আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস | daily-sun.com

আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

আবদুল্লাহ আল মোহন     ১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ১৯:০১ টাprinter

 আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস



১.
আজ ১৭ এপ্রিল। ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এই দিনটি চিরস্মরণীয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য একদিন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে আজকের এ দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পঠিত হয়। শপথ গ্রহণের পর স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। সেই থেকে দিনটি ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসেবে। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। মুজিবনগর সরকার স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম কার্যকরী সরকার। তৎকালীন মেহেরপুর মুক্ত এলাকা হওয়ার কারণে স্থানটিকে শপথগ্রহণের জন্যে বেছে নেওয়া হয়।

যুদ্ধ পরিচালনা ও পাক হানাদার বাহিনীকে স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়।

 


২.
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। ১০ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠন ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পেশ করা হয়। অস্থায়ী সরকারে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের স্থান দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকালে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণ করে অস্থায়ী সরকার। পরের দিন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অস্থায়ী সরকারের শপথগ্রহণের খবর ফলাও করে ছাপা হয়। এতে দেশে-বিদেশে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। ঐতিহাসিক মুজিবনগরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। অস্থায়ী সরকারের সফল নেতৃত্বে, মুজিবনগর সরকারের অধীনেই বাংলাদেশ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

 


৩.
আমরা জানি, বাঙালী জাতি সুদীর্ঘ দুই শতাব্দীরও অধিককাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানের শাসনে শৃঙ্খলিত ছিল। ২৫০ বছর আগে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সেই স্বাধীনতার সূর্য আবারও উদিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে। বাঙালীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার পর তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের (মুজিবনগর) বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে রচিত হয়েছিল আরেকটি ইতিহাস। একাত্তরের অগ্নিঝরা এ দিনেই বাঙালীর হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভিত্তিমূল রচিত হয়। কবর রচিত হয় অখন্ড পাকিস্তানের। বাংলা, বাঙালী, মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর যেন অভিন্ন নাম। স্বাধীনতা অর্জনের পথে ১৭ এপ্রিল এক ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত দিন। বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারের শপথ নেয়ার দিন, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের দিন। মাত্র দেড় শ’ বছরের ব্যবধানে একাত্তরের এই দিনে বাঙালী জাতি নতুন করে আবার জেগে উঠে, মুছে দেয় পরাজয়ের গ্লানি। বাঙালীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার পর বৈদ্যনাথতলায় রচিত হয়েছিল আরেকটি ইতিহাস। একাত্তরের অগ্নিঝরা এ দিনেই বাঙালীর হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিমূল রচিত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত বাঙালী জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস।

 


৪.
ইতিহাসের প্রয়োজনে প্রবাসী অথবা বিকল্প সরকার গঠন করার অনেক নজির আছে। কখনো কখনো কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য আরেকটি রাষ্ট্রকে দখল করে নিলে সেই রাষ্ট্রের বৈধ সরকার দেশ ত্যাগ করে প্রবাস থেকে নিজ দেশের সরকার পরিচালনার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ঝটিকা আক্রমণ করে ইউরোপের অনেক দেশ দখল করে নিলে সেসব দেশের বৈধ সরকার নিজ দেশ ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রবাসী সরকার হিসেবে নিজ দেশের মানুষকে শত্রুমুক্ত করার চেষ্টা করে। চেষ্টা সফল হলে এসব সরকার সগৌরবে নিজ দেশে ফিরে আসে। আবার কখনো কখনো নানা কারণে নিজ দেশের সরকারকে দেশের কিছু মানুষ বা কোনো এক বা একাধিক গোষ্ঠী যেকোনো কারণে অবৈধ মনে করলে (যেমন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি বা পরাজয়ের পরও ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করা) তখন আর এক বা একাধিক দল বিকল্প সরকার গঠন করতে পারে।

 

