এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপ্রিয় বাহনের নাম মোটরসাইকেল | daily-sun.com

এক ঝুঁকিপূর্ণ জনপ্রিয় বাহনের নাম মোটরসাইকেল

ডেইলি সান অনলাইন     ১৯ জুন, ২০১৮ ১৬:৩০ টাprinter

এক  ঝুঁকিপূর্ণ জনপ্রিয় বাহনের নাম মোটরসাইকেল

মোটরসাইকেল  বাহন হিসেবে আকর্ষণীয় হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। আর সেই ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে দেশের তরুণ সমাজ। এমনটি মনে করছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’র (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থার সীমাহীন ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও দুর্বলতা ওই ঝুঁকির মাত্রাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলছে। কিন্তু সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি কোনও উদ্যোগ নেই। বরং অবহেলায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে কয়েকগুণ।

 


বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২৪ লাখ ৬৩ হাজার ২৯৮। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মোটরসাইকেল। সংখ্যা ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৩১২। রাজধানী  ঢাকার চিত্রও এ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। বিআরটিএ-এর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৫ সাল নাগাদ ঢাকা শহরে মোট নিবন্ধিত যানবাহন সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৩টি।

এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮৮টি।

 


বিআরটিএ-এর হিসাব পর্যালোচনা করলে  দেখা যায়, গত সাত বছরে ঢাকায়  যানবাহন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ হারে। এর বিপরীতে এই শহরে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে ১১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে। অর্থাৎ, ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরে যেখানে মোট নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ  ৯ হাজার ৩৮৩টি। ২০১৫ সালে এসে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ৩ হাজার ৫৮৮টিতে।

 

এদিকে, রাজধানী শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই গতিতে সারাদেশেও মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। বিআরটিএ-এর হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সারাদেশে গত সাত বছরে যানবাহন বেড়েছে ৮৮ শতাংশ হারে। বিপরীতে মোটরসাইকেল বেড়েছে ১১৪ শতাংশ হারে। অর্থাৎ, ২০০৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে যেখানে নিবন্ধিত মোটরসাইলের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার ১৪৭টি, ২০১৫ সালে সংখ্যা এসে সে সংখ্যা ঠেকেছে ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৩১২টিতে।

 

মোটরসাইকেলের সংখ্যা এত বাড়ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ জানান, মোটরসাইকেল এমনই একটি বাহন যার স্পেস কম কিন্তু স্পিড বেশি। অর্থাৎ সুবিধা অনেক। আর এই সুবিধাই মোটরসাইকেলের চালক ও বাহকের জন্যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  

এদিকে, একই ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হকের মতে, দেশের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম ব্যর্থ হলে স্বভাবতই সেখানে ইন্ডিভিজুয়াল পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। আর পরিবহন ব্যবস্থায় ইন্ডিভিজুয়ালিটি যখন বেশি হারে বাড়ে, তখন দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই ঘটছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র হিসাব মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় সারাবিশ্বে বছরে ১৩ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছেন। এর ২৩ শতাংশ মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। অন্যদিকে, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব মতে, ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ৬৯ হাজার ৭০৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মোটরসাইলেকেলের দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৭৩৩টি।

 

তবে এই পরিসংখ্যানকে সারাদেশের দুর্ঘটনার আংশিক চিত্র বলে উল্লেখ করেছেন কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। তিনি বলেন, সিস্টেমগত কারণেই দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের জন্যে নির্ভর করতে হচ্ছে থানা পুলিশের রেকর্ড ও মামলার তথ্যের ওপর। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলার ঝামেলা এড়ানোর অজুহাতে এবং মাঠ পর্যায়ে সমজোতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার তথ্য থানা পুলিশের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার যে তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে, তা অবশ্যই আংশিক।

 

কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, যানবাহন বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি মোটরসাইকেল বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যাও।

এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বর্তমানে গোটা বিশ্বে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি। এর ৮০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোয়, বিশেষ করে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে। অর্থাৎ, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেশি। তবে, মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিরাপদ পদ্ধতি মেনে হলে এই সংখ্যাও সমস্যার হতো না বলে মনে করছেন কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নিরাপদ মোটরসাইকেল ব্যবহারের পূর্বশর্ত হলো হেলমেট ব্যবহার করা।

 

 কিন্তু এখানে আরোহী কিংবা চালক কেউই হেলমেট ব্যবহার করছেন না। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি যানবাহনের সেন্টার অব গ্রাভিটি থাকে। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ওই সেন্টার অব গ্রাভিটি বজায় রাখাও জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মোটরসাইকেলের মূল ডিজাইনকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে বাড়তি ক্যারিয়ার লাগানো হচ্ছে।

 

ব্যাগ-ব্রিফকেস ঝোলানোর জন্যে হ্যাঙ্গার বসানো হচ্ছে; এমনকি হেডলাইট পরিবর্তন করে বড় লাইট লাগানো হচ্ছে। এ সব কারণে নষ্ট হচ্ছে মোটরসাইকেলগুলোর সেন্টার অব গ্রাভিটি। এতে ঘটছে দুর্ঘটনা।

 

এছাড়া, বাংলাদেশের সড়ক ও সড়ক ব্যবস্থাপনাও মোটরসাইকেল ব্যবহার উপযোগী নয় বলে উল্লেখ করছেন কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ।

তবে মোটর সাইকেল ব্যবহারের ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই নয়, উন্নত দেশগুলোও এর থেকে কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে যুক্ত রাজ্যের এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক এস এম সোহেল মাহমুদ জানান, দেশটিতে প্রাইভেটকারের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩৫ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ, একই দুরত্ব যেতে প্রাইভেটকারের তুলনায় মোটরসাইকেলের ঝুঁকি ৩৫ গুণ বেশি।

 

ওই একই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এস এম সোহেল মাহমুদ আরও জানান, যুক্তরাজ্যে মোটর সাইকেলে হতাহতের ঝুঁকি ২৬ গুণ বেশি। এবং অস্ট্রেলিয়াতে এর হার ১৬ গুণেরও বেশি।

তাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবিলায় সবার আগে মোটরসাইকেলের ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা। একই সঙ্গে তারা বলছেন সর্ব সাধারণের জন্য নির্দিষ্ট সিসি’র

অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। চালক ও বাহকের জন্যে হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশপাশি তরুণদের জন্যে জয় রাইড বন্ধ করতে হবে।

 


Top