বিশ্ব বই দিবস : ছেঁড়া পাতার জোড়াতালি | daily-sun.com

বিশ্ব বই দিবস : ছেঁড়া পাতার জোড়াতালি

আবদুল্লাহ আল মোহন     ২৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:০৪ টাprinter

বিশ্ব বই দিবস : ছেঁড়া পাতার জোড়াতালি

১.
আজ ২৩ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক গ্রন্থ বা বই দিবস। বইপড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব বই-দিবসে বই প্রেমিক সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা।

যদি প্রশ্ন করা হয়, আমাদের ‘নিঃস্বার্থ ও শ্রেষ্ঠ বন্ধু’ আসলে কে? প্রায় সবাই একবাক্যে বলেন ‘বই’। আমাদের জীবনের বেঁচে থাকার আলোকিত জানালাটির নাম ‘বই’। আর তাই শুরুতেই বলি সেই মহাজন বাক্য ধার করে- ‘তবুও বই পড়ুন’। একটি বইয়ের আবেদন বহুধা বিস্তৃত, বিচিত্রগামী। অসংখ্য মানুষের কাছে কতভাবে সে পৌঁছে যায়। প্রতিটি পরিবারে হৃদয়গ্রাহী, অমূল্য, ধ্রুপদি বই দিয়ে একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা জরুরি বলেই বিশ্বাস করি। কারণ বই হচ্ছে মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। বইয়ের সাথেই মানুষ তার চিন্তা, বুদ্ধি, যুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করে থাকে। বই হচ্ছে বিবিধ জ্ঞানের ভাণ্ডার। বিশ্বের মহৎ লেখকেরাও তাদের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন তথ্য, ঘটনার চাক্ষুস বিবরণ, মহান ব্যক্তিদের জীবনগাথা ইত্যাদি বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করে গেছেন। সে বইগুলো পড়েই আমরা আমাদের জীবন সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি। বই পড়লেই পাওয়া যায় অদেখা জিনিস দেখার মজা, কাছে না পাওয়া ব্যক্তির সান্নিধ্য, না জানা কথা জানার সৌভাগ্য। বই পড়ার অভ্যাস থাকা লোকদের সাধারণত স্পর্শ করতে পারে না নৈতিক স্খলন, উচ্ছৃঙ্খলতা ইত্যাদি। বই হচ্ছে জীবনের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক। তাছাড়া বই বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষকে এক স্থানে নিয়ে আসে। শৈশবেই যদি কারো পাঠাভ্যাস গড়ে দেয়া যায়, তাহলে খুব সহজেই ওই শিশুটি মূল্যবোধ ও নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। তাই সবাইকে বইয়ের কাছে আসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে জরুরি বলেই মনে করি। সেই সাথে দিক নির্দেশিকা বই পড়া নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর তার সাথে নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি চালু ও শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।


২.

বইয়ের প্রতি ভালোবাসা বাড়াতেই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ২৮তম সাধারণ সম্মেলনে ২৩ এপ্রিল দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থ দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। পৃথিবীর শতাধিক দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য সকলের মাঝে বিশেষ:ত নবীন ও তরুণদের বইপড়ায় আগ্রহী করে তোলার জন্য পাঠাভ্যাসের প্রসার ও সুযোগ বৃদ্ধি করা। এই তারিখটি তারা বেছে নিয়েছিলেন কারণ ২৩ এপ্রিল তারিখটি বিশ্বের তিন কালজয়ী কবি ও কথাসাহিত্যিকের জন্ম ও মৃত্যু দিবস। ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে ইংল্যান্ডের উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জন্মগ্রহণ করেন, আবার ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দের এই দিনেই উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, স্পেনের মিগেল দে সের্বান্তেস্ এবং পেরুভিয়ান লেখক ইনকা গার্সিলাসো দে লা ভেগা প্রয়াত হন। নিশ্চয়ই আমাদের বিনা বাক্যব্যয়ে স্বীকার করতে হয় যে, আন্তর্জাতিক গ্রন্থ দিবস হিসেবে নির্বাচনের জন্য এমন তারিখের খুব কম বিকল্পই পাওয়া যাবে। ইউনেস্কোর অষ্টবিংশতিতম সাধারণ সম্মেলনের প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে ঐতিহাসিক বিবেচনার দিক থেকে বই হচ্ছে জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম এবং জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায়। জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সর্বপ্রকার উদ্যোগ তাই যাদের জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার আছে তাদেরই কেবল অনেকখানি আলোকিত করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক সর্বজনীন সচেতনতা পূর্ণতর করার ক্ষেত্রেও যেমন সাহায্য করবে, তেমনি পারস্পরিক সমঝোতা, সহনশীলহতা ও আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে আচরণের বিষয়টিকেও উদ্দীপ্ত করবে। এ জন্যই গ্রন্থ দিবসের সৃষ্টি এবং সে জন্য কী কী করণীয় তার উপায়ও কিছু কিছু ইউনেস্কো বলে দিয়েছে।