অফ্রিকার অনেক দেশে বর্তমানে গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানে কোনো একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি অঞ্চল দখল করে অনেক সময় সেখানে পাল্টা সরকার গঠন করে। প্রথম বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকারের বৈধ ভিত্তি ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ ৬ দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয় অর্জন করে (৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন ও ৭২.৫৭% প্রদত্ত ভোট)। পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল আরও নিরঙ্কুশ। জাতীয় পরিষদে পূর্ব বাংলার জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি (৭টি মহিলা আসনসহ) লাভ করে। এর মধ্যে ১৬২টি এলাকাভিত্তিক আসনের মধ্যে মাত্র ২টি হাতছাড়া হয়, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন অর্জন করে। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদেও আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল অবিস্মরণীয়। ৩১০টি প্রাদেশিক পরিষদ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৮টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৮৯ ভাগ লাভ করে। ’৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শুধু মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবেই আবির্ভূত হননি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি স্বীকৃত হন বাঙালীদের একমাত্র মুখপাত্র বা ‘সোল স্পোকস্ম্যান’ হিসেবে।

 


৫.
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যে সরকার গঠন করেছিলেন (মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিত) তার ভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়ী হলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গণতান্ত্রিকব্যবস্থার রীতিনীতি বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করবে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলারা চিন্তাই করতে পারেন না, পাকিস্তান শাসনের ভার বাঙালিদের হাতে চলে যাবে। শুরু হয় নানা টালবাহানা। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার নামে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কাজ শুরু করেন এবং ১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সূচনা করেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলাকে বাঙালিশূন্য করা। ইয়াহিয়া খানের জন্য এটি স্বাভাবিক ছিল যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করবে নির্বিচারে বাঙালি হত্যা করে এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত পাকিস্তানের গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের হয় হত্যা করতে হবে অথবা বন্দি করতে হবে। অপারেশন সার্চলাইট শুরুর প্রাক্কালে বাঙালি বুঝতে পেরেছিল একটি মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন এবং যে যার মতো প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রথম লক্ষ্য ছিল দেশ ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে পরবর্তী কর্মসূচি প্রস্তুত করা।


৬.
১০ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠন করা হয়। অস্থায়ী এ সরকারের অন্যতম ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। এ সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকায় তার অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। এর প্রধান কার্যালয় ছিল কলকাতায়। একটি নিয়মিত সরকারের মতো এর ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কেবিনেট সচিব ও অন্যান্য সচিব, স্থায়ী ও বেতনভুক্ত বেসামরিক-সামরিক সরকারী কর্মচারী। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেক সেক্টরে একজন করে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। অন্য সরকারী কর্মচারীদের মতো তাঁরাও ছিলেন বেতনভুক্ত। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কমান্ডার-ইন-চিফ।

 

জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ছিলেন প্রধান সেনাপতি। সরকার বাংলাদেশকে ১১টি সামরিক সেক্টরে বিভক্ত করার পাশাপাশি সমগ্র দেশকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করে রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে মাঠ পর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসন-ব্যবস্থা গড়ে তোলে। দেশের মুক্ত অঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের অনুশাসন পালিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন এ সরকার গঠন অত্যন্ত জরুরী ছিল। অন্যথায়, মুক্তিযুদ্ধে দেখা দিত সমূহ বিপর্যয়। সরকার গঠনের ফলে একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সরকার গঠনের ফলে বিশ্ববাসী স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত বাঙালিদের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। এই সরকারের সকল কৃতিত্বের সূচনা হয়েছিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান থেকে। এই সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন প্রশাসন, প্রচারণা, কূটনীতি ও যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছিল ভারত। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরও কিছু রাষ্ট্র আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য করে। মুজিবনগর সরকার গঠন বাঙালির স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবগাথা ও সাফল্যের স্বাক্ষর।

 


