দ্বিজেন্দ্রলাল রায় : প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি | daily-sun.com

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় : প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন     ১৭ মে, ২০১৮ ১৮:৫৭ টাprinter

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় : প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি



১.
বাংলা সাহিত্য ভুবনের, বিশেষত সুরের আকাশের অন্যতম নক্ষত্র, স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত দ্বিজেন্দ্রলাল রায় একজন কবি, গীতিকার ও নাট্যকার। তিনি ডি.এল. রায় নামেও সমধিক পরিচিত।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এক অসামান্য মৌলিক প্রতিভা এ নিয়ে সাহিত্য বোদ্ধা মহলে কোন সন্দেহই নেই। বিশিষ্ট বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা ১৯১৩ সালের ১৭ মে প্রয়াত হন। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, ডি.এল. রায় ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন। আমাদের সুর-সংগীতরে ভুবনের পঞ্চকবির অন্যতম নামটিই ডি.এল. রায়। মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবনে তিনি স্বপ্ন দিয়ে সা সৃষ্টি করেছিলেন তাকে আমরা স্মৃতি দিয়ে ঘিরে রেখেছি। একটি বিষাদময় সনেটে তিনি যেমনটি লিখেছিলেন, ‘করেছি কর্তব্য যাহা, সেইটুকু আমার যাহা জমা।/ করেছি অন্যায় যাহা, সেইটুকুই খরচ দিও বাদ।’


২.
‘ধন ধান্য পুস্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা / ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা / এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না ক তুমি/ সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি …’ গানটি শুনলেই ভেতরে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগে এই জন্মভূমির প্রতি, এই দেশমাতার প্রতি নাড়ির টানটা তখন যেন খুব তীব্র ভাবে অনুভব হতে থাকে, এই জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসাটা যেন তখন গভীর থেকে আরও গভীর হয়। ইচ্ছে হয় ভালোবাসায় মিশে যাই এই দেশের মাটির সঙ্গে… গানটি শুনলে গর্বে বুক ভরে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। বঙ্গজননী সকল দেশের রানী এ অহঙ্কার ভিত গড়ে দেয় গানটি। হবেই না বা কেন? বাংলার রূপ আর মহিমার বর্ণনা আছে আর কোন গানে? … চমৎকার এই গানটির রচয়িতা হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।

 

তিনি শুধু একজন সংগীত স্রষ্টাই ছিলেন না তিনি কাব্য এবং নাট্যাঙ্গনেও তিনি তাঁর প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন চমৎকার ভাবে। রবীন্দ্র-সমসাময়িককালে সাহিত্যচর্চা করলেও প্রথম থেকেই ভুবনপ্রসারী রাবীন্দ্রিক প্রভাববলয় থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার সাধনা করেছেন যাঁরা, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (জন্ম : ১৯ জুলাই, ১৮৬৩- প্রয়াণ : ১৭ মে, ১৯১৩) তাঁদের অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের জন্মের দুবছর পরে জন্মেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল, কিন্তু মৃত্যুবরণ করেন রবীন্দ্র-প্রয়াণের ২৮ বছর পূর্বে। ৫০ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনে বাংলার সাহিত্য ও সংগীতের জগতে যা দিয়েছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, তা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। প্রধানত গীতিকার এবং নাট্যকার হিসেবেই তাঁর খ্যাতি সমধিক; তবে কবি হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়। বাংলা কবিতা ও গানে হাস্য-কৌতুকরস সৃজনে দ্বিজেন্দ্রলালের খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য, বাংলা নাটকের বিকাশে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

 

দ্বিজেন্দ্রলালের কর্ম ও সৃষ্টির দিকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিপাত করলে, অনুধাবন করা সম্ভব, তাঁর সাধনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা, বুঝে নেওয়া সম্ভব তাঁর স্বকীয়তা, নির্দেশ করা সম্ভব তাঁর শিল্পবোধের স্বাতন্ত্র্য ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা। নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পঞ্চাশ বছরের আয়ুষ্কালের মধ্যে তাঁর রচনায় বিস্ময়কর বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভা বহুমুখী। তাঁর শিল্পসৃষ্টিতে ঐতিহ্যকে রূপায়িত হতে দেখেছি আমরা আর এখন তিনি নিজেই পরিণত হয়েছেন আমাদের ঐতিহ্যে। বাঙালি সংস্কৃতির মর্মে মিশে আছে দ্বিজেন্দ্র-প্রতিভা। তাঁকে অস্বীকার করা মানে আত্মহত্যার নামান্তর। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর সুবিশাল সৃষ্টিকর্ম বিশ্লেষণ সম্ভব নয়, কিন্তু আজকের এই দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার নজির।