 


৩.
মানব সভ্যতার উত্তরণ লগ্ন থেকে হৃদয় ও মননের শ্রেষ্ঠ এবং নিঃস্বার্থ সঙ্গী রূপে বই চিহ্নিত হয়েছে। বই পড়ার তাই কোনো বিকল্পই নেই। ‘বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না’—এই আপ্ত বাক্যটি স্মরণে রেখে আসুন সবাই বেশি বেশি করে বই পড়ি। বই আমাদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে সহায়তা করবে। একজন প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্রই হচ্ছে বই। আসুন আমরা আগামী প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বই প্রদান করি। বার্নার্ড লেভিন বলেছিলেন, মানুষের উচ্চারিত মহত্তম শব্দটি হচ্ছে ‘বই’। মানুষ সভ্যতামুখী হয়ে পড়ার সাথে সাথে নতুন নতুন চিন্তা, নতুন জ্ঞানে পুষ্ট হয়ে ওঠে। আর তাদের সে জ্ঞান ও চিন্তাগুলোকে প্রকাশ করার জন্য তারা মাধ্যম খুঁজে বেড়ায়। বোধ হয়, এর তাগিদেই একদিন সৃষ্টি হয়েছিল লিপি আর লিখনসামগ্রীর। সেকালে মানুষ গাছের পাতা, ছাল ইত্যাদির ওপর কষ্ট করে তৈরি করা কালি দিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিল। জন গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বসভ্যতায় এক নতুন যুগের সূচনা হলো। ছাপা বই সবার কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠল। যখন থেকে মুদ্রণ প্রযুক্তি নতুন মাত্রা লাভ করতে শুরু করল, সে সময় থেকেই বিশ্বে বইয়ের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করে।

 


৪.
অনেক মানুষের কাছে বই এখনও ‘প্রেশাস লাইফ-ব্লাড’, কারো কারো কাছে বই এখনও ‘ফ্রেন্ড ফর এভার’। যদিও অনেকেরই প্রশ্ন, সত্যিই কি তাই? টিভি-ইন্টারনেটের এই যুগে বইয়ে বিনোদন খোঁজা মানুষের সংখ্যা হাতে গুনে বলার মতোই। মোট জনসংখ্যার বিচারে তা নগণ্য। এখনকার ছাত্র-ছাত্রীরা অধিকাংশই স্কুল বা কলেজপাঠ্য-র বাইরে অন্য বই তো পড়েই না, এমনকী অনেকে পাঠ্য গল্প বা উপন্যাসের টেক্সট না পড়ে সারাংশ পড়ে কাজ চালায়। বই কিছুটা পড়ে ছোটরা। আর যাঁরা লেখালেখি বা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা খানিকটা বই পড়েন। ছোটদের পড়ার ক্ষেত্রটি সঙ্গত কারণেই সীমাবদ্ধ। ওদিকে লেখালেখি বা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনেরা আবার নিজেদের কাছের অথবা প্রয়োজনের লেখকগোষ্ঠীর লেখা ছাড়া কদাচিত্‌-ই অন্যত্র বিচরণ করেন। আর তাই বইয়ের নেশা সকলের মাঝখানে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু সেখানে ক্রমশই বিষয়টা গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরিকে যথাযথ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের প্রচণ্ড অনীহা। স্বীকার করতে কোন সংশয় নেই- বইমুখী শিক্ষকের সংখ্যাও এখন তলানিতে ঠেকেছে। ফলে আলোকিত আলাপনের বসন্ত বাতাস মেলে না কোথাও একটুকুও। কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিনিয়ত খেয়াল করি বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে শিক্ষকেরাও এখন লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ছেন না। তবে তারা যে গভীর জ্ঞানমূলক লেখাপড়া বা মননশীল চিন্তাচর্চা খুব বেশি করছেন বলেও মনে করার মতো যথেষ্ট উদাহরণ খুঁজে পাই না বলে মনে কষ্টের মেঘ কেবলই জমে।

 