৭.
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে একত্রিত হয়েছিলেন। এদিন নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের বহু সাংবাদিক। এ দিন ঘোষিত ঘোষণাপত্রে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয়। ঘোষণাপত্রে সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রজাতন্ত্রের উপরাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী নিযুক্ত হন। অপরদিকে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী অস্থায়ী সরকারের মুক্তিবাহিনীর প্রধান কমান্ডার এবং মেজর জেনারেল আবদুর রব চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসীর উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন, যা আকাশবাণী থেকে একাধিকবার প্রচারিত হয়। তাজউদ্দীনের ভাষণের মধ্যদিয়েই দেশ-বিদেশের মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে। এরই পথপরিক্রমায় ১৭ এপ্রিল সকালে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরের দিন দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকা এবং সংবাদমাধ্যমে ১৭ এপ্রিল শপথগ্রহণের এই সংবাদ ফলাও করে ছাপা হয়। বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা বা আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের এই দিনটির তাৎপর্য ছিল বিশাল।

 


৮.
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বেলা ১১ টার দিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীবর্গ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বৈদ্যনাথতলায় পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গেই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আবদুল মান্নান এমএনএ। অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমএনএ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। পুলিশের ডিএসপি মাহবুব উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন স্থানীয় শাহাবউদ্দিন আহমদ সেন্টু, পিন্টু বিশ্বাস, মনসুর উদ্দিন মোল্লা ও আসাদুল হক প্রমুখ। পবিত্র কোরান, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ করেন যথাক্রমে বাকের আলী, পিন্টু বিশ্বাস ও ননী গোপাল ভট্টাচার্য। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির দোয়াজ আলী মাস্টার ও আইয়ুব হোসেনের নেতৃত্বে পার্শ্ববর্তী এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ ‘জয়বাংলা বাংলার জয়, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ শ্লোগান দেয়। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এতে বিশ্ববাসীকে, বিশেষভাবে বৃহৎশক্তিবর্গকে বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়।

 


৯.
মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও মন্ত্রীদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন হয় ১৮ এপ্রিল। এদিন সরকারের কাঠামো ছিল নিম্নরূপ:
মুজিবনগর সরকারকে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ভাগ করা হয়। এছাড়া কয়েকটি বিভাগ মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীনে থাকে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম নিম্নরূপ:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- রাষ্ট্রপতি
সৈয়দ নজরুল ইসলাম- উপরাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপতি পাকিস্তানে অন্তরীণ থাকার কারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
তাজউদ্দীন আহমদ - প্রধানমন্ত্রীএবং প্রতিরক্ষা, তথ্য, সম্প্রচার ও যোগাযোগ, অর্থনৈতিক বিষয়াবলি, পরিকল্পনা বিভাগ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম, সমাজকল্যাণ, সংস্থাপন এবং অন্যান্য যেসব বিষয় কারও ওপর ন্যস্ত হয়নি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী
খন্দকার মোশতাক আহমদ - মন্ত্রী, পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়
এম মনসুর আলী - মন্ত্রী, অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
এ এইচ এম কামরুজ্জামান - মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়

 


১০.
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় - এস.এ সামাদ প্রতিরক্ষা সচিব। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম.এ.জি ওসমানী, চীফ অব স্টাফ কর্নেল আবদুর রব, উপ-সেনাপতি এ.কে খন্দকার, এবং ডি.জি মেডিকেল সার্ভিস ও বিভিন্ন পদবীর স্টাফ অফিসার এ দপ্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধরত অঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটিতে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। তবে ১০নং বা নৌ সেক্টরে কোন সেক্টর কমান্ডার ছিল না, কমান্ডোরা যখন যে এলাকায় অভিযান করত সে সেক্টরের কমান্ডারের অধীনে থাকত। এ ছাড়াও জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স নামে তিনটি ব্রিগেড গঠন করা হয়। ব্রিগেডগুলির কমান্ডার হলেন যথাক্রমে মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর কে.এম সফিউল্লাহ।

 


