কবি বেলাল চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ: বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি | daily-sun.com

কবি বেলাল চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ: বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন     ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১৯:৩৩ টাprinter

কবি বেলাল চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ: বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি



১.
স্বনামধন্য কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সম্পাদক ও অনুবাদক বেলাল চৌধুরী। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁর পদচারণা।

তবে বেলাল চৌধুরী মূলত কবি হিসেবেই সাহিত্যাঙ্গণে সুপরিচিত। সময়ের প্রধান কবিদের একজন কবি বেলাল চৌধুরী। আপন আলোয় সাহিত্যাঙ্গন সমুজ্জল করে রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। কবিতার বরপুত্র বেলাল চৌধুরী কবিতায় মাত করে রেখেছেন এপার ওপার। কবিতার সাথেই ছিলো যার ঘর সংসার। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কবি বেলাল চৌধুরীর ছেলে আব্দুল্লাহ ইউসুফ প্রতীক চৌধুরী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানান, দুপুর ১২টার দিকে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। ষাটের দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বেলাল চৌধুরী সাংবাদিকতা করতেন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশন থেকে প্রকাশিত ‘ভারত বিচিত্রা’র সম্পাদক ছিলেন তিনি। তিনি একুশে পদক পেয়েছিলেন। গত শুক্রবার থেকে বেলাল চৌধুরীকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। কবির মহাপ্রয়াণে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। উল্লেখ্য যে, ১৯৩৮ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

 


২.
বেলাল চৌধুরী সেই কবি যিনি বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে এক সময় সেখানকার সাহিত্যপাড়াকে মাতিয়ে এসেছেন। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ ওই বাংলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবির সঙ্গে। এ নিয়ে সেখানকার সাহিত্যপাড়ায় প্রচলিত রয়েছে অনেক কিংবদন্তি গল্পও। ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামের বইঘর থেকে প্রকাশিত বেলাল চৌধুরীর কবিতাগ্রন্থ ‘জলবিষুবের পূর্ণিমা’র শেষ প্রচ্ছদে তাঁর সম্পর্কে শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘কলকাতা ও ঢাকার সাহিত্যিক আড্ডাতে তো বটেই এমনকি একাধিক বাংলা উপন্যাসেও একটি স্থান দখল করে নিয়েছেন বেলাল চৌধুরী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসে একটি বিশিষ্ট চরিত্র হিসেবে বেলালকেই নির্বাচন করেছিলেন।’ আমরা দেখছি শুধু সুনীলের ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসেই নয়, তাঁর ‘দুই নারী, হাতে তরবারি’, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্বর্গে তিন পাপী’ উপন্যাসেও বেলাল চৌধুরী প্রতিভাসিত অনন্য মাত্রায়। তাঁকে চরিত্র করে গল্প লিখেছেন গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরূপরতন বসু। আমরা এ লেখায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘কলকাতার দিনরাত্রি’, তুষার রায়ের ‘শেষ নৌকা’ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘কলকাতা’ উপন্যাসে চকিত ভ্রমণ করে দেখতে চাইবো কথাশিল্পের অন্তর্জগতে কীভাবে একজন কবি তাঁর জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে অনায়াসে প্রতিস্থাপিত হয়ে ওঠেন।

 


৩.
আজন্মের বোহেমিয়ান কবি বেলাল চৌধুরী তাঁর কবিতায় ‘আত্মোপলব্ধি, মানুষ, সমাজ ও সমাজ সংলগ্ন বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানবিক বিপর্যয়’ তুলে ধরেন। কফি হাউজ, বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধায় ও কবিদের মানসলোকের রহস্য নিয়ে তিনি বিস্তৃত ব্যবচ্ছেদ করেছেন। শিল্পবোদ্ধাদের কারো কারো মতে, বেলাল চৌধুরী কবিতার রাজ পুত্তুর। পঞ্চাশ দশকে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদে প্রকাশিত কবিতার মাধ্যমে কবিতাঙ্গনে তাঁর যাত্রা শুরু। বিচিত্র খেয়াল, রকমারি কাজ ও ভ্রমণপিপাসু মন তাঁর কবিতাকে বহুমাত্রিকতা দিয়েছে। তাঁর কবিতা প্রচলিত জীবনধারার বিপরীতে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও অনন্ত আকাঙ্ক্ষাকে জাগরুক রাখে। আড্ডা, আবিষ্কার, বোহেমিয়ান জীবন তিনি কবিতাবদ্ধ করেছেন। তাঁর কবিতা সুপাঠ্য। কবি বেলাল চৌধুরী যে রহস্যলোকের দরোজা পাঠকের চোখের সামনে খুলে ধরেছেন সেখানে অনন্ত জিজ্ঞাসা, মর্মায়ত আনন্দ-বেদনার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি অর্থময় হয়ে ওঠে ।