৫.
বই পড়ার প্রতি যাদের অসীম ভালোবাসা কেবল তারাই বোঝেন বইয়ের মর্ম। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, পাতায় পাতায় যেন ছাপার অক্ষরে ফুটে ওঠে স্বপ্ন। আমরা যারা বিখ্যাত লেখকদের ভাবতাম ভিনগ্রহের মানুষ। সেই তাঁদের সম্পর্কে জানার ইচ্ছে বা উৎসাহ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। ছাপার অক্ষরে যাঁদের নাম লেখক হিসেবে বের হত তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া অনেকের কাছেই ছিল নেশার মতো। যত দিন যাচ্ছে লেখকদের সম্পর্কে সেই আগ্রহের ভাবটা ফিকে হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রশ্ন জাগতেই পারে মনে, বই কী তার চিরাচরিত কৌলীন্য হারিয়েছে? বইপাঠের প্রতি আগের দিনের সেই একাগ্রতা, উৎসাহ কমে যাওয়ার জন্য শিল্প-সাহিত্যিকসহ অনেকেই কার্যত বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে দায়ী করেছেন। অনেকেরই বক্তব্য, “এখন অধিকাংশ গ্রন্থই ইন্টারনেটের মাধমে পড়ে নিচ্ছেন পাঠকেরা। সেই তথ্য আমরা জানতে পারছি না। ” তবে অনেকে আবার এ কথা স্বীকার করেও বলছেন, “ইন্টারনেটের যুগে অনেক সংখ্যক পাঠক গ্রন্থাগার মুখী হচ্ছেন না অথবা বই কিনছেন না বটে, তবে এখন কিছু পাঠক আছেন যাঁরা মুদ্রিত বই পড়তে চান। তার মজাটাই আলাদা। ” অনেকের বাড়িতে বিভিন্ন বইয়ের একটি গ্রন্থাগার রয়েছে।  

 


৬.
কবিতা, কথাসাহিত্য, নাট্যসাহিত্যের প্রতি যে টান অনুভব করত এক প্রজন্ম পূর্বের তারুণ্য ও যুব সমাজ, সেখানে আজ যায়গা করে নিয়েছে কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো সোস্যাল মিডিয়া। এই প্রজন্মের তারুণ্যের কাছে বইয়ের চেয়ে মোবাইল মনিটরই হয়ে উঠেছে সর্বাধিক জনপ্রিয়। সঙ্গে আছে বিদেশী অসংখ্য টিভি চ্যানেল। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে গত তিনদশক আগেও যে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গড়ে তোলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যেত এখন সেখানে ঠাঁই পেয়েছে কম্পিউটার আইটেম, প্যাডসহ প্রযুক্তির উৎকর্ষের সর্বশেষ সংযোজন। সময়ের প্রয়োজনেই আজ সবার কাছেই হাইটেক সিস্টেমের গ্রহণযোগ্যতা অপরিসীম। কিন্তু এর প্রেক্ষিতে কী আমাদের মনটা ক্রমশই বড্ড বেশি অনুভূতিহীন আর যান্ত্রিক হয়ে উঠছে না ?

 


৭.
সবুজ প্রকৃতি, নদী, নৌকো, জোনাকী পোকার স্বর্ণালী ছোঁয়া, জ্যোস্না ভেজা কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রির মায়াবী জাদুকরী দৃশ্যের বর্ণনা, নিসর্গের গভীর ব্যাঞ্জনা কবিতা-উপন্যাসে যেভাবে স্বমহিমায় ফুটে ওঠে, তা-কি প্রযুক্তির নীল মনিটরে জীবন্তরূপে পাওয়া যাবে ? বাংলার অপরূপ সবুজ গ্রামের মেঠো পথ, খোলা প্রান্তÍর, বিল, মাঠ, দেবদারু, শিরিষ, বট, সেগুন, হিজলের সুবিশাল ছায়া আর বুনো ফুলের ছবিটা যে উপন্যাস, গল্প, কবিতার ক্যান্ভাসে লেখকরা সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন- এই প্রজন্ম দিন-দিন সেসব বর্ণিল আনন্দঘন ক্যান্ভাস থেকে দূরে, বহুদূরে অবস্থান করছে। শুধুমাত্র একুশের বইমেলাতেই নগর কেন্দ্রিক পাঠকের দেখা মেলে বছরে একবার ফেব্রুয়ারিতে। এরপর তারুণ্য ফিরে যায় সেই ছোট্ট পরিসরের ফাইবারের স্ক্রিনে। আর অবসরে টিভি চ্যানেলে। বই সেখানে অনুপস্থিত। একটি জাতির জন্য বই পড়ার অভ্যেস এক মৌলিক বিষয়। কোন কোন পাঠক অনলাইনে, ইন্টারনেটে কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়েন না-তা-নয়। কিন্তু ছাপার অক্ষরে একটা বই বুকের ওপর ফেলে কিংবা কোলের ওপর রেখে পড়ার মজাটাই যে আলাদা- সে কথা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সেটা বোঝেন তারা-যারা তাদের ছাত্রজীবনে অভিভাকের চোখ ফাঁকি দিয়ে-গভীর রাত পর্যন্ত চুপি চুপি শরৎচন্দ্রের দেবদাস, গৃহদাহ, চরিত্রহীন পড়তে পড়তে বেদনায় নিমজ্জিত হয়েছেন। পকেটে দশটা টাকা হলেই একটা প্রিয় বই কেনার আকাংখা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনার ধারা আজ একেবারেই বিলুপ্ত।  

 