১০.২
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - যুদ্ধের সময় বিদেশে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করে এবং বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে বহির্বিশ্বের সরকার ও জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে এ মন্ত্রণালয়। এ লক্ষে কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, স্টকহোম প্রভৃতি স্থানে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন করা হয় এবং জাতিসংঘ, আফগানিস্তান, সিরিয়া-লেবানন, নেপাল, শ্রীলংকা, বার্মা, থাইল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশের সমর্থন আদায়ের জন্য কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে এ মন্ত্রণালয় থেকে পত্র প্রেরিত হয়। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর প্রধান ছিলেন কলকাতায় হোসেন আলী, দিল্লিতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, ইউরোপে বিশেষ প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, ওয়াশিংটনে এম আর সিদ্দিকী। স্টকহোমে আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশ সরকার প্রেরিত কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সিরিয়া-লেবাননে মোল্লা জালাল উদ্দীন এমএনএ ও ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী, আফগানিস্তানে আবদুস সামাদ আজাদ, আশরাফ আলী চৌধুরী এমএনএ, মওলানা খায়রুল ইসলাম যশোরী ও এডভোকেট নূরুল কাদের। নেপালে প্রেরিত হন আবদুল মালেক উকিল, সুবোধচন্দ্র মিত্র ও আবদুল মোমিন তালুকদার। এডভোকেট ফকির শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে শামসুল হক ও জ্যোতিপাল মহাথেরো শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ও জাপান গমন করেন। মাহবুব আলম চাষী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্র দপ্তর অবস্থিত ছিল কলকাতার ৯ সার্কাস এভিনিউতে।


১০.৩

অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় - এম মনসুর আলী এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও খন্দকার আসাদুজ্জামান ছিলেন সচিব। যুদ্ধের সময় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উল্লেখযোগ্য কোন কাজ ছিল না। তবে অর্থ বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করে: সরকারের আয়-ব্যয়ের বাজেট প্রণয়ন; বাংলাদেশের অভ্যন্তর ও অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত সম্পদের হিসাব তৈরি; বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গকে অর্থ প্রদানের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন; আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা; রাজস্ব ও শুল্ক আদায়; এবং যেকোন আর্থিক অনিয়ম রোধের জন্য কমিটি গঠন। বাংলাদেশ সরকার তার আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করে প্রথমে ছয় মাসের জন্য একটি বাজেট তৈরি করে। বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংরক্ষণের জন্য ট্রেজারি স্থাপন করে এবং প্রবাসী বাঙালি ও বিভিন্ন বিদেশী নাগরিক ও সংস্থার তরফ থেকে প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশ ফান্ড নামের একটি তহবিলে জমা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বেতন-ভাতা ছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের প্রস্তাব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত হত এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের কাছে সে অর্থ পৌঁছাত। সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়।

 

১০.৪
মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় - মন্ত্রিপরিষদের সভায় বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন, সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং এসব বিষয়াদি লিপিবদ্ধকরণ মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের আওতাভুক্ত ছিল। মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হবার পর পরিষদের প্রথম দুই মাসের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকাংশই তাজউদ্দীন আহমদ নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেন। এরপর এইচ টি ইমাম সচিব হিসেবে যোগ দেবার পর অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের সমনতয়ে সচিবালয় গড়ে ওঠে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় সাধনে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