 


৪.
কবি বেলাল চৌধুরী ১৯৬৩ সালে কোলকাতায় নোঙর ফেলার মাধ্যমে লেখালেখিতে যে আত্মনিয়োগ তা আজও স্বতঃশ্চল। ১৯৬৫ থেকে বেলাল চৌধুরী প্রতিনিয়ত রচনা করেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী ও বহুমাত্রিক গদ্য। সম্পাদনা করেছেন ‘কৃত্তিবাস’ নামক সাহিত্য পত্রিকার তিন সংখ্যা। ১৯৭৪ সালে জন্মভূমি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বেলাল চৌধুরী কবিতায় নতুন রূপ, সৌন্দর্য ও অবারিত শস্য উপাদান উত্কর্ষণে ব্যস্ত। তিনি তাঁর সমসাময়িক কবিদের থেকে স্বতন্ত্র একটি কণ্ঠস্বর আবিষ্কার করেছেন। শুধু প্রেমের কবিতা কিংবা দ্রোহের কবিতা, কিংবা শ্লোগানসর্বস্ব পঙিক্তমালা রচনা করে তিনি বাহবা কুড়াতে মনোযোগী হননি। তাঁর কবিতায় নদীর কল্লোল, স্থিরতা, প্রকৃতি আর মানুষের সৌন্দর্যময়তা, মনোভঙ্গি ও দহন ক্রিয়াশীল। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষ, মানুষের প্রেম, হূদয়বৃত্তি ও যাপিত জীবন ঘিরে তাঁর আগ্রহ পাঠককে উদ্দীপ্ত করে। নতুন ভাবনায় আটকে দেয়। পঞ্চাশ দশকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ—ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসকদের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিসংগ্রামে জোটবদ্ধ জাতি ষাট দশকের সময় থেকে কুড়িয়ে আনে সমাজচেতনা ও প্রগতিবোধ। বেলাল চৌধুরী তাঁর কাব্য চেতনায় ধারণ করেন অস্তিত্ব ভাবনা। প্রকৃতপক্ষে বিশুদ্ধ কবিতার হাত ধরে তাঁর পথচলা আজো অব্যাহত আছে।

 


৫.
কবি বেলাল চৌধুরী সব সময় তারুণ্যের পূজারি। সারাজীবনই তরুণদের কাছে টেনেছেন, ভালবেসেছেন, দিয়েছেন প্রশ্রয়। কোন তরুণের মধ্যে সামান্য প্রতিভার উঁকি দিলেও তাকে উৎসাহের জোয়ারে ভাসিয়েছেন। হাত ধরে নিয়েছেন এগিয়ে। সে হোক না কবিতা, গল্প, চিত্রশিল্প, সঙ্গীত- নান্দনিকতার যেকোন ক্ষেত্র। তার সময়ে সমসাময়িক অনেকের চোখেই ছিলেন নায়ক, তরুণদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

 


