অন্তত ৭ দিন পর সিগন্যাল পাবে বাংলাদেশ | daily-sun.com

অন্তত ৭ দিন পর সিগন্যাল পাবে বাংলাদেশ

ডেইলি সান অনলাইন     ১২ মে, ২০১৮ ২০:৫৫ টাprinter

অন্তত ৭ দিন পর সিগন্যাল পাবে বাংলাদেশ

 

আরও অন্তত সাত দিন পর সিগন্যাল পাবে বাংলাদেশে অবস্থিত বেতবুনিয়া ও গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন। যদিও কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া ও গাজীপুর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে সিগন্যাল পেয়েছে এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে।

যাকে ‘একবারে ডাহা মিথ্যে’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশনের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা। শনিবার (১২ মে) তারা বলেন, ‘৭ দিনের আগে কোনো সিগনাল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি ট্যাকনিকাল বিষয়, এ নিয়ে যেনতেন কথা না বলাই ভাল। ’


এর আগে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (১১ মে) দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে মহাকাশপানে উড়াল দেয় স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। ফ্যালকন-৯ রকেটের নতুন সংস্করণ ব্লক ফাইভ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে রওনা হয় নিজস্ব কক্ষপথে। মহাকাশে পাড়ি দেয়ার পরপর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন। এই তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কক্ষপথে (১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট) স্থাপনের কাজ চলেছে এখন। তবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে।

 


মার্কিন মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সফল উৎক্ষেপণের খবর দিয়ে টুইটে জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের প্রথম ধাপের পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্যালকন-৯ রকেট ভূপৃষ্ঠে ফিরে এসেছে। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ৪৭ মিনিটে সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছেছে বঙ্গবন্ধু-১।


জানা গেছে, রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ার গ্রাউন্ড স্টেশনটি মূলত ব্যাকআপ স্টেশন হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। যদিও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম এর নিয়ন্ত্রণ নেবে এই গ্রাউন্ড স্টেশনটি। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে।


মূলত বেতবুনিয়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন-২ এর ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা কাজে লাগাতেই এমনটা করা হবে। এরপর স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ হবে জয়দেবপুরে স্টেশনেই। তবে কখনও যদি গাজীপুর স্টেশন স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন বেতবুনিয়ার গ্রাউন্ড স্টেশন-২ কাজ শুরু করবে। অনেক ক্ষেত্রে দুই গ্রাউন্ড স্টেশনেই সমানতালে কাজ হবে।


বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশনের প্রকৌশলীরা জানান, উৎক্ষেপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার ৭০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর রকেটের স্টেজ-২ খুলে যাবে। এ জন্য ৭ থেকে ১০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইট উন্মুক্ত হওয়ার পরপরই এর নিয়ন্ত্রণ নেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন। একই সঙ্গে ৭ দিন পর থেকে বাংলাদেশের পক্ষে স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নিতে অপেক্ষা করবে বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন। এর মাঝেই চলতে থাকবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই প্রক্রিয়া শেষ হতে ২০ দিন পর্যন্ত সময় লাগবে।


সূত্র জানায়, ফ্যালকন-৯ রকেটে চারটি অংশ রয়েছে। উপরের অংশে ছিল স্যাটেলাইট, তারপর অ্যাডাপটর। এরপর স্টেজ-২ এবং সবচেয়ে নিচে ছিল স্টেজ-১। দুটি ধাপে এই উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি) এবং স্যাটেলাইট ইন অরবিট। এলইওপি ধাপে ১০ দিন এবং পরের ধাপে ২০ দিন লাগবে।


প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে বিটিআরসির এই স্যাটেলাইট নিয়ে মূল কাজ শুরুর চুক্তি সই হয়। স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করছে ফ্রান্সের ওই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।


এই স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট কেনে বাংলাদেশ। এ জন্য খরচ হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই)। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি নকশা তৈরি, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা, বাজার মূল্যায়ন, স্যাটেলাইট বাজারজাতকরণ এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করছে।


বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস গত ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে কেনেডি স্পেস সেন্টারে স্পেসএক্সের লঞ্চ প্যাড থেকে গত ৪ মে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপেণের কথা ছিল। কিন্তু কারিগরি কারণে তা পরবর্তীতে ৭ মে উৎক্ষেপেণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১০ মে।


তবে ১০ মে দিনগত রাত ৩টা ৪৭ মিনিটে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড-৩৯ এ থেকে কক্ষপথে উড়াল দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রাথমিক কাজ শুরুর পর কারিগরি ত্রুটির কারণে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তা একদিনের জন্য পিছিয়ে দেয় স্পেসএক্স।  


তবে ৪ মে (শুক্রবার) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর পরীক্ষামূলক সফল উৎক্ষেপণ চালানো হয়। ওইদিন অরল্যান্ডোর কেনেডি স্পেস সেন্টারে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালানো হয় ফ্যালকন-৯ রকেটের। এসময় কেনেডি স্পেস সেন্টারের ব্লক ৫ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের পর তথ্য পর্যালোচনা করে স্পেসএক্স। ফলাফল ইতিবাচক পাওয়া যায়।


এদিকে ৪ মের আগে গত ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কথা ছিল। কিন্তু হারিকেন আরমায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় কেইপ কেনাভেরাল থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যায়, বাংলাদেশও সূচির জটে পড়ে।


এদিকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বিশ্বের ৫৭তম স্যাটেলাইট সদস্য দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট পাঠানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যা নিয়ন্ত্রণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের যন্ত্রপাতিও আমদানি করেছে বিটিআরসি।


স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে একদিকে বাংলাদেশকে যেমন আর অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ঘটবে যুগান্তকারী এক বিপ্লব।

 


Top