১০.৫
সাধারণ প্রশাসন বিভাগ - নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি ও চাকরির বিধি প্রণয়নের নিমিত্তে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আওতায় সাধারণ প্রশাসন বিভাগ সৃষ্টি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রধানত দ্বিতীয় শ্রেণীর বিভিন্ন নিয়োগ এ বিভাগের আওতাধীন ছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তালিকা বহির্ভূত ব্যক্তিবর্গকে চিহ্নিতকরণ এবং বিভিন্ন নিয়োগের জন্য প্যানেল তৈরি করাও ছিল এ বিভাগের দায়িত্ব। নুরুল কাদের সংস্থাপন সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
জোনাল প্রশাসনিক কাউন্সিল - সাধারণ প্রশাসন বিভাগের আওতায় এ কাউন্সিল গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনের পক্ষে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি জেলায় সরাসরি কাজ করা অসম্ভব বিধায় কয়েকটি জেলার সমন্বয়ে একটি করে প্রশাসনিক জোন গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৯টি জোন এবং পরবর্তী সময়ে আরও দু’টি জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিটি জোনের একটি হেডকোয়ার্টার ছিল এবং একজন চেয়ারম্যান (এমএনএ বা এমপিএ) ও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জোনের দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট জোনের চেয়ারম্যান, সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মচারীদের সমন্বয়ে প্রশাসনিক কাউন্সিল গঠিত হয়।
দায়িত্ব ও কর্তব্য - মন্ত্রিসভা কর্তৃক জোনাল প্রশাসনিক কাউন্সিলের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, জোনের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তথা জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, উদ্বাস্ত্তদের ত্রাণ সহায়তা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ত্রাণ প্রদানের বিষয়টির সমন্বয় সাধন, যুবক্যাম্পগুলোকে সাধ্যমত সহায়তা প্রদান এবং সেক্টর কমান্ডকে সহায়তা করা জোনাল প্রশাসনিক কাউন্সিলের প্রধান কাজ ছিল। মুক্তাঞ্চলে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন যে কার্যকর রয়েছে তা জনগণকে বোঝানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জোনাল প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে ৫ দিনের নোটিশে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা সচিবকে মাসে কমপক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হত।

 


১০.৬
স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় - এ মন্ত্রণালয় একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে প্রথম কাজ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মহাপরিচালককে সচিবের মর্যাদা দেয়া হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ দুভাগে বিভক্ত ছিল: (ক) সেনাবাহিনী তথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা ও (খ) বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ বা সরাসরি অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে নি এমন জনগণকে চিকিৎসা প্রদান। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল, চিকিৎসক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ, ঔষধ-পথ্য সংগ্রহ, মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসক দল প্রেরণ, শল্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, এবং আহত ও নিহতদের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা করা। ডা. টি হোসেন প্রথমে স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক এবং পরে স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব নিযুক্ত হন।

 


১০.৭

তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বসবাসরত বাঙালিদের মনোবল উজ্জীবিত রাখার প্রয়োজনে এ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ মন্ত্রণালয় প্রধানত চারটি মাধ্যমে এর কর্মকান্ড পরিচালনা করত: (ক) বেতার (স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র), (খ) চলচ্চিত্র, (গ) প্রকাশনা, (ঘ) চারুকলা ও ডিজাইন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - মুক্তাঞ্চল, শরণার্থী ক্যাম্প ও ট্রেনিং ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা এ মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব ছিল। মুক্তাঞ্চলে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির ব্যাপারে সরকারকে সহায়তা এবং যুদ্ধ এলাকা ও মুক্তাঞ্চলে গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনার জন্য গোয়েন্দা বিভাগ গঠন করা হয়। এ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক, ব্যাজ ও মনোগ্রাম নির্ধারণ করে। আবদুল খালেককে প্রথমে পুলিশের আই.জি ও পরে স্বরাষ্ট্র সচিব নিয়োগ দেয়া হয়। যুদ্ধের শেষদিকে বাংলাদেশকে ৪টি রেঞ্জে ভাগ করে চারজন ডিআইজি ও প্রত্যেক জেলায় এসপি নিয়োগ করা হয়। ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশী জনগণের ভ্রমণ ডকুমেন্ট ইস্যু করাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল।

 


ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ - ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শরণার্থীদের আবেদন বিবেচনা করে তাদের সাধ্যমত সহায়তা প্রদান করা হত। ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: (ক) ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি এবং (খ) উদ্বাস্ত্ত কল্যাণ বোর্ড।
সংসদ বিষয়ক বিভাগ - পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ বিভাগ কাজ করে। প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করা এ বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল। মুক্তিযোদ্ধা বাছাই, শরণার্থীদের আবাসন ও যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে পরিষদ সদস্যগণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এসব কর্মকান্ডের জন্য তাদের ভাতা প্রদান করা হত।