৬.
কবি বেলাল চৌধুরীর পৈত্রিক নিবাস ফেনীর শারিশাদি। তাঁর পিতার নাম রফিক উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং মাতার নাম মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী। তিনি ৪ ভাই ৫ বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর স্ত্রী : কামরুনন্নেসা চৌধুরাণী (প্রয়াত)। তাদের সন্তান হলেন কন্যা সাফিয়া আখতার চৌধুরী মৌরী, দুই পুত্র আব্দুল্লাহ প্রতীক ইউসুফ চৌধুরী এবং আব্দুল্লাহ নাসিফ চৌধুরী। কবি বেলাল চৌধুরীর গর্ভধারিণী মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী যে কবি ছিলেন সে কথা আমরা তার স্মৃতিচারণা থেকে জানতে পারি! তাঁর মায়ের আছে ‘চির সমধুর’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। গ্রামের মক্তবে পড়া সে সময়ের অনগ্রসর মুসলমান সমাজের ততোধিক পিছিয়ে থাকা কোন নারীর মাধ্যমে এমন সৃষ্টি যেমন দুর্লভপ্রাপ্তি তেমনি বোঝা ও অনুধাবন করা যায় স্রষ্টার পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক সাংস্কৃতিক আবহাওয়া–জলবায়ু। এই কবি ও কবিজননী বেলাল চৌধুরীর কাব্যমানস গঠনে শুধু সহায়কই নন, প্রভাব বিস্তার করেছেন সুদূরপ্রসারী। সাধারণ একটা ধারা বা ধারণা প্রচলিত আছে- কোন কবি বা সৃষ্টিশীল মানুষের কর্মপ্রেরণার নেপথ্যে থাকেন কোন না কোন নারী। বেলাল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও হলো সত্য। সে সত্যের নাম পরমমমতাময়ী মা। আজ যে বেলাল চৌধুরীকে পাঠক হিসেবে আমরা পড়ি তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই মায়ের মাধ্যমেই। পিতা রফিক উদ্দিন আহমদ চৌধুরীরও অনুকূল সহযোগিতা কাব্যভাসানের যাত্রী হিসেবে উঠে পড়তে করেছিল সহায়তা। উদার মনের এ মানুষটি এক উন্নত সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করেছিলেন পরিবারে।

 


৭.
তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে দেখি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে মানুষ ও বিশ্বের ছাত্র হওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। তাঁর শৈশব-কৈশোরেই মনে রেখাপাত করে, দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়- শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর মাধ্যমে। প্রগতিশীল মানস গঠনের খেলাঘর নামের বাহনটি তার মনোজগত নিয়ে যায় অনেক দূর, খুলে দেয় এক অন্য দিগন্ত। যে দিগন্ত শুধু সৃষ্টিসুখ দিয়ে মোড়ানো, দেশ-জাতি মানুষের কাছে দায়বদ্ধতার স্লোগানে মুখর। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক। আর কর্মজীবনে পাই বোহেমিয়ান এক কবিকে যিনি জীবনে অর্থ আয়ের প্রতি চিরকালই থেকেছেন উদাসীন। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ করেছেন সচিত্র সন্ধানী, ভারত বিচিত্রা, দৈনিক রূপালীতে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম বলতে, এরকমই হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দিয়েছেন নিজের মেধা-শ্রম। থিতু হননি কোনখানে।

 


৮.

কবি বেলাল চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে কবিতা : নিষাদ প্রদেশে, বেলাল চৌধুরীর কবিতা, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থিরজীবন ও নিসর্গ, স্বপ্নবন্দী, জলবিষুবের পূর্ণিমা, বত্রিশ নম্বর, প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে, প্রাণকোকিলা, সেলাই করা ছায়া, যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে, কবিতার কমলবনে, বিদায়ী চুমু, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। গদ্য : মিশ্র চিত্রপট, নিরুদ্দেশ, হাওয়ায় হাওয়ায়, স্কুলিঙ্গ থেকে দাবানল, ডুমুর পাতার আবরণ, রোজনামা : বল্লাল সেনের বকলমে, লাকসাম দাদা, গ্রেট হ্যারি এস, সুন্দরবন সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ। অনুবাদ : মৃত্যুর কাড়ানাড়া (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ), এ্যান্ডোরা (মার্কস ফিশ,) জলের মধ্যে চাঁদ ও অন্যান্য জাপানি গল্প, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১ম, ২য় ও ৩য় খ-)।ভ্রমণকথা : সূর্যকরোজ্জ্বল বনভূমি। শিশুসাহিত্য : সাড়ে বত্রিশ ভাজা, বত্রিশ দাঁত, ফাতনা, সপ্তরত্নের কাণ্ডকারখানা, সবুজ ভাষার ছড়া। সম্পাদনা : লঙ্গরখানা, পদাবলী কবিতা সঙ্কলন, বিশ্ব নাগরিক গ্যেটে, পাবলো নেরুদা শতবর্ষ স্মারক, শামসুর রাহমান সংবধর্না গ্রন্থ, কিংবদন্তির কথকতা-আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ স্মরকগ্রন্থ, হাসান-হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ। পুরস্কার-সম্মাননা : একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন পুরস্কার, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার।

 