৮.
একসময় শহর-গ্রামে-গঞ্জের বইয়ের দোকানের চেয়ে এখন সেলফোন, সিম, মোবাইল অপারেটর, বিকাশ কেন্দ্র, ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানের সংখ্যাই বেশি। জ্ঞান আহরণের যায়গাগুলো এত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দিনে দিনে। যা নিয়ে অভিভাবকরাও আজ শঙ্কিত। একসময় রেলস্টেশন, টার্মিনালে একাধিক বুকস্টলের ছবির কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। সে সব বুকস্টলের ধারে কাছেও আজকাল কেউ ঘেঁষে না। দূরপাল্লার জার্নিতে অবসরের সঙ্গী যেখানে ছিল বই, সেখানে এখন মোবাইলের অবস্থান সহস্রগুণ বেশি। বই পড়াটা ক্রমাগত স্মৃতির অনুষঙ্গ হয়ে পড়ছে। হয়ে পড়ছে স্মৃতি রোমন্থনের বিবর্ণ অধ্যায়। তবে নিয়মিত পাঠাভ্যাস যাদের, তাদের প্রতি লেনিনের পরামর্শ, "হাতে যে বইগুলো আছে তা এমনভাবে অদল-বদল করে পড়বে যাতে বৈচিত্র্য ফোটে। পড়াশুনো বা কাজের অদল-বদলে- যেমন, অনুবাদের পর পড়া, চিঠি লেখার পর শরীর চর্চা, গুরুতর গ্রন্থ অধ্যয়নের পর রম্যরচনায় অসাধারণ সাহায্য হয়। "

 


৯.
আমরা সবাই জানি, জ্ঞানই শক্তি। এই শক্তি শারীরিক শক্তি নয়, এটা মানসিক শক্তি। মানসিক শক্তি অর্জন করতে চাইলে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,ইদানীংকালে আমাদের অনেকের মধ্যেই বই পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। নাগরিক ব্যস্ততার কারণে অনেকের পক্ষেই বই পড়ার জন্য সময় বের করা হয়তো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কারণে খুব সহজেই বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের খবর বা নানা ঘটনা তাত্ক্ষণিকভাবে অবহিত হওয়া যায়। ছাত্রছাত্রীরা এখন তাদের মূল পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই তেমন একটা পাঠ করতে চায় না। টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের কারণে তারা খুব সহজেই তাদের কাঙ্ক্ষিত বিনোদন লাভ করছে। ফলে তারা কষ্ট করে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই মনে করেন,আগামীতে হয়তো এমন দিনও আসতে পারে যখন কোনো মুদ্রিত বই থাকবে না। কিন্তু তাদের এই ধারণা মোটেও সঠিক নয়। কারণ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বা ইন্টারনেট কখনোই মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। তাই বলা যেতে পারে,আগামীতেও গুণগত মান সম্পন্ন বই স্বমহিমায় অবস্থান করবে।

 


১০.
আমরা জানি, পাঠের মধ্য দিয়ে সাহিত্যকে উপলব্ধি করার একটা ক্ষমতা জন্মায়। বই যে আসলে কী জিনিস, তা পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। বইয়ের ভেতর দিয়ে অনায়াসে ঘুরে আসা যায় হাজার হাজার মাইল। পড়ে আসা যায় মানুষের মনের ভেতর পর্যন্ত। হাজারো বিস্ময় আর সৌন্দর্য-অনুভূতি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে বই। আর এমন অকৃত্রিম বন্ধুকে বিপুল আয়োজনে বইমেলাতেই তো পাওয়া যায়। নানা রঙের নানা রকম বই নিয়ে শুরু হয় রহস্য আর আনন্দে ঘেরা বই বই দিন। শুধু তা-ই নয়, যত দিন যাচ্ছে, বইমেলা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ছে আমাদের জন্য। কম্পিউটার প্রযুক্তির এই দিনে সবাই ধীরে ধীরে যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠছে। যন্ত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি মানুষকে সহায়তাও করছে বিস্ময়করভাবে। তবু বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বইয়ের মাধ্যমে আমরা যেভাবে ভাষাশৈলীর হাত ধরে মানুষ চিনছি, মানুষের মন চিনছি, প্রকৃতি চিনছি, ভাষাকে চিনছি- এমন করে চিনে নেওয়ার স্বাদ পাওয়া যাবে না অন্য কোনো কিছুতে। শুধু জ্ঞান আহরণই নয়, কী দারুণভাবে বই আমাদের সময় ও স্মৃতিকে ধরে রাখার সুযোগ করে দেয়! আমার মনে হয়, অন্য কিছুই মনের ভেতরে এমনভাবে দাগ কাটতে পারে না, বই যেভাবে পারে। আমাদের তাই নিয়ম করেই বই পড়া উচিত। সে নিয়মে খানিকটা শক্তি জোগাতে বইমেলার ভূমিকাও অনেক।