 


কৃষি বিভাগ - যুদ্ধপরবর্তী সময়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতির বিবেচনায় কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে কিভাবে খাদ্য সংকট কাটিয়ে উঠা যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নেবার জন্য এ বিভাগ কাজ করে। নুরুদ্দিন আহমদ কৃষি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকৌশল বিভাগ - যুদ্ধে সেক্টরগুলোতে প্রকৌশল বিষয়ক সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ করে দ্রুত রাস্তা নির্মাণ ও মেরামত এবং সেতু মেরামতের জন্য কিছুসংখ্যক প্রকৌশলীকে এ বিভাগের অধীনে নিয়োগ করা হয়। এমদাদ আলী প্রধান প্রকৌশলী নিযুক্ত হন।

 


পরিকল্পনা সেল - আওয়ামী লীগের ছয়দফা এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে এ দলের ইশতেহারের পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে গড়ে তোলার জন্য, বিশেষ করে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কিভাবে দ্রুত কাটিয়ে উঠা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সরকার এ সেল গঠন করে। পাকিস্তান শাসনামলে উন্নয়নবঞ্চিত এলাকা চিহ্নিতকরণ ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন বিষয়ে পরামর্শ দেয়াও এর কাজ ছিল। প্রাথমিকভাবে বাস্ত্তহারাদের পুনর্বাসন, খাদ্য সরবরাহ, স্বাস্থ্য, পানি-বিদ্যুৎ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর বিষয়ে এ সেল সরকারকে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দান করে। এ সেলই পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা কমিশনে রূপান্তরিত হয়। ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী চেয়ারম্যন এবং ড. খান সারোয়ার মুর্শেদ, ড. মোশাররফ হোসেন, ড. এস.আর বোস ও ড. আনিসুজ্জামান পরিকল্পনা সেলের সদস্য ছিলেন।

 


যুব ও অভ্যর্থনা শিবির নিয়ন্ত্রণ বোর্ড - মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে আগ্রহী যুবকদের প্রথমে অভ্যর্থনা ক্যাম্পে এবং পরে সেখান থেকে যুবক্যাম্পে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হত। জোনাল প্রশাসনিক কাউন্সিলগুলোর আওতায় উভয় ক্যাম্প পরিচালিত হত। এ বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাহায্যে কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে মোট ১০৬টি যুব ক্যাম্প ও ১১২টি অভ্যর্থনা ক্যাম্প ছিল। বোর্ডের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারের বাজেটেই উভয় ক্যাম্প পরিচালিত হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী যুব ও অভ্যর্থনা শিবির নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া প্রতিটি ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন একজন করে এমএনএ বা এমপিএ।


১১.
এবার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সম্পর্কে জানা যাক। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ ঘোষণা প্রবাসী মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসাবে কার্যকর। এমনকি ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ ঘোষণা দেশের সংবিধান হিসাবে কার্যকর থাকবে। একটি অতীব সংকটময় অবস্থার মোকাবেলায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সামরিক বাহিনীর আক্রমণের অব্যবহিত পূর্বে এবং পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রাক্কালে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

 


১২.
বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ছিল নিম্নরূপ:
এটিই সম্ভবত আমার শেষ বার্তা: আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণের নিকট আমার আহবান, আপনারা যে যেখানেই থাকুন এবং আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করুন। যতদিন পাক হানাদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত না হয় এবং যতদিন আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হয় ততদিন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তাটি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে প্রচারের জন্য মধ্যরাতের কিয়ক্ষণ পরে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। মার্চ মাসের ২৬ ও ২৭ তারিখে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র (পরের নামকরণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার আরও দুটি ঘোষণা প্রচার করা হয়। এর একটি প্রচারিত হয় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান কর্তৃক এবং অন্যটি মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক।

 


