দিয়ে আসছিলো।


পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই প্রবীর ঘোষকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার কারণ এখনো সুস্পষ্ট নয়। গ্রেফতারকৃত পিন্টু দেবনাথ এবং বাপন ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা শুধুমাত্র লাশটি কোথায় আছে তা বলেছে। কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, কারা কারা জড়িত, কেনোই বা হত্যা করা হয়েছে এ ব্যাপারে তারা পুরোপুরি মুখ খোলেনি। যেহুতু লাশ উদ্ধার হয়েছে পুরো ঘটনাটি এখন পরিষ্কার হয়ে যাবে।


ভাই হারিয়ে শোকে মূহ্যমান ইতালি প্রবাসী ছোট ভাই সৌমিক ঘোষ লেন জানান, আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর খুনীরা তাকে খোঁজার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যায়। আমরা ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি এরাই খুনী। অথচ এই খুনীরা আমাদের প্রতিদিনই সমবেদনার বাণী শুনিয়ে আসছিল।

 


Top