৯.
কবি বেলাল চৌধুরীর শৈশব-কৈশোরের মুক্ত দিনগুলো কেটেছে গ্রামের বাড়িতে। গাছপালায় ঘেরা, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ। চিরকালীন বাংলার এক অপূর্ব নৈসর্গিক আবহ। মনে হতো-‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন।’ বাড়িতেও তেমন পরিবেশ। বৃক্ষশোভিত গ্রামের অবস্থাপন্ন বনেদি বাড়ি। বড় পুকুর, পুকুরঘাটে বসে বাতাসের নিস্তরঙ্গ জলে মৃদু ঢেউ দেখা আর গুনগুনিয়ে ছড়াকাটা কিশোর বেলাল চৌধুরীর তখন নিত্যাভ্যাস। এসব মিলিয়ে সৃষ্টিশীল মগ্নতার এক অনুকূল পরিবেশ। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রেলপথ। দিন-রাতই চলে অবিরাম ট্রেন। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে কু-উ-উ-ঝকঝক শব্দ তুলে হারিয়ে যায় সমান্তরাল পথ ধরে। কিশোর মনে তোলপাড় ঘটে, আকুল হয় সৃষ্টি সুখের প্রত্যাশায়। একদিন হঠাৎই বানিয়ে ফেলেন ছড়া-‘ঝকঝক গাড়ি চলে/ আগে চলে ইঞ্জিন।’ প্রথম সৃষ্টির সে কী আনন্দ! কোথায় কখন তা ছাপার অক্ষরের মুখ দেখেছিল সে আর এতদিন পরে মনে পড়ে না কবির। তবে সেই আনন্দ, পুলক অনুভব করেন আজও।

 


১০.
কবিতার হাত ধরেই তিনি ঘর ছাড়েন অধরা শিল্প মাধুরীর অন্বেষায়। শুধু তাই নয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতিও ছিল না অনুকূলে। রাজনৈতিক ও কবি পরিচিতি স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের গতি ব্যাহত হয় পুলিশী তৎপরতায়। ঘর ছেড়ে ১৯৬৩ সালের কোন এক সময় ডেরা গাড়েন কলকাতায়। একই ভাষা, একই সাংস্কৃতিক আবহ। মজে যান সেখানে, অনুকূল পরিবেশ পান সাহিত্য সাধনার। তবে স্থায়ী ডেরা আর সেখানে হয় না, পড়ে থাকে সুদূরের কোন সীমানায়। শুরু হয়ে গেল এক বাউণ্ডুলে জীবনগাথার সূচীপত্র।

 


১১.
‘ঊনআশি বছরের চিরযুবক’ স্মৃতিচারণায় রবিউল হুসাইন লিখছেন, ‘কিছু কিছু মানুষের জন্মদিনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনই তাঁর নতুন করে হয়ে ওঠা এবং বেড়ে ওঠার দিন। কবি ও মানুষ বেলাল চৌধুরী সেই রকম একজন—এই পৃথিবী নামক গ্রহের বিশিষ্ট জীব। বেলাল চৌধুরীর তুলনা তিনি নিজেই। এ রকম বন্ধুবৎসল নিরহংকার, প্রচারবিমুখ, উদারমনস্ক, প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক, জীবনবাদী, গভীর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও মনেপ্রাণে আধুনিক মানুষ এই বিক্ষুব্ধ ও জঞ্জালপূর্ণ সমাজে অতি বিরল। সর্বপ্রকার অনসূয়ামুক্ত, পরোপকারী ও মুক্তমনের অধিকারী উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আমাদের এই প্রিয় বেলাল ভাই এক কিংবদন্তি পুরুষ। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় সুশ্রী ও আড্ডাপ্রিয় বেলাল ভাই এমন একজন মানুষ, যিনি প্রথম দেখায়ই সবাইকে আকর্ষণ করার বিরল ক্ষমতা রাখেন। তাঁর প্রথম প্রেম মানুষ, তার পরে কবিতা। এবং আশ্চর্যজনকভাবে সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়ই তিনি একজন দক্ষ কারিগর। বিশেষ করে তাঁর হাতের স্বাদগদ্যের কোনো তুলনা নেই।’

 


