অনিয়মের অভিযোগে ম্যাক্স হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা | daily-sun.com

অনিয়মের অভিযোগে ম্যাক্স হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

ডেইলি সান অনলাইন     ৮ জুলাই, ২০১৮ ১৮:৪৯ টাprinter

অনিয়মের অভিযোগে ম্যাক্স হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা

 

ভুল ইনজেকশন পুশ করায় শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনার পর চট্টগ্রামের আলোচিত ম্যাক্স হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। সরকারি শুল্কফাঁকি দিয়ে বিদেশি ওষুধ আমদানি ও বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ ক্যামিক্যাল রাখা, বাইরের ল্যাব থেকে পরীক্ষা করিয়ে এনে নিজেদের নামে চালিয়ে দেয়া, অদক্ষ চিকিৎসক-নার্স দ্বারা চিকিৎসাসেবা চালানো, লাইসেন্স ছাড়া ফার্মেসিতে ওষুধ বিকিকিনি ও ফার্মাসিস্ট না থাকাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে এ জরিমানা করা হয়েছে।   


একইসঙ্গে অভিযানে পাওয়া বিভিন্ন ত্রুটি সংশোধনে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন সময় বেধে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।


রবিবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। তিনি বলেন, হাসপাতালের প্যাথলজিতে কোনো মাইক্রোবায়োলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়নি। অপারেশন থিয়েটারে পাওয়া গেছে অনুমোদনহীন ওষুধ। অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত অনেক সার্জিক্যাল আইটেমের মেয়াদ নেই। ম্যাক্স হাসপাতালের নামে ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও তার মেয়াদ মেষ হয়েছে গত দুই বছর আগে। ড্রাগ লাইসেন্সের মেযাদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর।


সারওয়ার আলম আরও জানান, বিভিন্ন অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নমুনা পরীক্ষা করে সেগুলো নিজেদের প্যাডে প্রিন্ট করে নিজেদের নামে চালিয়ে আসছে ম্যাক্স হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টার।


সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সারওয়ার আলম বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসকরা এই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। সরকারের চেয়ে ক্ষমতাশালী কেউ নেই। চিকিৎসকরা আইন মানতে বাধ্য।


আরেক প্রশ্নের জবাবে সারওয়ার আলম বলেন, এধরনের কয়েকটা হাসপাতাল ক্লিনিক বন্ধ করে দিলে ক্ষতির কিছু নেই, বরং লাভ। সরকারি হাসপাতালগুলো মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। এই নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।    


অভিযান টিমে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাউকে সরকার ছিনিমিনি খেলতে দেবে না। চিকিৎসকদের এই আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমনকি দোষী চিকিৎসকদের আইনের আওতায় আনাসহ তার চিকিৎসা সনদ বাতিল করা হবে বলেও জানান তিনি।  


এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় র‌্যাব, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ওষুধ প্রশাসনের সমন্বয়ে নগরের জিইসি মোড় মেট্টোপলিটন হাসপাতাল ও মেহেদী বাগের ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান শুরু করে।

 

প্রসঙ্গত, গলাব্যথা নিয়ে ২৮ জুন বিকেলে নগরীর মেহেদীবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী শিশুকন্যা রাইফা পরদিন শুক্রবার রাতে মারা যায়।   অভিযোগ ওঠে- কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।


‘রাইফাকে হত্যা করা হয়েছে’-এ অভিযোগ তুলে গত কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রামের সাংবাদিক সংগঠনগুলো আন্দোলন এবং দায়ীদের বিচার দাবি করে আসছে। পরে ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটিও এ ঘটনার তদন্ত করে।


সিভিল সার্জনের ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বৃহস্পতিবার (৫ জুলাই) রাতে তাদের প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাইফার মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রাইফার বাবা-মা যে অভিযোগ করেছিলেন, তার সত্যতা পাওয়া গেছে।

 
এতে আরও বলা হয়, রাইফা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার রোগনির্ণয় ও ওষুধ প্রয়োগ যথাযথ থাকলেও সে যখন খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার দক্ষতা ও জ্ঞান তাদের ছিল না।

 
তদন্ত প্রতিবেদনে ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফাকে চিকিৎসা প্রদানকারী শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীসহ চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে তিনজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।


তদন্ত কমিটিতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ছাড়াও অপর দুই সদস্য হলেন-চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সবুর শুভ।


এরপর এ ঘটনায় শুক্রবার (৬ জুলাই) রাত ১০টার দিকে দুই চিকিৎসককে চাকরিচ্যুত করেছে চট্টগ্রামের বেরসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চাকরিচ্যুত ওই দুই চিকিৎসক হলেন- ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব। পরে গণমাধ্যমকে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খান বলেন, শিশু রাইফার মৃত্যুতে ওই দুই চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।


এদিকে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিদর্শন দল ম্যাক্স হাসপাতালের ১১টি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে।


আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে লাইসেন্স ও চিকিৎসক-নার্স নিয়োগের সব তথ্য দিতে নোটিশ দেয়া হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

 

 


Top