সিলেটে মা-ছেলে খুনের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার স্বীকার তানিয়া-মামুনের | daily-sun.com

সিলেটে মা-ছেলে খুনের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার স্বীকার তানিয়া-মামুনের

ডেইলি সান অনলাইন     ১০ এপ্রিল, ২০১৮ ১৪:৫৫ টাprinter

সিলেটে মা-ছেলে খুনের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার স্বীকার তানিয়া-মামুনের

 

সিলেট নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়া এলাকায় বাসার মধ্যে মা ও ছেলেকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার হওয়া তানিয়া আক্তার ও তার স্বামী ইউসুফ মামুন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তানিয়া ও মামুন জানান, রাতে মা-ছেলেকে গলা কেটে হত্যা করেন তারা।

এর আগে পরিবারের সবাইকে রাতের খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় গলা টিপে শিশু রাইসাকে মৃত ভেবে ফেলে যান তারা। গত ৩০ মার্চ রাত ৩টায় হত্যাকাণ্ড শেষে স্বামী-স্ত্রী বাসা থেকে বেরিয়ে যান।


সোমবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টায় সিলেটের আলোচিত মা-ছেলে জোড়া খুনের ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নগরীর উপশহরস্থ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল করিম মল্লিক।


তিনি জানান, সিলেট নগরীর মিরা বাজারের খারপাড়ায় মা রোকেয়া বেগম ও ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তানিয়া আক্তারকে (২২) গ্রেফতার করে পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ও তানিয়ার দ্বিতীয় স্বামী ইউসুফ মামুনের (২৪) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ঘোষহাটা গ্রাম থেকে সোমবার (৯ এপ্রিল) ভোরে গ্রেফতার করা হয় তাকে। পরে সিলেট আনা হয়।  


এর আগে, রবিবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার থেকে তার স্বামী ইউসূফ মামুনকে গ্রেফতার করা হয়।


রেজাউল করিম মল্লিক জানান, তানিয়া আক্তার দুই বছর আগে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে আসেন।

এখানেই পরিচয় হয় রোকেয়া বেগমের সাথে। পাশাপাশি দেখা হয় মামুনের সাথেও। পরে রোকেয়া বেগম কুমিল্লা থেকে আসা তানিয়াকে বোন বানিয়ে সিলেটে রেখে দেন। এদিকে, মামুনের সাথেও তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর কয়েক দিন পরই মামুনের সাথে তানিয়ার বিয়ে হয়।  

 

খুন হওয়া মা রোকেয়া বেগম ও ছেলে রবিউল ইসলাম রোকন


জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানান, তানিয়া রোকেয়ার বাসায় থাকতেন। সম্প্রতি তানিয়াকে অসামাজিক কাজে নামাতে চান রোকেয়া। অনেক সময় রোকেয়া বেগম জোর করতেন। আর একথা স্বামী মামুনকে জানালে রোকেয়া বেগমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা। এর অংশ হিসেবে গত ৩০ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে তানিয়া, মামুন, রিপন, শিপন ছাড়াও আরো ৪/৫ জন রোকেয়ার বাসায় যান। রাত ৯টার দিকে লোডশেডিং হলে তানিয়া ও মামুন ছাড়া বাকিরা চলে যান। অন্য সময়ের মতো স্ত্রী তানিয়ার সাথে মামুন থেকে যান রোকেয়ার বাসায়। রাতের খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিবারের সবাইকে অচেতন করা হয়। রাত ১টার দিকে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রথমে রোকেয়া বেগমের কক্ষে যান। ঘুমে অচেতন রোকেয়া বেগমের মুখে কম্বল দিয়ে শ্বাসরোধ করার জন্য চেপে ধরেন তানিয়া আর ছুরি দিয়ে গলা কেটে ও কুপিয়ে রোকেয়াকে হত্যা করেন মামুন। এ সময় রাইসা জেগে উঠলে তার গলায় চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা চালান মামুন। এতে রাইসা অজ্ঞান হয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত হতে তানিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করেন। পরে পার্শ্ববর্তী রুমে ঘুমে অচেতন রোকেয়ার ছেলে রোকনকেও একই কায়দায় হত্যা করেন তারা। রাত ৩টার দিকে স্বামী-স্ত্রী বাসা থেকে বের হন। ভোরে তানিয়াকে কুমিল্লার গাড়িতে তুলে দেন মামুন। এ সময় সে সিলেট নগরীতে অবস্থান করেন।