১২.
রবিউল হুসাইন আরো লিখছেন, ‘ঢাকা ও কলকাতায় বেলাল ভাইয়ের অফুরন্ত বোহেমিয়ান জীবন, বিচিত্র বিচিত্র পেশা পরিবর্তন, বেহিসাবি আড্ডা, অগণিত বন্ধু, বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও নারীমহলে তাঁর ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধা, পানাহারের প্রতি শিল্পিত পক্ষপাতিত্ব, বৈঠকে তুখোড় মধ্যমণি—কথক, স্মিত হাসিময় সহজ-সরল অভিব্যক্তিসহ মুখাবয়ব—সব মিলে তিনি আমাদের সাহিত্যজগতের একটি প্রিয় অপরিহার্য চরিত্র ও মানুষ। সব দেশের সব সাহিত্য অঙ্গনে এক বা একাধিক বেলাল চৌধুরীর জন্ম হতে পারে—যত হবে ততই সে জগৎ বৈচিত্র্যময় হয়ে পরিপূর্ণতা পাবে। তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা আজীবন সেই রকম পরিপূর্ণতাপ্রদায়ী এক সহায়ক ও শক্তির প্রতিভূ এবং এইভাবে আমাদের সবার মনে চিরজাগরূক হয়ে থাকবেন। বাংলা একাডেমি ও জাতীয় কবিতা পরিষদ, কবিতালাপসহ একুশে পদক পাওয়া ৭৯ বছরের চিরযুবক এক দেশপ্রেমিক অসাম্প্রদায়িক উদার মনের মানুষ এখনো প্রাণময়, তাঁর শুভ জন্মদিনে জানাই আমার অন্তর-নির্গত অফুরান শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। এই দিন বারবার প্রতিবার তাঁর জীবনে ফিরে ফিরে আসুক। জয়তু বেলাল ভাই। যুগ যুগ জিয়ো!’

 


১৩.
রক্তস্রোত বেয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে বাঙালীর মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ ১৯৭১ সাল। বাঙালীর মুক্তিদাতা ও স্বাধীনতার নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চ ঘোষণা দেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বিশ্ব আলোড়িত এ ভাষণে কে না সেদিন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন? এ আহ্বানে মুক্তিপাগল বাঙালী যখন অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমে পড়ে তখন কি আর ভাষা আন্দোলনে কারাবরণকারী, স্বাধিকার আন্দোলনের হুলিয়া-মামলা ঘাড়ে বহনকারী কর্মী আর বসে থাকতে পারেন? কলকাতা থেকে এলেন ঢাকায়। আবার কলকাতায়। অস্ত্র হাতে নয়, তুলে নিলেন কলম। যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে করলেন কিছু প্রকাশনা। পরম সহায়তাকারী পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুদের সহযোগে সাহিত্য -সংস্কৃতির নেতাকর্মীদের যেভাবে পারা যায় সেইভাবে করলেন সহায়তা। করতে থাকলেন একটি পতাকার জন্য অপেক্ষা এভাবে– ‘একটি পতাকা হতে পারে কত আনন্দের/ স্বাধীনতা শব্দটি কত অনাবিল;/ মুক্ত হাওয়ায় পতপত স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন দেশের/ সার্বভৌম, সুন্দর, দেশজ চেতনার রঙে রাঙা... ’(মর্মে মর্মে স্বাধীনতা)

 