 


১১.
রসিক সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। বই পড়লে মনের দেউলিয়াত্ব ঘোচে। জীবন জগৎ সম্পর্কে জানা-শোনা বাড়ে। রবীন্দ্রনাথ লাইব্রেরিকে সভ্যতার সেতু হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বই যেমন জীবনের পরিধি বাড়ায়, তেমনি স্বপ্ন দেখতে শেখায়। আর তাই এই ইন্টারনেট এবং ই-মেইলের যুগেও বইয়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। অন্তত আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বইয়ের প্রচার, প্রসার বেড়েছে। বাড়ছে পাঠকের সংখ্যাও। আগে শহরে পাড়ায় পাড়ায় যেমন পাঠাগার ছিল, এখন আর সেটি চোখে পড়ে না। তবে মানুষ নিজের আগ্রহেই পছন্দের বইটি খুঁজে নেয়। আগে স্কুল-কলেজে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পাঠচক্রের আয়োজন করা হতো। প্রতিটি স্কুল ও কলেজে লাইব্রেরি ছিল; যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বই বাসায় নিয়ে যেতে পারত। এখন অনেক স্কুলেই লাইব্রেরি নেই। তা ছাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাথায় পাঠ্যবইয়ের বোঝা এত ভারী যে তারা এর বাইরে কিছু পড়ার কথা ভাবতেই পারে না। আর তাই দরকার শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর থেকে পরীক্ষাসহ নানা রকম অসুস্থ প্রতিযোগিতার বোঝা নামানো। তা না হলে বইমেলার আয়োজন করেও শিক্ষার্থীদের বা আগামী প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করা সম্ভব হবে না। একজন শিক্ষক হিসেবে দেখি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়ছে না প্রত্যাশানুযায়ী। আর এই দায় আমাদের সবার। শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, সমাজ, রাষ্ট্র-সবাইকেই এই দায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। তাহলেই প্রকৃত মানুষের বিকাশ ঘটবে, মানব সম্পদ সৃষ্টি হবে, দেশ মানুষ সমৃদ্ধ পাবে।  

 


১২.
প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানে বড় জাতিই হচ্ছে আসল বড় জাতি। তাই দেশ-জাতির কথা চিন্তা করে প্রয়োজন সুশিক্ষায় মনোনিবেশ করা। জ্ঞান অর্জন করে দেশের হয়ে কাজ করা। প্রমথ চৌধুরী একবার এক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বই পড়াটাকে আমি শখ মনে করি না, এটা একটা প্রয়োজন’ কথাটা আসলেই সত্যি। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে যখন জীবন ধারণ করাই সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়, সেখানে শখ আহ্লাদের বিষয়টাকে অনেকেই রসিকতা মনে করবেন। কারও কাছে তা নির্মমও ঠেকবে। কিন্তু বই পড়া যে প্রয়োজন তা কে না জানে! বই পড়ে সুশিক্ষিত হওয়ার যেমন নেই কোন বিকল্প তেমনি আবার বই আমাদের দু:সময়ের সবচেয়ে বড় বন্ধু। বই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা, হতাশা- সবসময়ের সঙ্গী বই। বই পড়লে অনেক হতাশা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। অনেকে বই পড়ার পাশাপাশি এই সংগ্রহ করতেও ভালোবাসেন। অল্প করে সংগ্রহ করতে করতে আপনার ঘরেও গড়ে উঠতে পারে বিশাল বইয়ের সংগ্রহশালা। এ সংগ্রহশালাকে একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখলে যেমন দেখতে ভালো লাগবে, তেমনি স্থায়িত্ব হবে অনেক দিনের। আপনার কাছে পুরনো হোক আর নতুন হোক সব বই মূল্যবান। তাই বইয়ের জন্য আলাদা যত্ন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।  

 


১৩.

জীবনে যতই দুঃখ, হতাশা, বিপদ এসে পড়ুক না কেন; মানুষ বই থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপদেশের মাধ্যমে এসব সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে পারে, জীবনকে সার্থকভাবে গড়ে তুলতে পারে। বেন জনসন বলেছিলেন- বইয়ের সাথে প্রথমে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলবেন; তারপর জ্ঞান অন্বেষণের জন্য মনকে অনুপ্রাণিত, সুসমৃদ্ধ, সুসংহত করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন করা উচিত। ভালো কথা বলা, সুস্থচিন্তা চর্চা করার জন্যই আমাদের প্রত্যেকের গভীর অধ্যয়ন প্রয়োজন। অবশ্য অনেকে শ্রেণিকক্ষের বইয়ের মধ্যেই অধ্যয়নকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। কিন্তু বইয়ের বিশাল জগতের মধ্যে এ সাময়িক অধ্যয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। বইয়ের প্রকৃত রস আস্বাদন করতে হলে ধর্মগ্রন্থ, জীবনী, কথাসাহিত্য, তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ, কাব্য, প্রভৃতি পড়ার প্রয়োজন রয়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে নবপ্রজন্মের মধ্যে বইপড়ার সদভ্যাস দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে এ প্রজন্মের বেশির ভাগই আজ জীবনকে প্রকৃতভাবে অনুধাবন করতে, সঠিকভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর ফলে তারা দুঃখ, হতাশা ও মানসিক অশান্তির শিকার হচ্ছে। এতে আমাদের সমাজে দিন দিন উচ্ছৃঙ্খলতা বেড়েই চলেছে।