পিবিআইর কর্মকর্তা রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, তানিয়া ও মামুন দাবি করেছেন, রোকেয়ার বাসায় অসামাজিক কার্যকলাপ হতো। নিয়মিত খদ্দেরের আনাগোনা ছিল। আর ছেলে রোকন সবকিছু জানতো ও মাকে সহায়তা করতো। রোকেয়ার বাসায় নিয়মিত মাদকের আসর বসতো।


তারা আরো জানান, হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক আগে রোকেয়া ও তার ছেলে-মেয়ে এবং তানিয়া-মামুন দম্পতিসহ আরো ৪/৫ জন কক্সবাজারে ভ্রমণ করেন। ওই ভ্রমণে আর কারা সঙ্গী ছিল, তাদের নাম জানাতে পারেননি তানিয়া।


তারা আরো বলেন, জোড়া খুনের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী নাজমুলের কথা রোকেয়ার মুখে শুনলেও কোনো দিন তাদের দেখা হয়নি।


প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, গত ১ এপ্রিল পুলিশ লাশ উদ্ধার করার পর পরই সন্দেহভাজনদের মোবাইল ট্র্যাকিং শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, ওই দিনই সিলেট ছাড়ে তানিয়া। সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাকে ট্রেস করা যায়। এর পর থেকে মোবাইল বন্ধ করে দেয়।


উল্লেখ্য, রোকেয়া বেগম তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকন (২ এপ্রিল শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থী) এবং মেয়ে রাইসাকে (৩) নিয়ে মিরাবাজারের মিতালী আবাসিক এলাকার ১৫/জে নম্বর বাসায় গত একবছর ধরে ভাড়া থাকতেন। তাদের সঙ্গে বাসায় তানিয়াও থাকত। রবিবার (১ এপ্রিল) সকালে তাদের খোঁজ নিতে মিরাবাজারস্থ বাসায় আসেন নিহতের ভাই জাকির হোসেন। বাসায় এসে ভেতর থেকে তিনি তাদের দরজা বন্ধ দেখতে পান। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরও কেউ দরজা না খোলায় তিনি বাড়ির মালিককে খবর দেন। পরে বাড়ির মালিক ঘটনা শুনে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে ঘরে প্রবেশ করে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় ঘরের মধ্যে কান্নারত অবস্থায় পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে তানিয়াকে বাসায় পাওয়া যায়নি।


এ ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন রোকেয়া বেগমের ভাই জাকির হোসেন। মামলার এজাহারে কারও নামোল্লেখ করা না হলেও, গত কয়েকদিন আগে রোকেয়ার বাসায় হামলা, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া এবং তাকে মারধরের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলা এবং মারধরের ঘটনা উল্লেখ করে এর সঙ্গে জড়িত শিপলু, শিপন ও সুমনের নাম উল্লেখ করে ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এজাহারে বলা হয়েছে।


নিহত রোকেয়ার ভাই জাকির হোসেন জানান, ভগ্নিপতি জগন্নাথপুর উপজেলার হেলাল আহমদের সঙ্গে বোনের বনিবনা হচ্ছিল না। তাই তিনি ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতেন। গত রমজান মাসে হেলাল আহমদ স্ট্রোক করার পর হেলাল আহমদ তার পরিবারের সঙ্গে নগরীর বারুতখানায় একটি বাসায় থাকেন।


তিনি আরও জানান, মাসখানেক আগে থেকেই রোকেয়া তাকে জানিয়েছিলেন, বাসায় তার বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হচ্ছে, বাসা বদলানো দরকার। ১৫-২০ দিন আগে একদল যুবক বাসা থেকে মোবাইল নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় মুরুব্বীরা বিচার করে সেটা সমাধান করে দেন।


এর আগে নগরীতে মা-ছেলে খুনের ঘটনায় গত মঙ্গলবার (৩ এপ্রিল) নগরীর শাহপরান থানার মূর্তিচক গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে নাজমুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

 


Top