১৪.
কবি বেলাল চৌধুরীর জীবনের আরেক স্বর্ণস্বাক্ষর ‘ভারত বিচিত্রা’। তখন বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক অনিবার্য নাম বেলাল চৌধুরী। দীর্ঘ বোহেমিয়ান জীবন এ সংযোগ স্থাপন করেছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ নীতিনির্ধারক মহলেও পৌঁছেছিল। ভারত সরকারের দৃষ্টিতে বেলাল চৌধুরী এক মিত্রের নাম হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ও বিনামূল্যে প্রচারিত ভারত সরকারের অন্যতম মাসিক প্রকাশনা সম্পদনার আহ্বান পান তিনি। পত্রিকাটি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর বন্ধন স্মারক হিসেবে আজও স্বীকৃত এবং প্রকাশিত হচ্ছে। সম্পাদক হিসেবে বেলাল চৌধুরীর যোগদান কোন বাংলাদেশী বাঙালীর জন্য সম্মানতিলক। তাঁর যোগ্য সম্পাদনায় তুমুল পাঠকপ্রিয় হয় প্রকাশনাটি। এর প্রচার এমন এক পর্যায়ে যায় বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা যেত মাস শেষে সচেতন পাঠকের অধীর অপেক্ষা। স্থানীয় পোস্ট অফিসে আগাম খোঁজ নেয়া হতো- এলো কি ভারত বিচিত্রা? উভয় দেশের ভাষা-সংস্কৃতির চমৎকার মিল ও মিলনের বাহন পড়ে পাঠক পেতেন এক নির্মল ও অনির্বচনীয় আনন্দ। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভারত বিচিত্রার লক্ষ লক্ষ পাঠক-গ্রাহক গড়ে ওঠে। যা কোন বিদেশী দূতাবাস কর্তৃক প্রকাশিত কোন মৈত্রীর স্মারক প্রকাশনা আজ পর্যন্ত ডিঙ্গাতে পারেনি। এটা সম্ভব হয়েছে বেলাল চৌধুরীরই মেধা, মনন, ঐকান্তিকতার সমন্বয়ে। একযুগ এ প্রকাশনার হাল ধরে ছিলেন তিনি। আজও ভারত বিচিত্রার নাম উঠলে একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় বেলাল চৌধুরীর নাম। বেলাল চৌধুরী আর ভারত বিচিত্রা যেন সমার্থক হয়ে আছে সেই সময়ের পাঠক ও বোদ্ধা মহলের হৃদয়ে।

 


১৫.
যখনই কোন সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই বেলাল চৌধুরী প্রতিবাদ-প্রতিরোধে হয়েছেন সরব, হয়েছেন মুখর। কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, সৃষ্টিকর্ম ও সংগঠন নিয়ে দাঁড়িয়েছেন জনতার কাতারে রাজপথে। আজও তার মনন তেমনি সক্রিয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন অগ্রজ কবিদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কবিতা পরিষদেও বেলাল চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অনন্য। নেতৃত্ব পর্যায়ে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে করে বেগবান। মূল আন্দোলনের এক বড় সহায়ক শক্তিরূপে। চলমান থাকে কবিতা পরিষদের কার্যক্রম। নূর হোসেন, জিহাদ, ডা. মিলনসহ অন্য শহীদদের রক্তের ধারায় ভেসে যায় স্বৈরাচার এরশাদের তখত। তারই ফলে ১৯৯০ সালে জয়ী হয় সাধারণ মানুষের চাওয়া। আজো সেই মানসিকতার প্রকাশ ঘটতে দেখি তার রচনায়।

 


১৬.
কবিতা নিয়ে কবি বেলাল চৌধুরী বলেছেন, ‘শুধু মাত্র শব্দ কখনো কবিতা হয়। একটা চিন্তাকে সুন্দর শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে কবিতা তৈরী করা হয়। তবে শব্দের ভূমিকা কিন্তু প্রকট।’ কবি মনে করেন সব কিছুতেই একটা থিমের উপর নির্ভর করে মানে গল্প, নাটক লিখতে থিমের প্রয়োজন হয় কবিতায়ও এর প্রয়োজন পড়ে। কবির ভাষায়, ‘একটা সুন্দর ও স্বার্থক কবিতার জন্য থিম খুবই দরকারী। কবি বা কবিতার কাছে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রের অনেক কিছু পাওয়ার আছে। সেটা দেয়ার জন্য মৌলিক চিন্তা অবশ্যই দরকার।’

 


১৭.
কবি বেলাল চৌধুরী এমন একজন কবি, যে কবি বিশ্বায়ন বুকে নিয়ে হাঁটেন, তাঁর কাছে পুরো পৃথিবীটাই ঘর। তিনি শুধু একজন ভ্রামণিক। কবি বেলাল চৌধুরী নিজের জীবনের প্রবাদতুল্য সময়কে তুলে ধরেছেন নানা রচনায়, নিজের জীবনের গল্প বলতে চেয়েছেন কবিতায়, স্মৃতিচিত্রে। বেলাল চৌধুরীর কবিতা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। তাঁর কবিতার বহুল পাঠ ও বিশ্লেষণ জরুরি। তাঁর মহাপ্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারালো একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পসৈনিককে, যিনি আজন্ম কাব্যজীবন যাপন করেছেন একান্ত নিজের মতোন করে, কবিতার ঘরে, স্বপ্ন কণ্ঠস্বরে।

 

 

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা

 

 

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)


Top