 

 

১৪.
ভোগবাদী মানসিকতার শিকার হওয়া নতুন প্রজন্ম বইয়ের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে না। জীবনকে শুধু সুখ ও উপভোগের বস্তু বলে ভেবে নিয়ে অসংখ্য তরুণ-তরুণী মূল্যবান সময় নষ্ট করছে টিভি চ্যানেলের সস্তা ও মনোরঞ্জনমূলক ছবি দেখে, অর্থহীন আড্ডায়, মোবাইল ফোন, যৌনতাসর্বস্ব প্রেম, ইত্যাদির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে। বইপড়ার কথা বললে তাদের উত্তর পাওয়া যায়- ‘সময় নেই’। বই কেনার জন্যও তাদের নাকি টাকার অভাব। বছরে একটা বই কেনার প্রয়োজন অনুভব করে না অনেক তরুণ-তরুণী। কিন্তু সস্তা মনোরঞ্জনের জন্য টাকা খরচ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কিছুসংখ্যক গভীর অধ্যয়নশীল তরুণ-তরুণী যে নেই, এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু তাদের সংখ্যা নগণ্য। অধ্যয়নবিমুখ কিংবা পাঠ্যক্রমের বই পড়ে (অনেক ক্ষেত্রে নোটবই) যন্ত্রমানবে পরিণত তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা যে আজ বাড়তির দিকে। জ্ঞানচর্চাবিমুখ এ নবপ্রজন্ম কেমন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে, সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তাই নবপ্রজন্মের সুস্থ জীবন, তথা সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে বই পড়ার ক্ষেত্রে ‘বিপ্লব’ গড়ে তুলতে হবে। নতুবা তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। যেসব তরুণ-তরুণী অধ্যয়নের মানসিকতা বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় বইমেলা, গ্রন্থাগার, বইপড়ার ক্লাব, সাহিত্যানুষ্ঠান, কর্মশালা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের উদ্যোগ আবশ্যক।

 


১৫.
ইউনেস্কোর অধিবেশনে আন্তর্জাতিক গ্রন্থ দিবসের তারিখ নির্ধারণ উপলক্ষে যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় তাতে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে বলা হয়েছিলো :
i. historically books have been the most powerful factor in the dissemination of knowledge and the most effective means of preserving it.
ii. all moves to promote their dissemination will serve not only greatly to enlighten all those who have access to them, but also to develop fuller collective awareness of cultural traditions throughout the world and to inspire behaviour based on understanding, tolerance and dialogue,
iii. One of the potentially most effective ways to promote and to disseminate books as shown by the experience of several UNESCO Member states is the establishment of a ‘Book Day’ and the organization of events such as book fairs and exhibitions on the same day. ইউনেস্কোর প্রস্তাবের এই তিনটি অংশের বিষয় অনুধাবনের চেষ্টা করলে আমাদের বুঝতে মোটেই কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, গ্রন্থদিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞানের সর্বজনীনতার মাধ্যম হিসেবে বইয়ের ভূমিকাকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলা। বিশ শতকের শেষ দশকের মধ্যভাগে এসে জাতিসংঘের এই সংগঠনটির এমন উদ্যোগ গ্রহণের পেছনে এমন আশঙ্কাও হয়তো কাজ করতে পারে যে, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী তার উত্তরোত্তর অধিক ব্যবহারের ফলে মানবসমাজে বইয়ের প্রয়োজন ও ব্যবহার দুই-ই ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে। আর শুধু হ্রাস পাওয়া নয়, একসময় হয়তো তা ফুরিয়েও যাবে।

 