 


৩.
ডি এল রায়ের পিতা সুকণ্ঠ গায়ক কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন কৃষ্ণনগরের দেওয়ান এবং মাতা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন অদ্বৈত প্রভুর বংশধর। তাঁর দুই অগ্রজ রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল এবং এক ভ্রাতৃজায়াও সাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল হুগলি কলেজ থেকে বিএ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ (১৮৮৪) পাস করেন। পরে কিছুদিন চাকরি করে তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য লন্ডন যান এবং সেখানে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। লন্ডনের সিসিটার কলেজ থেকে তিনি কৃষিবিদ্যায় এফ.আর.এ.এস ডিগ্রি এবং রয়েল এগ্রিকালচারাল কলেজ ও এগ্রিকালচারাল সোসাইটির এম.আর.এ.সি ও এম.আর.এস.এ উপাধি লাভ করেন। বিলেত থেকে ফিরে তিনি মধ্যপ্রদেশে জরিপ ও রাজস্ব নিরূপণ ট্রেনিং নেন এবং সরকারি ডেপুটির চাকরি পান; পরে তিনি দিনাজপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন।

 

দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ; এজন্য কর্মক্ষেত্রে তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটের সুজামুটা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসারের দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রজাদের স্বার্থে ছোটলাটের বিরোধিতা করতে কুণ্ঠিত হননি। বিলেত থেকে ফেরার পর প্রায়শ্চিত্ত করার প্রশ্ন উঠলে তিনি তা অস্বীকার করেন এবং এজন্য তাঁকে অনেক বিড়ম্বনা সইতে হয়। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা আছে তাঁর একঘরে (১৮৮৯) নামক পুস্তিকায়। দ্বিজেন্দ্রলাল ১৯০৫ সালে কলকাতায় ‘পূর্ণিমা মিলন’ নামে একটি সাহিত্যিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তখনকার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসেবী বাঙালিদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়। এ সময় তিনি ‘ইভনিং ক্লাব’ নামে অপর একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি প্রথম অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন। বিলেতে থাকা অবস্থায় তিনি সেখানকার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়-কৌশল ও রঙ্গালয়-ব্যবস্থা নিকট থেকে পর্যবেক্ষণ করেন, যা পরবর্তীকালে নাটক রচনা ও অভিনয়ে তাঁকে গভীরভাবে সহায়তা করে।

 


৪.
দ্বিজেন্দ্রলাল কৈশোরেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। ছাত্রজীবনে তাঁর আর্য্যগাথা (১ম ভাগ, ১৮৮২) এবং বিলেতে থাকাকালে Lyrics of Ind (১৮৮৬) কাব্য প্রকাশিত হয়। ১৯০৩ সাল পর্যন্ত তিনি মূলত কাব্যই রচনা করেন এবং এ সময় পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ বারোটি। এরমধ্যে প্রহসন, কাব্যনাট্য, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক কবিতাও রয়েছে। জীবনের শেষ দশ বছর তিনি প্রধানত নাটক রচনা করেন। পৌরাণিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক সব ধরনের নাটক রচনায়ই তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। স্বদেশী আন্দোলনের ফলে তাঁর মধ্যে যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়েছিল, ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি ষোলোটি নাটক রচনা করেন। তাঁর প্রবন্ধমূলক রচনাগুলিও অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করছে। দ্বিজেন্দ্রলালের উলে¬খযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো: কাব্য আর্য্যগাথা (২য় ভাগ, ১৮৯৩), মন্দ্র (১৯০২), আলেখ্য (১৯০৭), ত্রিবেণী (১৯১২); নকশা-প্রহসন একঘরে (১৮৮৯), সমাজ-বিভ্রাট ও কল্কি অবতার (১৮৯৫), ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০), প্রায়শ্চিত্ত (১৯০২), পুনর্জন্ম (১৯১১); পৌরাণিক নাটক পাষাণী (১৯০০), সীতা (১৯০৮), ভীষ্ম (১৯১৪); সামাজিক নাটক পরপারে (১৯১২), বঙ্গনারী (১৯১৬); ঐতিহাসিক নাটক তারাবাই (১৯০৩), রানা প্রতাপসিংহ (১৯০৫), মেবার-পতন (১৯০৮), নূরজাহান (১৯০৮), সাজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১); প্রবন্ধগ্রন্থ কালিদাস ও ভবভূতি (১৯১০-১১) প্রভৃতি। ঐতিহাসিক নাটক রচনার জন্য তিনি যশস্বী হয়ে আছেন। তাঁর অধিকাংশ নাটক কলকাতা ও তার বাইরে সফলভাবে মঞ্চস্থ হয়। সাহিত্যকর্ম হিসেবে তাঁর অনেক নাটক উচ্চশিক্ষার পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়েছে।

