কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ফারুক ‘নিখোঁজ’ | daily-sun.com

কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ফারুক ‘নিখোঁজ’

ডেইলি সান অনলাইন     ৩ জুলাই, ২০১৮ ১৬:৩৪ টাprinter

কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ফারুক ‘নিখোঁজ’

 

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন নিখোঁজ বলে দাবি করেছেন তার বড় ভাই আরিফুল ইসলাম।  


তিনি বলেন, ‘ফারুককে কাল মারধরের পর শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ থানায় নেয়া হয়েছিল বলে তথ্য পেয়েছি। বিভিন্ন ফুটেজে দেখেছি ফারুককে মোটরসাইকেলে করে থানায় নেয়া হয়েছে। এরপর থেকে ফারুক নিখোঁজ। ফারুকের সন্ধান চেয়ে থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের দফতরে খোঁজ করেও পাইনি। ’


আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমি সবার কাছেই গেছি। ডিএমপির শাহবাগ, রমনা ও নিউমার্কেট থানায় গিয়েছি। ডিবি অফিসেও গিয়েছি। কিন্তু কেউ তাকে ধরেনি বলে জানিয়েছে। ’


ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ওবায়দুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, তাকে আটক কিংবা গ্রেফতার এখনো করা হয়নি। ফারুকের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও নেই।

তাকে গ্রেফতার করা হলে অবশ্যই বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানো হবে।


ফারুক হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র।  

 

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর প্রায় তিন মাসেও এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় রবিবার (১ জুলাই) থেকে ফের আন্দোলনে নেমেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হচ্ছেন। রবিবার ছাত্রলীগের এক নেতার মামলায় পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।


বর্তমানে সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত কোটা ৫৬ শতাংশ। বাকি ৪৪ শতাংশ নেয়া হয় মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে।

বিসিএসে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০, জেলা কোটায় ১০, নারী কোটায় ১০ ও উপজাতি কোটায় পাঁচ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণ করা আছে। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে এক শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান রয়েছে।

 


এই কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধও করছিলেন তারা। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের মুখে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটাব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনো কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। ’


মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কোটা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।


সর্বশেষ গত ২৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততির জন্য কোটা থাকবে বলে ইঙ্গিত দেন। ‘সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকতে হবে, কমানো যাবে না’- বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের এই বক্তব্যকে সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবশ্যই, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই তো আজ আমরা স্বাধীন। তাদের অবদানেই তো আমরা দেশ পেয়েছি। ’


কোটাপ্রথা বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সব দিক বিবেচনা করে চাকরিতে কোটাব্যবস্থা চালু করি। কিন্তু যারা এই কোটার সুবিধাভোগী, তারাই তা চাইল না। এমনকি মেয়েরা বলছেন, তারাও কোটা চায় না। আমি বলেছি- তারা যখন চায় না, তখন কোটার দরকার নেই। এ বিষয়ে কেবিনেট সেক্রেটারিকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। বলেছি- কোটা কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা তিনি ঠিক করবেন। এর পর যদি মফস্বলের কেউ চাকরি না পায়, তা হলে আমাদের দায়ী করতে পারবে না। তবে এখানে বিরোধী দলের নেত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের সাপোর্ট করে বললেন- আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি। তাই তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য রয়েছে। তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সে জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততির জন্য কোটা থাকবে বলেও ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী।

 
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল থেকে চার দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেন। পর দিন সচিবালয়ে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন আন্দোলনকারীরা।


বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের বলেছি- আগামী ৭ মের মধ্যে সরকার বিদ্যমান কোটার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। সেই পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত থাকবে।


এ সময় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনও ৭ মে পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর ৯ এপ্রিল রাতে আন্দোলন স্থগিত হয়ে যায়। তবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর এক বক্তব্য কেন্দ্র করে ১০ এপ্রিল থেকে ফের আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তারা কোটা সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসার দাবি জানান।


পরে ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কোটাপদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করে সব চাকরিতে শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পর দিন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিল বের করেন।

 
এর দুই সপ্তাহ পর গত ২৬ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে কোটা বাতিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। না হলে ফের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তারা। পর দিন ২৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে বৈঠকে বসেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল।


গত ২ মে সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা বাতিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো ধরনের ক্ষোভ থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ছাত্ররা কোটাব্যবস্থা বাতিল চেয়েছে, বাতিল করে দেয়া হয়েছে।


এর পর গত ৭ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছিলেন, সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি বাতিল বা সংস্কারের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তার এ বক্তব্যের পর গত ৯ মে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা।


এ সময় তারা ঘোষণা দেন ১০ মের মধ্যে কোটা সংস্কারে প্রজ্ঞাপন জারি করা না হলে সারা দেশে সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর আন্দোলন শুরু হবে। এর পর প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ১৪ মে সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সর্বশেষ ২০ মে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা।

 

 


Top