১৬. 
আন্তর্জাতিক গ্রন্থদিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিষয়ে বা বই দিবস নিয়ে ভাবনায় লেখক সুব্রত বড়ুয়া বলছেন, ‘আমাদের কিশেষভাবে মনে রাখা উচিত হবে ইউনেস্কোর প্রস্তাবে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে dissemination of knowledge কথাটির উপর। আর এই dissemination of knowledge কিন্তু কিছুতেই শুধু তথ্যের আদান-প্রদান কিংবা তথ্য সংরক্ষণ নয়, যা ইদানীং আমরা অনেক ক্ষেত্রে ‘জ্ঞান’ কথাটি বুঝাতে বা বুঝতে ব্যবহার করার দিকে ঝুঁকছি বলেই জ্ঞানের পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণের জন্য প্রলুব্ধ হচ্ছি। তথ্য মূলত জ্ঞানেরই একটি অংশ মাত্র, সম্পূর্ণ জ্ঞান নয়। সে জন্যই ইউনেস্কোর প্রস্তাবের উদ্ধৃত দ্বিতীয় অংশে ’to develop fueller collective awareness of cultural traditions throughout the world and to inspire behaviour based on understanding, tolerance and dialogue’ কথাগুলি এসেছে। কেন এসেছে? না, understanding, tolerance ও Dialogue-এর ভিত্তিতে যেন আমাদের আচরণ পরিচালিত হয়; অন্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও অনবধানতার ভিত্তিতে যেন না হয়। অর্থাৎ বই যেমন আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জীবনধারণের প্রক্রিয়াকে সাহায্য করবে, তেমনি জীবনবোধকে পরিশীলিত করার মাধ্যমে জীবনচর্চাকে মহৎ করবে। বলা হয়েছে collective awareness-এর কথাও। অর্থাৎ কেবল একক ব্যক্তিসত্তা নয়, সামাজিক ও সামূহিক সত্তার মধ্যেও সচেতনতা জাগিয়ে তুলবে বই। কেন? কারণ, তা না হলে– একক মানুষের ভূমিকা একটি ক্ষুদ্র পরিসরেই শুধু সীমিত থাকবে, বিশ্বজনীন মানবসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সামাজিকভাবে মহৎ সংস্কৃতি ও জীবনচর্চার সুযোগ পাবে না। সে জন্যই উদ্ধৃত অংশের তৃতীয় ভাগে ’Book day’ উদযাপন উপলক্ষে গ্রন্থের প্রদর্শনী ও বইমেলার মতো অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বই সম্পর্কে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হবে, বইয়ের কথা তাকে জানাতে হবে, বইয়ের জগতে যে অশেষ আনন্দ ও সৌন্দর্য আছে সে তথ্য তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ’

 


১৭.
পর্দার সর্বব্যাপী জয়জয়কারের সময়টাতে ভালো বইয়ের মাঝে ডুবে থাকার কথা আমরা ভুলে যেতে বসেছি। সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০১৩) হাফিংটন পোস্ট ১০০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান নাগরিকের ওপর জরিপ করে। এতে দেখা গেছে, শতকরা ২৮ ভাগ অংশগ্রহণকারী বিগত এক বছরে একটি বইও পড়েননি। কিন্তু সত্য কথা হলো- বই পড়া অন্যান্য বিনোদনের চেয়েও বেশি মজার। কয়েকদিন আগে এক গবেষণা দেখিয়েছে, সাহিত্য পাঠ মনকে পড়া বা অধ্যয়ন করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই কেন আপনি বই পড়তে বাধ্য তার কয়েকটি বিজ্ঞানসম্মত কারণ তুলে ধরা হলো;

 


১৭.১ বই মানুষকে শীতল করে: খুব দুশ্চিন্তায় আছেন? একটা বই হাতে নিন। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখানো হয়, বই পড়া হচ্ছে চাপ মোকাবেলার সর্বোত্তম পন্থা। চাপ ঠেকানোর অন্যান্য পন্থা যেমন: গান শোনা, এককাপ চা কিংবা কফি পান অথবা একটু হেঁটে আসার চেয়েও কার্যকরি হলো বই পড়া। টেলিগ্রাফ সাময়িকীতে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই গবেষণায় দেখা যায়, কোনো অংশগ্রহণকারী বইয়ের পাতা উল্টানো শুরুর ছয় মিনিটের মধ্যেই তার উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যায় বা তিনি শীতল হয়ে যান। ওই গবেষণার গবেষক ড. ডেভিড লুইস টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এটা যেকোনো বই-ই হতে পারে, আপনি আপনার প্রাত্যহিক চাপ থেকে বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতে পারেন, লেখকের কল্পনার জগতকে আবিষ্কার করতে পারেন। ’

 


১৭.২ মস্তিষ্ককে সচল ও ধারাল রাখে : এ বছরের শুরুতে ‘নিউরোলজি’ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ওখানে বলা হয়, দীর্ঘ সময়ের বই পড়ার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধ বয়সে মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে। ওই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল ২৯৪ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মৃত্যুকালে যাদের গড় বয়স ছিল ৮৯। দেখা যায়, তাদের মধ্যে যারা অনেক বছর ধরে বই পড়া ধরে রেখেছিলেন, তাদের স্মৃতিশক্তি হারানোর হারটা অন্যদের চেয়ে কম যারা বই কম পড়েছেন। ‘আমাদের গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি যে, শৈশব থেকে মস্তিষ্কের ব্যায়াম বুড়ো বয়সের মস্তিষ্কের সবলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। ’ এ গবেষণার লেখক রবার্ট এস উইলসন এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন। তিনি শিকাগোতে অবস্থিত রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারে পিএইচডি করছেন। তিনি আরো বলেন, ‘এ গবেষণা থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে লেখা-পড়ার গুরুত্বকে অবজ্ঞা করতে পারি না। ’