 


৫.
দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গীতশিক্ষার হাতেখড়ি পিতার নিকট। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন পিতার নিকট থেকে। তারপর বিলেতে থাকা অবস্থায় তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীত শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভাকে শানিত করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলা গানের ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারা উদ্ভাবনে সহায়ক হয়। উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে বাংলা গানের আধুনিকীকরণে যে পঞ্চ গীতিকবি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন, দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁদের অন্যতম। রবীন্দ্রযুগে বাংলা কাব্যসঙ্গীতে বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ ও আধুনিক গান রচনায় তিনি ছিলেন একজন সার্থক রূপকার। নাটক রচনা ও পরিচালনায় তাঁর অসামান্য অবদান থাকলেও তিনি সঙ্গীতকার হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রায় পাঁচশত গান রচনা করেন। প্রথমদিকে তাঁর গান ‘দ্বিজুবাবুর গান’ নামে পরিচিতি ছিল; পরবর্তীকালে তা ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে পরিচিত হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল খুব অল্পবয়স থেকেই গান রচনা করতেন এবং নিজেই সুর দিয়ে গাইতেন। বিলেত যাওয়ার আগে মাত্র সতেরো বছর বয়সের মধ্যে লেখা একশো আটটি গান নিয়ে তাঁর প্রথম গীতসংকলন আর্য্যগাথা (প্রথম ভাগ) ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়। কিশোর বয়সে লেখা এ গানগুলিতে প্রকৃতির মনোরম সৌন্দর্য ও লাবণ্য, জগতের শোক-জরাজাত দুঃখাবসন্নতা, ঈশ্বরভক্তি এবং স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে। এ পর্বের একটি গান হলো: ‘গগনভূষণ তুমি জনগণমনোহারী!/ কোথা যাও নিশানাথ, হে নীল নভোবিহারী!।’ তিনি প্রায় পাঁচ শতাধিক গান রচনা করেন। তাঁর রচিত গানের মধ্যে প্রধানত দুটি ভিন্ন ধারা বিদ্যমান – একটি ধারা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুসারী, অপর ধারাটিতে তিনি ইউরোপীয় ধ্রুপদি সঙ্গীতের “মুভমেন্টস” ব্যবহার করেছেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদ ও খেয়াল শাখা দুটি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল; কিন্তু ঠুংরি গানের রীতি তিনি গ্রহণ করেননি ; বাউল, ভাটিয়ালি ইত্যাদি লোকসঙ্গীতের ধারাতেও তিনি গান রচনা করেননি। তবে তাঁর কয়েকটি কীর্তনাঙ্গ গান রয়েছে।

 


