এক মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীরা | daily-sun.com

এক মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীরা

ডেইলি সান অনলাইন     ৮ জুন, ২০১৮ ১৭:১৩ টাprinter

এক মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীরা

 

তিন মাস বয়সী রোহিঙ্গা শিশুটির এখনো কোন নাম রাখা হয়নি। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন প্রচণ্ড গরমের কারণে তার মা উম্মে সোলায়মান সন্তানকে কোলে নিয়ে একটি নারকেল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

অন্য সন্তানদের বেলাতেও একই কাজ করছে। সব সন্তানের নাম সহজেই রাখা হয়েছিলো। কোন ইতস্তত ছাড়াই তাদেরকে ভালোবেসেছিলো সে।


কিন্তু যখন এই শিশুটিকে কোলের ওপর শুয়ে থাকতে দেখে তখন এক দু:স্বপ্নে কথা মনে পড়ে যায়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের গ্রামে গত বছর সেনারা হানা দিয়েছিলো। তারা পিছু ধাওয়া করে একটি ধান ক্ষেতে তাকে ধরে ফেলে। সেখানে দুই সেনা তাকে ধর্ষণ করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়।


উম্মে সোলায়মান হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম নারীর একজন যাদের ওপর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মতান্ত্রিকভাবে যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও মানবাধিকার গ্রুপগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে। যদিও সেনাবাহিনী এ ধরনের বর্বরতা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে।


সেনাবাহিনীর ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ থেকে জীবন বাঁচাতে ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে এখন গাদাগাদি করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকছে। এদের অনেকে চোখের সামনে বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলতে, সন্তানদের জবাই করতে অথবা পরিবারের সদস্যদের গুলি করে হত্যা করতে দেখেছে। রোহিঙ্গা নারীদের গণহারে ধর্ষণ করায় অগনিত অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে, যা বেঁচে যাওয়া ধর্ষিতাদের জন্য এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বয়ে এনেছে।


রিলিফ ক্লিনিকে গিয়ে অনেক নারী ও কিশোরী গোপনে গর্ভপাত করাচ্ছেন। অন্য উপায় অবলম্বন করতে গিয়ে চিকিৎসাগত জটিলতার সম্মুখিন হচ্ছেন।


বিয়ে বহির্ভূত সন্তান জন্মদানের কলংক বয়ে বেড়াতে হচ্ছে অনেককেই। উম্মে সুলাইমানের সিদ্ধান্ত আরো বেশি করুণ কারণ সে একজন বিধবা। কয়েকবছর আগে রোগে তার স্বামী মারা যায়। ৩০ বছর বয়সেই সে পাঁচ সন্তানের জননী হয়েছে।


১৬ বছর বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর বালুখালি শরণার্থী শিবিরের বস্তিঘরে অন্য সন্তানদের নিয়ে সে এখন থাকছে। তার অন্য সন্তানরা নাছোড় বান্দা: এই শিশু তাদের কেউ নয়। সেও বলে আমি এই শিশু চাইনি।


মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর যে দীর্ঘ অত্যাচার চলছে তার ‘হলমার্ক’ হলো যৌন নির্যাতন। বৌদ্ধ সংখ্যগুরু জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটিতে নিজ ভূমে রোহিঙ্গার বর্ণবাদের শিকার হয়েছে। তাদের কোন মৌলিক অধিকার দেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, নিয়মিত চিকিৎসা সুবিধাতেও তাদের প্রবেশ সুবিধা ছিলো না। তাই অনেক যৌন নির্যাতনের শিকার নারী-কিশোরী শরণার্থী শিবিরের তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছলেও তারা চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে কিছুই জানে না।


২০১৭ সালের আগস্ট থেকে সাত মাসে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ৬,০০০-এর বেশি লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করেছে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এই সময়টিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী।


মিয়ানমারের উপর ব্যাপকভাবে কাজ করছে এমন অধিকার গ্রুপ ফর্টিফাই রাইটসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘বহু বছর ধরে কোন শাস্তির ভয় ছাড়াই ধর্ষণ রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে হামলার বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ধ্বংস করতে ব্যাপক হামলার হাতিয়ার হিসেবে সেনারা ধর্ষণকে ব্যবহার করেছে। ’