 


১৭.৩ আলজেইমার রোগ প্রতিরোধে বই : একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে ২০০১ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়, যেসব বয়স্ক লোকেরা মস্তিষ্কের ব্যায়ামের সঙ্গে যুক্ত সৌখিন কাজ যেমন: বই পড়া ও ধাঁ ধাঁ সমাধান করে থাকেন তাদের আলজেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইউএসএ টুডে- কে এক সাক্ষাৎকারে লেখক ড. রবার্ট পি. ফ্রিডল্যান্ড বলেন, ‘ব্যবহারের ওপর যেমন অন্যান্য অঙ্গের বুড়ো হওয়া নির্ভর করে মস্তিষ্কের বেলাও এ কথাটি প্রযোজ্য। শারীরিক কর্মকাণ্ড যেমন আমাদের হৃৎপিণ্ড, মাংসপেশি ও হাড়কে শক্তিশালী করে। বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডও আমাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে এবং মস্তিষ্কের রোগ ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। ’

 


১৭.৪ ভালো ঘুমে সহায়ক : ঘুমানোর আগে মন থেকে চাপ দূর করে ফেলা ও মনকে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখার সুপারিশ করে থাকেন ঘুম বিশেষজ্ঞরা। ল্যাপটপ বা উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে থেকে টেবিল ল্যাম্প বা বিছানার পাশের বাতিতে একটা বই হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলে ঘুম এসে যাবে অল্পতেই। তবে বইটি যেন রহস্য উপন্যাস বা ক্রাইম ফিকশন না হয়!
১৭.৫ সহানুভূতিশীল করে তোলে : গত জানুয়ারি প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, একটা ভালো উপন্যাসে হারিয়ে যাওয়া আপনার সহানুভূতিশীলতাকে বাড়িয়ে দিবে। নেদারল্যান্ডে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখানো হয়, যেসব পাঠক কোনো উপন্যাসের কাহিনী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন তাদের সহানুভূতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। এ গবেষণায় দুজন লেখকের লেখা ব্যবহার করা হয়- আর্থার কোনান ডয়েল ও হোসে সারামাগো। এক সপ্তাহ এ দুজনের বইয়ের মাঝে ডুবে থাকার পর পাঠকদের সহানুভূতিশীলতার পার্থক্যটা পরিষ্কার হয় গবেষকদের কাছে।

 


১৭.৬ আত্মনির্ভরশীল এবং বিষন্নতা দূরে : সবাইকে জীবনের কোনো না কোনো সময় বিষন্নতা আক্রমণ করে। কেউ এটা থেকে দাঁড়াতে পারে আবার অধঃপতিত হয়ও অনেকে। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কিছু বই আছে যেগুলো আপনাকে এক্ষেত্রে সাহায্য করবে। বিষন্নতা আপনার কাজ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। এটা কাটিয়ে উঠার ক্ষেত্রে ডাক্তারি চিকিৎসার চেয়েও বই পড়া অনেক কার্যকরি মহৌষধ। বিশ্বাস হচ্ছে না? পরীক্ষা করে দেখুন না!

 


১৮.
এতগুণ যে বইয়ের, তাহলে কেন আর অপেক্ষা ? হাতে নিন একটা বই। হারিয়ে যান সেখানে, বইয়ের ভেতরে বা কোনো চরিত্রের সঙ্গে! এসব কারণেই আপনি অবশ্যই বই পড়তে বাধ্য। নিজের কাছেই খোলা মনে একটিবার প্রশ্ন করুন- নন কী ? বিশ্ব বই- দিবস উন্নত দেশগুলোতে দিবসটি পালিত হয় বইকে জীবনের সঙ্গে জড়িত করার জন্য, জীবনে চলার পথে সঙ্গী করার জন্য। বিশ্বব্যাপী এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো- বই পাঠের অভ্যাসকে বাড়ানোর জন্য জন সচেতনতা তৈরী ও বইয়ের প্রসার ঘটানো; বই পাঠের অভ্যাসকে বাড়ানোর জন্য জন সচেতনতা তৈরী ও বইয়ের প্রসার ঘটানো, সব বয়সের মানুষের মধ্যে পাঠের অভ্যাস বাড়ানো, বই প্রকাশ এবং বইয়ের কপিরাইট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। সবশেষে বিশ্ব বই দিবসের চেতনা সকলের মাঝে সম্প্রসারিত হোক, মনে দাগ কাটুক সেই প্রত্যাশাই করি নিরন্তর। বই প্রেমিকদের জয় হোক।

 

 

(তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, দেশ, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা )


Top