৬.
দ্বিজেন্দ্রলাল ১৮৮৭ সালে এগারো বছর বয়সের সুরবালা দেবীকে বিবাহ করে সংসারজীবন শুরু করেন। এ সময়কালে দাম্পত্যসুখমগ্ন দ্বিজেন্দ্রলাল রচনা করেন অপূর্ব সব প্রেমের গান, যা ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত আর্য্যগাথা-র দ্বিতীয়ভাগে স্থান পায়। এ পর্বের দুটি গান হলো: ‘ছিল বসি সে কুসুম-কাননে/ আর অমল অরুণ উজল আভা/ ভাসিতেছিল সে আননে।’ এবং ‘আজ যেন রে প্রাণের মতন/ কাহারে বেসেছি ভালো!/ উঠেছে আজ মলয় বাতাস,/ ফুটেছে আজ মধুর আলো।’ প্রথম গানটি কীর্তন ঢঙে রচিত এবং রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল। এ ধরনের গান রচনার মূল প্রেরণা ছিল স্ত্রী-প্রণয়। তাই প্রথম ভাগের গানে যেখানে প্রকৃতিপ্রেম ও দেশপ্রেমের উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেখানে দ্বিতীয়ভাগের গানে দেখা যায় তাঁর প্রণয়োচ্ছ্বাস। ১৯০৩ সালে স্ত্রী সুরবালার মুত্যু দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গীতজীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে। আনন্দ ও হাসির গান রচনার ভুবন থেকে তাঁর বিচ্যুতি ঘটে। এক সময় যিনি দাম্পত্য প্রেমের আবেশে রচনা করেছিলেন: ‘তোমারেই ভালবেসেছি আমি/ তোমারেই ভালবাসিব। তোমারই দুঃখে কাঁদিব সখে/ তোমারই সুখে হাসিব\’- স্ত্রী-বিরহক্লিষ্ট সেই তিনিই আবার লেখেন: ‘আজি তোমার কাছে/ ভাসিয়া যায় অন্তর আমার/ আজি সহসা ঝরিল/ চোখে কেন বারি ধার?’

 


৭.
বাংলা গানের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে গান রচনা করার ক্ষমতা ছিল দ্বিজেন্দ্রলালের সহজাত। তদুপরি ওস্তাদ পিতার নিকট থেকে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতে তালিম নেওয়ার ফলে সঙ্গীত রচনায় পাশ্চাত্য সুর আহরণ ও আত্তীকরণ তাঁর জন্য সহজসাধ্য হয়েছিল। বিলেত থেকে ফেরার পর প্রথম দিকে তিনি বাংলা গান রচনায় সরাসরি পাশ্চাত্য রীতি প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, যা সেকালের শ্রোতৃবৃন্দের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য রীতিকে বাংলা গানের আদর্শ অনুযায়ী পরিবর্তন করে তিনি ব্যবহার করতে শুরু করেন। এ পর্যায়ে বেশ কিছু স্কচ, আইরিশ ও ইংরেজি গান ভেঙ্গে তিনি বাংলা গান তৈরি করেন।

 

এমন কয়েকটি গান আর্য্যগাথা-র দ্বিতীয় ভাগে পাওয়া যায়। এর কিছুকাল পর তিনি বিভিন্ন বিষয়, যেমন প্রেম, হাসি, ব্যঙ্গ, দেশাত্মবোধ, ভক্তি ইত্যাদিকে আশ্রয় করে গান রচনা করেন। সেকালে দ্বিজেন্দ্রলালের মতো আধুনিক ঢঙে চমৎকার হাসির গান রচনা করা আর কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন বিলেতে থাকাকালে। তিনি সেখানকার হাসির গান শুনে সেই ঢঙে গান রচনা করতেন। কবি নিজে লিখেছিলেন ‘জাগিয়ে দে লাগিয়ে দে নাচিয়ে দে মাতিয়ে দে’। তাই সমালোচক ঘোষণা করেছিলেন-বাংলাদেশে সুরকার রূপে ওজস্বিতায়, পৌরুষসরলতায়, প্রাণ প্রাচুর্য্যে ভাবাবেশের উদাত্ত অভিব্যক্তিতে দ্বিজেন্দ্রলাল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে বঙ্গে ও বহির্বঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর নাটক। সমকালীন সামাজিক অসংগতি তাঁকে বেদনাবিধুর করে তুললেও সেই অনুভূতি উপস্থাপন করতেন সরস ও হাস্যোদ্দীপকভাবে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে যারা চিন্তাশূন্য পরানুকরণে মত্ত হয়ে উঠত, তারা হয়ে উঠত তাঁর বিদ্রূপের পাত্র : ‘আমরা বিলিতি ধরনে হাসি/ আমরা ফরাসি ধরনে কাশি/ আমরা পা ফাঁক করিয়া/ সিগারেট খেতে বড্ডই ভালোবাসি।’

 


