স্বাধীন বাংলাদেশ | daily-sun.com

স্বাধীন বাংলাদেশ

কাজী জহিরুল ইসলাম     ২১ এপ্রিল, ২০১৮ ১৫:৫১ টাprinter

স্বাধীন বাংলাদেশ

রাগীব আহসান আর্ট কলেজে পড়েননি, ছবি আঁকায় তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, এই যে নেই, এটা যখন তাঁর মুখ থেকে শুনি তখন মনে হয়, এই ‘নেই’ আছের চেয়ে অনেক বেশি দ্যুতিময়।  এটি আরো বেশি দ্যুতিময় হয়ে ওঠে যখন তাঁর তুলি থেকে বেরিয়ে আসা ছবিগুলোতে চোখ রাখি।

তাঁর মধ্যে আমি সব সময় একটা অস্থিরতা দেখি, এই অস্থিরতা আমার মধ্যেও আছে। আমার মনে হয় এটিই সৃজনতাড়ণা।

 

একদিন রাগীব ভাই আমাকে ফোন করে বলেন, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কি সিদ্ধান্ত?

দেশ থেকে ফিরে এসে নিয়মিত ছবি আঁকবো।

তখন ফেব্রুয়ারী মাস। বইমেলা শুরু হয়েছে। এ বছর রাগীব আহসান ৫০টির ওপরে বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। সেগুলো মেলায় ঘুরে ঘুরে দেখবেন, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবেন, সম্মানীর টাকা নেবেন, ঢাকায় তো তাঁকে যেতে হবেই।

 

আমি বলি, দারুণ খবর, একজন শিল্পী নিয়মিত ছবি আঁকবেন এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কি আছে!

আমি ছবি আঁকবো কবিতার থিমের ওপর, এবং তা শুধু আপনার কবিতার।

আমি বলি, ওয়েট। আমার কবিতা? আমি কি ঠিক শুনেছি?

হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন, শুধু আপনার কবিতা।

 

এরপর আমার আর ঘুম আসে না। কোন কবিতা থেকে কি রকম ছবি হবে এসব ভাবতে ভাবতে আমি খুশিতে আত্মহারা। নানান সময়ে এমন অনেক যুগলবন্দী কাজের পরিকল্পণা করেছি কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। কিন্তু আমার মন বলছে, এবার হবে। কারণ আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল আছে। আমরা দুজনই অস্থির, দুজনই প্রচুর কাজ করতে চাই, দুজনই পরিশ্রমী এবং দুজনই খুব সহজে আনন্দিত হই।

 

তিনি দেশে যাওয়ার আগে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলেন, তাও আবার ছবি আঁকার হাত, মানে ডান হাত, আমি ভাবি, প্রথম বাঁধা। সেই বাঁধাকে জয় করে তিনি দেশ থেকে ফিরে আসেন মার্চের ৯ তারিখে। এসেই বলেন,

এবার কাজে নেমে পড়তে চাই। কবিতা নির্বাচন করেন।

আমি বলি, কবিতা বাছাইয়ের কাজটা আপনি করেন, আমি কিছুটা নার্ভাস।

আপনি আমাকে ৪০টা কবিতা বাছাই করে দেন। এরপর বাকি বাছাই আমি করবো।

 

আমার স্ত্রী মুক্তির সাহায্য নিয়ে ৪০টি কবিতা বাছাই করি। বাছাই করতে গিয়ে অনেক কিছু ভেবেছি, শুধু কি নির্দিষ্ট একটি থিমের ওপর রাখবো? সেই চেষ্টা করলাম। কিন্তু বাছতে গিয়ে দেখি, এটা পছন্দ হয়, ওটা পছন্দ হয়। নাহ, থিম থেকে বেরিয়ে আসি। কবিতাসমগ্র-১ এবং কবিতাসমগ্র-২, এই দুটি বইয়ের কবিতাগুলো থেকেই কবিতা বাছাই করলাম।

 

৩১ মার্চ ২০১৮, শনিবার, সকাল দশটায় আমরা ছুটছি ব্রুকলিনে, ব্লিক-এর উদ্দেশে। ক্যানভাস এবং রঙ কিনবো। ব্লিক এর সামনে দুটি ছেলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে। ওদের মাথার ওপর নীল আকাশ, কালো মেঘের ঘূর্ণাবর্ত। সমকামিতার এমন খোলামেলা দৃশ্য এর আগে এই শহরে দেখিনি। শ্বেতবর্ণের এক তরুণী, কিছুটা মোটাসোটা, আমাদের সাহায্য করতে ছুটে এলো। ক্যানভাস, রঙ, তুলি খুঁজে পেতে সাহায্য করল।  হঠাৎ আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, তুমিও কি শিল্পী?

 

মেয়েটি কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর নীল চোখের ওপর নদীর ঢেউয়ের মতো একজোড়া কালো ভ্রূ।

আমি বলি, না, না, আমি ছবি আঁকি না। ছবি আঁকেন আমার বন্ধু, রাগীব আহসান, আমি লিখি। বলেই আমি রাগীব ভাইকে দেখিয়ে দিই।

 

মেয়েটি বলে, কি লিখো?