১৩.
আমরা জেনেছি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনী কর্তৃক ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অংশে জনগণের উপর আক্রমণ চালানোর প্রাক্কালে ঊর্ধ্বতন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন। ৩০ মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন। গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের যেসকল সদস্য ১০ এপ্রিলের মধ্যে কলকাতায় মিলিত হন তারা একটি প্রবাসী আইন পরিষদ গঠন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদ সদস্য অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এ ঘোষণায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। ঘোষণাপত্রে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণাবলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বৈধ বলে বিবেচিত হয় এবং এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অব কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

 


১৪.
নিম্নে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ দেয়া হলো:
মুজিবনগর, বাংলাদেশ
তারিখ: ১০ এপ্রিল ১৯৭১
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল; এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহবান করেন; এবং
যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখন্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান; এবং
যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং
যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যা এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনা দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করে তুলেছে; এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে;
সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি
এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্ণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং
এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং
রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং
তাঁর কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং
বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।
বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম।
স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী
বাংলাদেশ গণপরিষদের ক্ষমতা দ্বারা
এবং ক্ষমতাবলে যথাবিধি সর্বাধিক ক্ষমতাধিকারী।

 


১৫.
আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১
বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একই দিনে আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন। স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা রক্ষার্থে এটা করা হয়। -
মুজিবনগর, বাংলাদেশ
১০ এপ্রিল, ১৯৭১
আমি, বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারী করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে। এই রাষ্ট্রগঠন বাংলাদেশের জনসাধারণের ইচ্ছায় হয়েছে। এক্ষণে, সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি অনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত সকল জেলা জজ এবং জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এবং সকল কুটনৈতিক প্রতিনিধি যারা অন্যত্র অবস্থান করছেন, তারা সকল সরকারি কর্মচারীকে স্ব স্ব এলাকায় আনুগত্যের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।
এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।
স্বাক্ষর: সৈয়দ নজরুল ইসলাম
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

 


১৬.
বাঙালী জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার পাশাপাশি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি গঠনমূলক কাজে অবদান রাখবে, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসে এই প্রত্যাশা করি। উদাত্ত আহ্বান জানাই ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতির পিতার অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের জন্য আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনে। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশের আগামীদিনের প্রত্যাশিত দিক-নির্দেশনা, সাংবিধানিক এবং যৌক্তিক অধিকার রক্ষার জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। দিনটি বাঙালি জাতির জীবনের এক অবিস্মরণীয় গৌরবগাঁথা এবং ঐতিহাসিক দিন। যে দিনটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য আনুষ্ঠানিকভাবে উদিত হয়েছিল, সেই দিনটি বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাবে এটা কখনও সম্ভব নয়। বিশেষ করে যারা অত্যাচার-নিপীড়নের নাগপাশ থেকে মুক্তির স্বপ্নে, দেশমাতৃকার স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, যারা দখলদার হানাদারদের পবিত্র মাতৃভূমির মাটি থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন, তাদের কাছে ওই দিনের প্রতিটি ঘটনাই এমন মহার্ঘ্যরূপে আবির্ভূত হয়েছিল যে, তা বিস্মৃত হওয়া কল্পনাতীত। দৃপ্ত শপথে উজ্জীবিত হোক সেই মুজিবনগর সরকারের চেতনা।

 

 

(অকৃপণ ঋণ/ তথ্যসূত্র / উৎস / গ্রন্থপঞ্জি: বাংলাপিডিয়া, হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, ঢাকা, ১৯৮২; এইচ.টি ইমাম, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, ২০০৪; নূরুল কাদের, একাত্তর আমার, ১৯৯৯; শামসুল হুদা চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর, ১৯৮৫; বি বি বিশ্বাস, একাত্তরে মুজিবনগর, ২০০০; মোহাম্মদ ফায়েকউজ্জামান, মুজিবনগর সরকার ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকা, ২০০৮, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

 

 

 

 

লেখক ঃ আবদুল্লাহ আল মোহন 


Top