৮.
ভারতীয় রাগসঙ্গীতের কাঠামোয় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চালের সমন্বয়ে দ্বিজেন্দ্রলালের উদার ও ওজস্বী সুরে দেশাত্মবোধক গান রচনা বাংলা গানে এক অভিনব ধারার সূচনা করে। তাঁর গানে রয়েছে সুরের সাবলীলতা। একটি নির্দিষ্ট রাগকে অবলম্বন করেও রাগের সরাসরি প্রভাবকে ছাপিয়ে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে সঙ্গীতে ভাব ফুটিয়ে তোলা রবীন্দ্রনাথের পরে একমাত্র দ্বিজেন্দ্রলালেই সম্ভব হয়েছে। তাঁর ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ গানটিতে ‘কেদারা’ রাগের কাঠামোয় অন্তর উজারকরা দেশাত্মবোধক কথাগুলি সাজানো হয়েছে। এখানে ‘সে যে আমার জন্মভূমি’ লাইনটিতে ইংরেজি গানের ঢঙে তিন রকম সুরের উত্থান-পতনের গতিতে সুর রচনা দ্বিজেন্দ্রলালের এক অসামান্য সৃষ্টি, যা আজও তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

 


৯.
সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত দ্বিজেন্দ্রলাল রচনা করেন অপূর্ব সব ব্যঙ্গরসাত্মক গান। স্বার্থপর রাজনীতিবিদ এবং তথাকথিত দেশভক্তদের উদ্দেশ্য করে রচিত এমন একটি ব্যঙ্গরসাত্মক গান ‘নন্দলাল’। গানটির মধ্য দিয়ে তিনি দেশসেবার নামে স্বার্থপরতার স্বরূপ তুলে ধরে তীব্র বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ করেন। পরিহাসমূলক গান রচনাতেও দ্বিজেন্দ্রলাল সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এমন একটি গানের কিছু অংশ: ‘রাজা। দেখ হতে পার্তাম নিশ্চয় আমি মস্ত একটা বীর/ কিন্তু গোলাগুলির গোলে কেমন মাথা রয় না স্থির; পারিষদ বর্গ।হাঁ তা বটেইতো তা বটেইতো!’ দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর নাটকে এ গানগুলি ব্যবহার করেছেন। এছাড়া শুধু নাটকের প্রয়োজনেই তিনি অনেক গান রচনা করেছেন। তাঁর গান নাটকে বেশি ব্যবহূত হওয়ায় সকলের নিকট তা খুব সহজেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৮৮ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর ভাগলপুর ও মুঙ্গেরে থাকার সময় প্রখ্যাত খেয়ালগায়ক সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের নিকট দ্বিজেন্দ্রলাল সঙ্গীত শিক্ষা করেন। সুরেন্দ্রনাথ খেয়ালগানে টপ্পার চাল মিশিয়ে এক ধরনের চমৎকার গান গাইতেন, যাকে বলা হয় টপখেয়াল। তাঁর সাহচর্যে দ্বিজেন্দ্রলাল একজন দক্ষ সঙ্গীতকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর প্রেম ও বিরহমূলক বেশকিছু গান সুরেন্দ্রনাথ প্রবর্তিত এ টপখেয়াল রীতিতে রচিত।

 


১০.
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে যে গণজাগরণমূলক গান রচনার প্রচলন শুরু হয়, তাতে দ্বিজেন্দ্রলালের অবদান ছিল অসামান্য। এ সময় তিনি প্রচুর দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন যা স্বদেশীদের প্রচন্ডভাবে উদ্দীপিত করে। পরবর্তীকালে দেশাত্মবোধক গান রচনাতেই তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এভাবে দেখা যায় বিভিন্ন ঘটনা, যেমন বালিকাবধূর সাহচর্য, মাত্র ষোলো বছরে দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ইত্যাদির প্রভাবে দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গীতচিন্তা ক্রমবিবর্তিত হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রচিত জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলির মধ্যে ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরাধীন ভারতে বাঙালিদের মধ্যেই যেমন প্রথম বিপ¬বীর জন্ম হয়েছিল, তেমনি বাঙালির কণ্ঠেই প্রথম জলদমন্দ্র ধ্বনিত হয়েছিল দ্বিজেন্দ্রলালের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গানের মধ্য দিয়ে। দ্বিজেন্দ্রলালের অসাধারণ সঙ্গীতপ্রতিভার সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছিল বিদেশী শাসকদের প্রতি তাঁর বিদ্বেষী মনোভাব, যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচিত বিভিন্ন স্বদেশী সঙ্গীতে। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চিত্তাকর্ষক দিকগুলি উত্তমরূপে আত্মস্থ করে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তিনি তা প্রয়োগ করেন বাংলা গানে। বাংলা গানে প্রথম বিদেশী কোরাস গানের ঢঙ প্রয়োগ তাঁর বিশেষ অবদান।

 