কবিতা।

সে উত্তেজনায় দু’হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, আমি সৌজন্যতা রক্ষা করি, ওর ডান হাতটা ধরি, করমর্দন করি।   তখনি লক্ষ করি ওর চুলে হিপ্পিদের মতো বিনুনি। খাটো জামার নিচে ফর্শা তলপেট, সেখানে বুনো জন্তু, উল্কি আঁকা। মেয়েটির খাড়া নাকের বাঁ দিক কামড়ে বসে আছে একটি রুপোর রিঙ, যেন ওর ফর্শা মুখে আরো খানিকটা আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

 

তুমি তো আরো বড় শিল্পী, শব্দের ছবি আঁকো। হ্যাঁ, আমি জেনিফার, শিল্পী, আমি কাজ করি ফেব্রিক্সে।

ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমরা রঙ, তুলি, ক্যানভাস গুছিয়ে কাউন্টারের দিকে হাঁটতে শুরু করি।

ব্লিকে নানান রঙের আকর্ষণীয় কাপড় এবং কাগজ দেখে রাগীব ভাই খুব প্রলুব্ধ হন।

 

ফেব্রিক্স অ্যান্ড পেপার দিয়ে কিছু কাজ করবো। এবার পহেলা বৈশাখে ভাবীর জন্য একটি সুতির শাড়িতে রঙ করবো। একসময় ফেব্রিক্সে কাজ করতাম, খুব মজা পেতাম। আবার করতে ইচ্ছে করছে। করবো, এই নববর্ষেই করবো, দেখি কি দাঁড়ায়।

বলেই তিনি মাথা দোলান। তখন তাঁর কাশফুলের মতো শুভ্র চুল দোল খায়। আমার মনে হয় এই শাদা চুলের এক গাছি উড়ে গেল আকাশে, শাদা মেঘ হয়ে ঝুলে রইল। এই আকাশ, এই মেঘ, এই রাগীব আহসান, এই কাজী জহিরুল ইসলাম, দুজন সমকামী যুবক, কাম, প্রেম, ব্লিক, ব্রুকলিন, জেনিফার, সব একটি বৃহৎ ক্যানভাসে আটকে আছে। আমার হাতে তুলি, প্যালেটে স্বপ্নের রঙ, ইচ্ছেমত আমি এই দৃশ্যগুলো বদলে দিতে পারি।   ধ্যাৎ, কী সব ভাবছি।

 

আমরা বাইরে বেরিয়ে আসি। হু হু করে ঠান্ডা বাতাস এসে বিশাল আকারের ক্যানভাসগুলোসহ আমাদের উড়িয়ে নিতে চায়।  কোনো রকমে সামলে নিয়ে দেয়ালের সাথে ঠেশ দিয়ে দাঁড়াই।  সমকামী যুবকেরা এখনো আছে, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। রাগীব ভাই একটি সিগারেট ধরান। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন।  মগ্ন হয়ে তিনি কি ভাবছেন, দুই সমকামী যুবকের কথা? এখন কি তাঁর হাতে মোটা একটি ব্রাশ, শাদা রঙ ছড়িয়ে মুছে দিচ্ছেন কিছু? তারপর আঁকছেন নতুন দৃশ্য?

 

আমি পার্কিং লট থেকে গাড়ি আনতে ছুটে যাই।

গাড়িতে উঠেই তিনি বলেন, কবিতার কথা বলেন।

আমি বলি, একটি ছোট্ট কবিতা লিখেছিলাম একজন যুদ্ধশিশুকে নিয়ে। এটি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

 

মনে আছে?

কিছুটা আছে।

আবৃত্তি করেন।

কী আশ্চর্য প্রথম লাইনটাই তো মনে পড়ছে না। পনের মিনিট ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। কুজিউস্কো ব্রিজে (বাঙালিরা বলে কাচপুর ব্রিজ) উঠেই কবিতাটি মনে পড়ে গেল।

 

যুদ্ধ শিশু

শুদ্ধ শিশু

একাত্তুরের বুদ্ধ-যীশু

এই শিশুটি পদ্মা এবং মেঘনা নদীর জল

সব বাঙালির রক্তস্রোতে বইছে অবিরল

এই শিশুটি রমনার মাঠ রেসকোর্স ময়দান

এই শিশুটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-গান

এই শিশুটি উত্তাল মার্চ, বজ্রকন্ঠ ধ্বনি

এই শিশুটি তোমার আমার সবার নয়ন মনি

এই শিশুটি একটি জাতির সগৌরব উন্মেষ

এই শিশুটিই সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ।

 

 

[স্বাধীন বাংলাদেশ]

