রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতের ঘটনা সভ্যতার কলঙ্ক: ওআইসি | daily-sun.com

রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতের ঘটনা সভ্যতার কলঙ্ক: ওআইসি

ডেইলি সান অনলাইন     ৪ মে, ২০১৮ ১৬:৪৮ টাprinter

রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতের ঘটনা সভ্যতার কলঙ্ক: ওআইসি

 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অন্য সংস্থার পাশাপাশি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপরাশনও (ওআইসি) জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সফররত প্রতিনিধিরা। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ওআইসির ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান প্রক্রিয়ায় ওআইসি’র ভূমিকা নিয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে জানান তারা।

শুক্রবার (৪ মে) দুপুরে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন ওআইসির সহকারী মহাসচিব হাসমি ইউছুফ।


মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদেরকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতের ঘটনাকে সভ্যতার কলঙ্ক বলেও উল্লেখ করেন হাসমি ইউছুফ।


শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিনিধি দলটি প্রথমে তানজিমার খোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। সেখান থেকে কুতুপালং ডি ব্লক পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা নিপীড়িত, নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বলা কথাগুলো দোভাষী হিসেবে উপস্থাপন করেন কক্সবাজারের ইউএনএইচসিআর’র কর্মকর্তা হাজেরা খানম। এরপর বেলা একটার দিকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রতিনিধি দল।


এর আগে শুক্রবার সকাল সোয়া ৯টায় ওআইসির প্রতিনিধিদের বহনকারী বিশেষ বিমানটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এরপরই ওআইসি প্রতিনিধি দল কলাতলীর একটি অভিজাত হোটেলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ও আরআরআরসি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। বৈঠক শেষে তারা সড়ক পথে ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। বৈঠকে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে অংশ নিতে আসা ৩৮ দেশের মন্ত্রী ও ৮ পররাষ্ট্র সচিবসহ ৬৮ দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিল।


ওআইসি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এইচ মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক। বিকেলেই প্রতিনিধি দলটির ঢাকার উদ্দেশে একই বিমানে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।


উল্লেখ্য, ঢাকায় ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৫তম সম্মেলন শনি (৫ মে) ও রবিবার (৬ মে)। ওআইসি জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এবারের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে আলোচিত হবে। সম্মেলন শুরুর আগে ওআইসরি অন্তর্ভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যান। ওআইসি বার বার মিয়ানমার সরকারকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ এবং সসম্মানে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে আসছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের পুরনো বসতবাড়িতে ফিরিয়ে নিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবার আহ্বানও জানানো হয়েছে অনেকবার। মিয়ানমার সরকারের প্রতি রাখাইনের উত্তেজনার মূল কারণ খুঁজে বের করে তা নির্মূলের আহ্বান জানানো হয়েছে।


এর আগে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট অ্যালেন বেরসে, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদ্রিম, তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান, জর্ডানের রানী রানিয়া আল আব্দুল্লাহ, মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতাবিষয়ক বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন, মার্কিন ডেমোক্রেটিক সিনেটর জেফ মার্কলে, রিচার্ড ডার্বিন, কংগ্রেসের প্রতিনিধি ভেটি মেকলাম, জেন সেকস্কি, ডেভিট সিচেলিন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাসিয়া বার্ণিকাট, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ইয়াং হি লি, ভারতে নিযুক্ত বিশ্বের ১৫টি দেশের ১৯ জন দূত, ইইউসহ জাপান, জার্মান ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা লিসা কার্টিস, মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ড. উইন মায়াত আয়ে, রাখাইন অ্যাডভাইজারি কমিশনের প্রতিনিধি দল ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।


এদের মধ্যে গত ৬ ফেব্রুয়ারিই কক্সবাজারের উখিয়ার কুতপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট অ্যালেন বেরসে এবং গতকাল ১০ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন।


এছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারি ১১ সদস্যবিশিষ্ট ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার বিকেলে কুতুপালং ও মধুরছড়া ক্যাম্প এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন নোবেল জয়ী তিন নারী। তারা রোহিঙ্গা নিধনে জড়িত থাকার অভিযোগে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সুচিকে দায়ী করেন। তার পদত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবি জানান। 


নোবেল বিজয়ী এই তিন নারী হলেন, ইরানের শিরিন এবাদি, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমান ও যুক্তরাজ্যের মেরেইড ম্যাগুয়ার।


এরপর গত ৩ মার্চ টেকনাফের শামলাপুর অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি কেরুনতলী ট্রানজিট ঘাট পরিদর্শন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা লিসা কার্টিস।

 
এরপর ১১ এপ্রিল কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকের আইওএমর হাসপাতালে মিয়ানমার সামরিক জান্তা কর্তৃক নির্যাতিত ২২ জন পুরুষ ও ১২ জন নারীর সাথে কথা বলেন মিয়ানমারের সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ড. উইন মিয়াত আয়ে। ওই সময় তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে আগের সেই পরিবেশ আর নেই। সেখানে রোহিঙ্গাদের ৩০টি ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। ক্যাম্পে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের কিছু রাখার পর স্ব-স্ব বাড়ি-ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। 


এরপর গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু জিরো পয়েন্টের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। প্রতিনিধি দলের ২৬ জনের মধ্যে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধিসহ ১০ জন স্থায়ী এবং পাচঁজন উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। ১৫ সদস্যের এই ইউএনএসসি প্রতিনিধিদলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রতিনিধিরা ছিলেন। অপর সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, বলিভিয়া, গিনি, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, কুয়েত, লেদারল্যান্ডস, পেরু, পোল্যান্ড ও সুইডেনের স্থায়ী প্রতিনিধিগণ এবং আইভরি কোস্টের ডেপুটি স্থায়ী প্রতিনিধি।


এদিকে ৬ এপ্রিল মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকা পরিদর্শনে যান জাতিসংঘের অফিস ফর কো-অরডিনেশান অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) ডেপুটি হিউম্যানিটারিয়ান চিফ উরসুলা মুয়েলার। গত বছর যে এলাকাগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছিল, মংডু এলাকা তার মধ্যে অন্যতম।


উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে উত্তরাঞ্চলের রাজ্য রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। অভিযানের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, এই অভিযানের সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘জাতিগত নিধন’, ‘গণহত্যা’ ও ‘পদ্ধতিগত’ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। যদিও শুরু থেকেই মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার চুক্তি করেছে।

 

আরও পড়ুন:

 

বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজারে ওআইসি প্রতিনিধিদল

 

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমরা প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন: নিরাপত্তা পরিষদ

 

বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের দেখতে জিরো পয়েন্টে জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা

 


মংডু সফরে ইউএনওসিএইচএ’র ডেপুটি প্রধান

 


রোহিঙ্গাদের যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে: মিয়ানমারের পুনর্বাসন মন্ত্রী

 


রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে লিসা কার্টিস

 


রোহিঙ্গা নিধনে সু চিকে দায়ী করলেন নোবেল বিজয়ী তিন নারী

 

 


Top