১১.
প্রেমের গান রচনায়ও তিনি ছিলেন কৃতবিদ্য। গানের কথার কোনো অংশে কতটা গতিতে সুরের আরোহণ-অবরোহণ হলে প্রেমের আবেগ কতখানি ফুটে উঠবে, সে বিষয়ে তাঁর সচেতনতা লক্ষণীয়। প্রেমের গানে কখনও কখনও বাংলা টপ্পার কোমল দোলা দিয়ে গানের আবেশ তৈরি করে মোহনীয় সুরসৃষ্টি তাঁর অসাধারণ কীর্তি। একজন শিল্পীর কণ্ঠের আয়ত্তের মধ্যে স্বর ক্ষেপণ করার মতো স্বরপরিকল্পনায় তিনি ছিলেন সদা সতর্ক। সে কারণে সুরের একটা উদার ও ওজস্বী ভাব সব সময় তাঁর গানে পরিলক্ষিত হয়। আবার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থে পাওয়া যায় তাঁর বিতর্কপ্রধান সত্তার অভিব্যক্তি। ‘প্রেম কি উন্মত্ততা?’ নিবন্ধে তাঁর ভাষ্য, প্রেমের মূলমন্ত্র আত্মোৎসর্গ - ‘প্রিয়জনের নিমিত্ত অচিন্তিত, সানন্দ আত্মোত্ৎসর্গ...প্রেম পাপ নহে, উন্মত্ততা নহে।... প্রেম মহতী শক্তি। ইহাই কর্ত্তব্যকে পরিচালিত করে’।

 


১২.
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় স্মরণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকল বিদ্বেষ ভুলে তাঁকে নিয়ে ১৩২৪ বঙ্গাব্দে লিখেছেন,‘দ্বিজেন্দ্রলাল যখন বাংলার পাঠকসাধারণের নিকট পরিচিত ছিলেন না তখন হইতেই তাঁহার কবিত্বে আমি গভীর আনন্দ পাইয়াছি এবং তাঁহার প্রতিভার মহিমা স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হই নাই। দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে আমার যে সম্বন্ধ সত্য, অর্থাৎ আমি যে তাঁর গুণপক্ষপাতী, এইটেই আসল কথা এবং এইটেই মনে রাখিবার যোগ্য। আমার দুর্ভাগ্যক্রমে এখনকার অনেক পাঠক দ্বিজেন্দ্রলালকে আমার প্রতিপক্ষশ্রেণীতে ভুক্ত করিয়া কলহের অবতারণা করিয়াছেন। অথচ আমি স্পর্ধা করিয়া বলিতে পারি এ কলহ আমার নহে এবং আমার হইতেই পারে না। পশ্চিম দেশের আঁধি হঠাৎ একটা উড়ো হাওয়ার কাঁধে চড়িয়া শয়ন বসন আসনের উপর এক পুরু ধুলা রাখিয়া চলিয়া যায়। আমাদের জীবনে অনেক সময়ে সেই ভুল-বোঝার আঁধি কোথা হইতে আসিয়া পড়ে তাহা বলিতেই পারি না।

 

কিন্তু উপস্থিতমতো সেটা যত উৎপাতই হোক্ সেটা নিত্য নহে এবং বাঙালি পাঠকদের কাছে আমার নিবেদন এই যে, তাঁহারা এই ধুলা জমাইয়া রাখিবার চেষ্টা যেন না করেন, করিলেও কৃতকার্য হইতে পারিবেন না। কল্যাণীয় শ্রীমান দেবকুমার তাঁহার বন্ধুর জীবনীর ভূমিকায় আমাকে কয়েক ছত্র লিখিয়া দিতে অনুরোধ করিয়াছেন। এই উপলক্ষে আমি কেবলমাত্র এই কথাটি জানাইতে চাই যে, সাময়িক পত্রে যে-সকল সাময়িক আবর্জনা জমা হয় তাহা সাহিত্যের চিরসাময়িক উৎসব-সভার সামগ্রী নহে। দ্বিজেন্দ্রলালের সম্বন্ধে আমার যে পরিচয় স্মরণ করিয়া রাখিবার যোগ্য তাহা এই যে আমি অন্তরের সহিত তাঁহার প্রতিভাকে শ্রদ্ধা করিয়াছি এবং আমার লেখায় বা আচরণে কখনো তাঁহার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করি নাই।-- আর যাহা-কিছু অঘটন ঘটিয়াছে তাহা মায়া মাত্র, তাহার সম্পূর্ণ কারণ নির্ণয় করিতে আমি তো পারিই না, আর কেহ পারেন বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না।’