২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর এই কবিতাটি লিখি। বিভিন্ন জায়গা থেকে তাগাদা আসছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর কবিতা লেখার। সেই সময়টাতে কানাডায় বসবাসরত একাত্তরের যুদ্ধশিশু মনোয়ারা ক্লার্কের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। মিনিটে মিনিটে মনোয়ারা মেসেজ পাঠাত। সে তাঁর সব কথা জানাত। কষ্টের, গ্লানির, পরিচহীনতার। বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে গিয়েও জন্মসনদ সংগ্রহ করতে পারেনি মনোয়ারা। কারণ কেউ তাঁর পিতার নাম জানে না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যুদ্ধশিশুদের জন্মসনদে পিতার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দিবে।  

 

সেই কথাও মনোয়ারা আমাকে বলে কিন্তু সরকার তা করছে না, এই অভিযোগ করে সে তার কষ্টের কথা জানায়। তখন সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু মনোয়ারার মুখটা আমি দেখতে পাই। একজন যুদ্ধশিশুর নিস্পাপ মুখ আমি দেখি, দেখি এক শুদ্ধশিশুর মুখ, আমি দেখি বাংলাদেশের মুখ। তখনি এই কবিতাটি লিখে ফেলি। কবিতাটি মনোয়ারা ক্লার্ককে উৎসর্গ করি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক কবিতা লেখা হয়েছে, সম্ভবত যুদ্ধশিশুদের নিয়ে তেমন একটা লেখা হয়নি। আমি সব সময়ই মনে করি জন্মসূত্রে মানুষ যা পায় তার দায় তাঁর ওপর চাপানো অন্যায়। একইভাবে জন্মসূত্রে পাওয়া কোনো গৌরবের জন্য কেউ যেন গর্ব না করে, মানুষ তাঁর কৃতকর্মের দায় নেবে, নিজের অর্জনের জন্য সম্মানিত হবে।

 

 

রাগীব ভাই ৩০ ইঞ্চি বাই ৪০ ইঞ্চি ক্যানভাসের ওপর, ডানদিকের টপ-রাইট কর্নার থেকে মোটা তুলি দিয়ে একটি নীল নদীকে আড়াআড়ি নামিয়ে আনেন নিচে, বাঁ দিকের বটম-লেফট কর্নারে।  শেষমেশ এই নদীটি আর ক্যানভাসে থাকেনি, নীল রেখাগুলো, মানে নদীর ঢেউগুলো, কেমন করে যেন হয়ে যায় বেদনায় নীল এক যুদ্ধশিশু, যিনি আজকের এক যুবতী কন্যা। ছবিটি তিনি দুদিনে দাঁড় করান, তবে শেষ করেন এক সপ্তাহ পরে, ৭ এপ্রিল সকালে। এর মধ্যে বহুবার রঙের এক্সপেরিমেন্ট চলে। এর আগে আমি এভাবে সারাক্ষণ পাশে বসে থেকে কোনো শিল্পীকে ছবি আঁকতে দেখিনি।  

 

লক্ষ করেছি রাগীব ভাই প্রচুর শাদা রঙ ব্যবহার করেন। কিছু একটা আঁকছেন, পছন্দ হল না, শাদা রঙ তুলিতে নিয়ে ঘষে ঘষে তা মুছে দেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর ছবি আকার ভিডিও চিত্র ধারণ করলে দেখা যাবে যে ছবিটি তিনি প্রথম এঁকেছিলেন আর যে ছবিটি চূড়ান্তভাবে হয়ে উঠল তা মোটেও এক ছবি নয়। কিন্তু প্রতিটি আঁচড় কোথাও না কোথাও থেকে যায়, যে ছবিটি ক্যানভাসে শেষ পর্যন্ত ভাসে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরো হাজারো ছবি। এ যেন যে মানুষকে আমরা দেখি, তাঁর ভেতরের অদেখা স্বপ্ন, কান্না, আনন্দ, আড়ালে থেকেও মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে তাঁর চোখে-মুখে, অভিব্যক্তিতে। এই ছবিটির থিম-রঙ নীল হওয়াতে মনে হচ্ছে পদ্মা এবং মেঘনার নীল জল থেকে উঠে আসা এই শিশুই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। শিল্পী রাগীব আহসান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কবিতার নামেই ছবিগুলোর নাম হবে, তাই এই ছবিটির নাম দিয়েছেন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ এবং কবিতা থেকে একটি লাইন, ‘এই শিশুটি পদ্মা এবং মেঘনা নদীর জল’ এঁকে দিয়েছেন ছবিটির বুকে।

 

তিনি চলে গেছেন। দিনের আলো নিভে গেছে। বাইরে শৈত্যপ্রবাহ। দরোজা খুললেই হু হু করে শীতের দানব ঘরে ঢুকে পড়ছে। মুক্তি ওপরে, লাইব্রেরিতে, নিজস্ব পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। আমি মুক্তিকে ডাকি।  চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আমরা নিচে নেমে যাই, স্টুডিওতে। দুজন মিলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটি দেখি, স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তি ঠিক খুঁজে পায়, এক বিষণ্ন যুবতীকে, আজ থেকে ৪৭ বছর আগে যার জন্ম হয়েছিল নারী-পুরুষের সহজাত প্রেম থেকে নয়, ঘৃণা থেকে।    

 

লেখকঃ  কাজী জহিরুল ইসলাম

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক থেকে

 


Top