উম্মে সোলায়মান যে মাসে ধর্ষণের শিকার হন সেই ২০১৭ সালের জুনে রাখাইনের বহু গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান চালায় বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এই প্রতিবেদক এমন অনেকের স্বাক্ষতকার নিয়েছেন। তাদের কেউই তার ছবি ও গ্রামের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।


উম্মে সোলায়মান জানান, সৈন্যরা যখন তাকে ধরে তখন তাঁকে রক্ষা করার মতো আশেপাশে কেউ ছিলো না। রাত নামার আগে গ্রামবাসী তাকে খুঁজে পায়নি। কাছাকাছি কোন ক্লিনিক না থাকায় চিকিৎসা নেয়াও সম্ভব হয়নি। সন্তানদের নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে পৌছান উম্মে সোলায়মান।  


স্থানীয় এক ডিসপেনসারি থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে গর্ভপাতের চেষ্টা করেছিলেন তিনি, কিন্তু ব্যর্থ হয়।


আগস্ট থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস ৩৭৭ জন ধর্ষিতা নারীর চিকিৎসা করেছে। এদের মধ্যে ৭ বছর বয়সী শিশুও ছিলো। এই সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার ভগ্নাংশ মাত্র বলে সংস্থাটির বিশ্বাস।


তাদের মধ্যে ২৩ বছর বয়সি মাজেদা বেগম জানান যে তার গ্রামের পাশে বনে মধ্যে নিয়ে সৈন্যরা তাকে ধর্ষণ করে। তার বিয়ে হয়নি, কোন সন্তানও ছিলে না। পিতামাতার সঙ্গে সে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সে একটি ক্লিনিকে গিয়ে বড়ি খেয়ে গর্ভ নষ্ট করে।


সে বলে, আমার বাবা মা কয়েকদিন পরেই মারা গেলে আমাকে দেখার মতো কেউ থাকবে না। আমাকে বিয়ে করতে হবে। মানুষ যদি জানে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে তাহলে কেউ বিয়ে করবে না।


ফাতিমা (২৫) নামে আরেক নারী অর্ধডজন সেনার দ্বারা গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মংডুতে গ্রেফতার এড়াতে বাড়ি থেকে তার স্বামী পালিয়ে যায়। সেই সুযোগে সেনারা তার উপর নির্যাতন চালায়। এই ঘটনার চার মাস পর কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে স্বামী হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়। হোসেন যখন জানতে পারে তার স্ত্রী গর্ভবতী তখন তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।


ফাতিমা ভেবেছিলো তাকে স্বামী তালাক দেবে। কিন্তু হোসেন তা করেনি। হোসেন বলে, আমরা কখনো গর্ভপাতের কথা ভাবিনি। বহু নারীর সঙ্গে এমনটা হয়েছে। তাই আমরা ভাবলাম আল্লাহই এই সন্তানকে দেখভাল করবে।


গর্ভপাতে ব্যর্থ হয়ে উম্মে সোলায়মান অনাগত সন্তানের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। সন্তান জন্মদানের আগে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারের একটি ক্লিনিকে উম্মে সুলাইমানকে আরেকটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়া হলো: সে সন্তানটিকে কোন রোহিঙ্গা পরিবারকে দিয়ে দেয়া। নবজাতক দত্তক নিতে চায় এমন রোহিঙ্গা পরিবার খুঁজে বের করছে ত্রাণ গ্রুপগুলো।


তবে, সব ঘটনা সঠিকভাবে জানতে না পারায় ঠিক কতটি শিশু এ পর্যন্ত দত্তক দেয়া হয়েছে বা আরো কতটি দেয়া হবে তা কেউ বলতে পারেনি।


উম্মে সুলাইমান তার সন্তানকে দত্তক দিতে রাজি হয়নি। এরপরও সন্তানের নামটি রাখতে পারেনি সে।  

 


লস এঞ্জেলেস টাইমস অবলম্বনে সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 

লেখক: শশাঙ্ক বাঙ্গালি

 


Top