 


১৩.
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অন্যতম জীবনীকার নবকৃষ্ণ ঘোষ বলেছিলেন, ‘ক্ষুব্ধ বা বিচলিত হইলে দ্বিজেন্দ্র ভাষার সংযম রক্ষা করিতে পারিতেন না।’ তাঁর কাব্যের অভিব্যক্তি প্রবন্ধে দেখা যায়, শুধু ভাষার সংযমই নয়, দ্বিজেন্দ্রলাল রুচির সীমানাও কখনো-কখনো মাত্রাহীনভাবে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৯৫) যুক্তিযুক্তভাবেই বলেছিলেন : ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্মুখী দৃষ্টি হইতে... অতুলনীয় ভাষার ইন্দ্রজালে অনির্বচনীয় ভাবের সৃষ্টি করিতেন।’ আর অন্যদিকে, ‘দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন স্পষ্টবাদী, বাস্তবপন্থী; তাই তাঁহার প্রকাশধর্মে আবেগটাই প্রধান হইয়া উঠিত, রীতিটা নহে।... লালিত্য তাঁহার কাম্য ছিল না - স্পষ্ট কথা মোটা করিয়া বলিলে সকলেই বুঝিতে পারে - এখানেই ছিল তাঁহার গর্ব।’ সেই আত্মগর্বের গরজ থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন, ‘যদি স্পষ্ট করিয়া লিখিতে না পারেন, সে আপনার অক্ষমতা। তাহাতে গর্বের কিছু নাই। অস্পষ্ট হইলেই গভীর হয় না; কারণ ডোবার জলও অস্পষ্ট, স্বচ্ছ হইলে... অগভীর হয় না; কারণ সমুদ্রের জলও স্বচ্ছ।... অস্পষ্টতা একটা দোষ, গুণ নহে।’ তাঁর কবিতায়, নাটকে, গানে এই গুণটি নানাভাবে বিচ্ছুরিত হয়ে উঠেছিল : ক. ‘বিশ্বমাঝে নিঃস্ব মোরা, অধম ধূলি চেয়ে;/ চৌদ্দশত পুরুষ আছি পরের জুতা খেয়ে;/ তথাপি ধাই মানের লাগি ধরণীমাঝে ভিক্ষা মাগি!/ নিজ মহিমা দেশবিদেশে বেড়াই গেয়ে গেয়ে।/ বিশ্বমাঝে নিঃস্ব মোরা, অধম ধূলি চেয়ে।’ (‘জাতীয় সঙ্গীত’, মন্দ্র ) খ. ‘তারেই বলে প্রেম - /যখন থাকে না future-এর চিন্তা,/ থাকে না ক shame - / তারেই বলে প্রেম। যখন বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ;/ যখন past all surgery আর যখন/ past all hope/ তারে ভিন্ন জীবন ঠেকে/ যখন ভারি tame - /তারেই বলে প্রেম।’ (‘প্রেমবিষয়ক : প্রেমতত্ত্ব, হাসির গান) গ. ‘প্রথম যখন ছিলাম কোন ধর্মে অনাসক্ত/ খ্রীষ্টীয় এক নারীর প্রতি/ হলাম অনুরক্ত; - / বিশ্বাস হল খ্রীষ্টধর্মে - / ভজতে যাচ্ছি খ্রীষ্টে, - / এমন সময় দিলেন পিতা পদাঘাত এক পৃষ্ঠে!/ - ছেড়ে দিলাম পথটা, বদলে গেল মতটা,/ (কোরাস) অমন অবস্থায় পড়লে/ সবারই মত বদলায়।’ (‘বদলে গেল মতটা’, ওই)

 


