ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান: প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ | daily-sun.com

ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান: প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ

ডেইলি সান অনলাইন     ৮ জুলাই, ২০১৮ ১৯:৩১ টাprinter

ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান: প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ

 

ভুল ইনজেকশন পুশ করায় শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনার পর আলোচিত ম্যাক্স হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে মালিকপক্ষ। রবিবার (৮ জুলাই) নগরীর জিইসি মোড়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভা শেষে প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড ল্যাব ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. লিয়াকত আলী খান এ ঘোষণা দেন। তিনি অভিযুক্ত সেই ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও।


তবে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি থাকা রোগীরা এই ঘোষণার আওতায় পড়বেন না বলেও জানান তিনি। ডা. লিয়াকত আলী খান সাংবাদিকদের আরও বলেন, বেসরকারি চিকিৎসকরা প্রয়োজনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের সেবা দিতে পারবেন।


এর পর পরই বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ-চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি মুজিবুল হক খান।


এদিকে নগরীর বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে সকল ধরনের সেবা বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসক ও বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের এমন সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন রোগী ও রোগীর সাথে থাকা স্বজনরা।

 


এর আগে, রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার ম্যাক্স হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. দেওয়ান মাহমুদ মেহেদি হাসানও অভিযানে উপস্থিত ছিলেন।


বিকাল ৩টা পর্যন্ত চলা এই অভিযানে সরকারি শুল্কফাঁকি দিয়ে বিদেশি ওষুধ আমদানি ও বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ ক্যামিক্যাল রাখা, বাইরের ল্যাব থেকে পরীক্ষা করিয়ে এনে নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়া, অদক্ষ চিকিৎসক-নার্স দ্বারা চিকিৎসাসেবা চালানো, লাইসেন্স ছাড়া ফার্মেসিতে ওষুধ বিকিকিনি ও ফার্মাসিস্ট না থাকাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ম্যাক্স হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম।


একইসঙ্গে অভিযানে পাওয়া বিভিন্ন ত্রুটি সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন সময় বেধে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।


সারওয়ার আলম বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসকরা এই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। সরকারের চেয়ে ক্ষমতাশালী কেউ নেই। চিকিৎসকরা আইন মানতে বাধ্য।

 


প্রসঙ্গত, গলাব্যথা নিয়ে ২৮ জুন বিকেলে নগরীর মেহেদীবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী শিশুকন্যা রাইফা পরদিন শুক্রবার রাতে মারা যায়।    অভিযোগ ওঠে- কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।


‘রাইফাকে হত্যা করা হয়েছে’-এ অভিযোগ তুলে গত কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রামের সাংবাদিক সংগঠনগুলো আন্দোলন এবং দায়ীদের বিচার দাবি করে আসছে। পরে ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটিও এ ঘটনার তদন্ত করে।


সিভিল সার্জনের ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বৃহস্পতিবার (৫ জুলাই) রাতে তাদের প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাইফার মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রাইফার বাবা-মা যে অভিযোগ করেছিলেন, তার সত্যতা পাওয়া গেছে।

 
এতে আরও বলা হয়, রাইফা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার রোগনির্ণয় ও ওষুধ প্রয়োগ যথাযথ থাকলেও সে যখন খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার দক্ষতা ও জ্ঞান তাদের ছিল না।

 
তদন্ত প্রতিবেদনে ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফাকে চিকিৎসা প্রদানকারী শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীসহ চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে তিনজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

 


তদন্ত কমিটিতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ছাড়াও অপর দুই সদস্য হলেন-চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সবুর শুভ।


এরপর এ ঘটনায় শুক্রবার (৬ জুলাই) রাত ১০টার দিকে দুই চিকিৎসককে চাকরিচ্যুত করেছে চট্টগ্রামের বেরসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চাকরিচ্যুত ওই দুই চিকিৎসক হলেন- ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব। পরে গণমাধ্যমকে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খান বলেন, শিশু রাইফার মৃত্যুতে ওই দুই চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।


এদিকে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিদর্শন দল ম্যাক্স হাসপাতালের ১১টি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে।


আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে লাইসেন্স ও চিকিৎসক-নার্স নিয়োগের সব তথ্য দিতে নোটিশ দেয়া হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

 


Top