১৪.
রবীন্দ্র-পরবর্তী গীতরচয়িতা হিসেবে বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আগ্নেয় প্রতিভা স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। উনিশ শতকে কাব্য-সংগীতসম্পদের একটি বিশিষ্ট শাখা নাট্যসংগীতরূপে বিকশিত হয়েছিল। দ্বিজেন্দ্রলালই মঞ্চনাটকের সংগীতের বিশিষ্টতাকে আশ্চর্যভাবে বদলে দিয়েছিলেন, যদিও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথের নাট্যসংগীত এক্ষেত্রে দ্বিজেন্দ্রলালের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। আবার, দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যসংগীতের প্রভাব তাঁর সমকালীন সমস্ত নাট্যসংগীতের ওপর অল্পবিস্তর লক্ষ করা যায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকে প্রেমবিষয়ক, দেশপ্রীতিমূলক এবং পরিহাসভাবমূলক - মূলত এই তিন ধরনের গানই আমরা লক্ষ করি। এর মধ্যে, প্রেমসংগীতের তুলনায় দেশাত্মবোধক ও জাতীয়তাবাদমূলক গানগুলির ভাষা-ছন্দ-সুরে দ্বিজেন্দ্রলাল এমন একটি মৌলিকতা প্রকাশ করেছেন যা দুর্লভ। প্রতাপ সিংহ (দ্বিজেন্দ্র-রচনাসংগ্রহে রাণা প্রতাপ সিংহ, স্টারে রাণা প্রতাপ নামে প্রথম অভিনীত) নাটকের এই গানটি দ্বিজেন্দ্রলালের বিখ্যাত ‘হাস্য শুধু আমার সখা’ কবিতাটিকে মনে করিয়ে দেয় -


সুখের কথা বোল না আর বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি।
দুঃখে আছি, আছি ভালো দুঃখেই আমি ভালো থাকি।
দুঃখ আমার প্রাণের সখা, সুখ দিয়ে যান চোখের দেখা
দুদন্ডের হাসি হেসে, মৌখিক ভদ্রতা রাখি।
দয়া করে মোর ঘরে সুখ পায়ের ধুলা ঝাড়েন যবে
চোখের বারি চেপে রেখে মুখর হাসি হাসতে হবে;
চোখে বারি দেখলে পরে, সুখ চলে যান বিরাগভরে
দুঃখ তখন কোলে ধরে আদর করে মুছায় আঁখি।

 


১৫.
অসাধারণ শিল্পকর্মের মূলতত্ত্ব যে সত্য, সুন্দর ও আনন্দ- দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গীতকর্মে তার সার্থক প্রকাশ ঘটেছে; তাই তাঁর গানে রয়েছে মৌলিকত্বের ছাপ। বাংলা কাব্যসঙ্গীতে তথা আধুনিক বাংলা গানে সুর, ভাব ও বিষয়ভিত্তিক রচনায় বিভিন্ন ধারার সমন্বয়করণ দ্বিজেন্দ্রলালের এক মহৎ কীর্তি। একটি সুস্থ সঙ্গীতপরিমন্ডল সৃষ্টিতে তাঁর এ অবদান বাংলার সঙ্গীতাঙ্গনে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৩ সালের ১৭ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। আমার প্রিয় তাঁরই একটি গান দিয়ে শেষ করছি, 'আমরা এমনই এসে ভেসে যাই -/ আলোর মতন, হাসির মতন,/কুসুমগন্ধরাশির মতন,/ হাওয়ার মতন, নেশার মতন/ ঢেউয়ের মতো ভেসে যাই।/ আমরা অরুণ-কনক কিরণে চড়িয়া নামি;/ আমরা সান্ধ্য রবির কিরণে অস্তগামী;/ আমরা শরৎ ইন্দ্রধনুর বরণে/ জ্যোৎস্নার মতো চকিত চরণে,/ চপলার মতো চকিত চমকে/ চাহিয়া, ক্ষণিক হেসে যাই।/ আমরা স্নিগ্ধ, কান্ড, শান্তি-সুপ্তিভরা/ আমরা আসি বটে, তবু কাহারে দিই না ধরা/ আমরা শ্যামলে শিশিরে গগনের নীলে/ গানে, সুগন্ধে, কিরণে-নিখিলে/ স্বপ্নরাজ্য হতে এসে, ভেসে/ স্বপ্নরাজ্য দেশে যাই।'

 

 

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, গ্রন্থপঞ্জি: দেশাত্মা দ্বিজেন্দ্রলাল : নূপুরছন্দা ঘোষ, দিলীপকুমার রায়, মহানুভব দ্বিজেন্দ্রলাল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, করুণাময় গোস্বামী, সঙ্গীতকোষ, বাংলা একাডেমী, সুধীর চক্রবর্তী, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-স্মরণ বিস্মরণ, বাংলা গানের সন্ধানে, কালি ও কলম, ইন্টারনেট)

 

 

লেখকঃ 

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা

 

 


Top