ভবন ভাঙতে মুচলেকা দিয়ে এক বছর সময় পেল বিজিএমইএ | daily-sun.com

ভবন ভাঙতে মুচলেকা দিয়ে এক বছর সময় পেল বিজিএমইএ

ডেইলি সান অনলাইন     ২ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:৩১ টাprinter

ভবন ভাঙতে মুচলেকা দিয়ে এক বছর সময় পেল বিজিএমইএ

 

রাজধানীর বেগুনবাড়ী খালপাড়ে (হাতিরঝিলে) জলাধার আইন ভঙ্গ করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) ১৬তলাবিশিষ্ট ভবনটি ভাঙতে আরও এক বছর সময় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ভবনটি ভাঙতে আদালতের দেয়া নির্দেশ পালনে আর সময় চাওয়া হবে না -এমন মুচলেকা দেয়ায় আদালত বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষকে এ সময় দিয়েছেন।

সোমবার (২ এপ্রিল) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ সময় আবেদন মঞ্জুর করেন।


আদেশের পর আদালত বিজিএমইএ’র উদ্দেশে বলেন, ‘মনে রাখবেন আপনারা যা সময় চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। এক বছর চেয়েছেন, এক বছর ১০ দিন পেয়েছেন। কারণ, আগের দেয়া সময় আগামী ১২ এপ্রিল পর্যন্ত আছে। তার মানে এখানে ১০ দিন। আর এখন পেলেন এক বছর। মোট এক বছর ১০ দিন পেলেন। এবার যেন আদালতের নির্দেশ পালন হয়।’


আদালতে বিজিএমইএ’র পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী ও ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকের (রাজউক) পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন মনজিল মোরসেদ।


এর আগে গত ৫ মার্চ বহুতল ভবনটি ভাঙতে আরো এক বছর সময় চেয়ে আবেদন করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ। ২৫ মার্চ ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়। এরপর ২৭ মার্চ ওই আবেদনের ওপর আদেশে বারবার সময় চাওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ। 


ওই দিন আদালত বিজিএমইএর আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ভবন কতদিনের মধ্যে ভাঙবেন সে বিষয়ে মুচলেকা দিতে হবে। অন্যথায় কোনো সময় আবেদন গ্রহণ করা হবে না। বার বার সময় আবেদন করেন। এতে আমাদেরই লজ্জা লাগে।


এরপর প্রথমে দেয়া মুচলেকা সঠিক হয়নি মর্মে ফের জমার আদেশ দেন। ওই দিন মুচলেকা আদালতে উপস্থাপনের পর আদালত লক্ষ্য করেছিল, প্রতিষ্ঠানটির ‘বর্তমান’ বোর্ড অব ডিরেক্টর ভবন ভাঙার আদেশ পালনে আর সময় চেয়ে আবেদন করবে না বলে উল্লেখ করেছে।


তখন আদালত বলেন, ‘বর্তমান বোর্ডতো পরবর্তী মেয়াদে নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে কী হবে?’ এ পর্যায়ে আদালত নির্দেশ দেন, মুচলেকা সংশোধন করে যথাযথভাবে দেয়ার জন্য।


সেখানে ‘বোর্ড’ নয়, বিজিএমইএ সামগ্রিকভাবে আদালতের নির্দেশ পালন করবে এবং আর সময় চাইবে না মর্মে মুচলেকাতে লেখা থাকবে। ওই নির্দেশ অনুসারে আজ সোমবার (২ এপ্রিল) মুচলেকা উপস্থাপন করা হয়।


এর আগে গত বছরের ৮ অক্টোবর ভবনটি ভাঙতে বিজিএমইএ’র একবছর সময় চেয়ে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারকের আপিল বিভাগ ৭ মাস সময় বেধে দিয়েছিলেন। ওই দিন শুনানিতে বিজিএমইএর আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, 'এটাই শেষ সুযোগ। এরপর আর সময় চাইবেন না। এর মধ্যে যা করার করবেন।'


সে হিসাবে ভবনটি ভাঙতে আদালতের দেওয়া নির্ধারিত সময় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হচ্ছে। এর আগেই আবার সময় চেয়ে আবেদন করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।


এর আগে গত বছরের ৮ মার্চ ওই ভবন থেকে বিজিএমইএ'র কার্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নিতে সাড়ে তিন বছর সময় চেয়ে একটি আবেদন করে কর্তৃপক্ষ। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ওই বছরের ১২ মার্চ প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ছয় মাসের মধ্যে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। 


এর আগে গত বছেরের ৫ মার্চ আপিল বিভাগ ভবনটি ভেঙে ফেলতে দেয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেন। তখন ভবন ভাঙতে কত দিন সময় লাগবে, তা জানিয়ে আবেদন করতে বলেন। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ভবন সরাতে তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন করে। ১২ মার্চ আপিল বিভাগ আবেদন নিষ্পত্তি করে ছয় মাস সময় দেন ভবন সরাতে।


এরও আগে, ২০১৬ সালের ২ জুন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ভবনটি ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ওই বছরের ৮ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিজিএমইএ'র পক্ষ থেকে রিভিউ আবেদন করা হয়।


প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২ অক্টোবর রাজউকের অনুমোদন ছাড়া বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ বিষয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের দৃষ্টিতে আনেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মুনিরউদ্দিন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৩ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। রুলে ভবনটি ভাঙার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।


চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ভূমির মালিকানা স্বত্ব না থাকা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জলাধার আইন ভঙ্গ করায় বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন এবং ভবনটি ভাঙার নির্দেশ দেন। এতে স্থগিতাদেশ চেয়ে করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৫ এপ্রিল চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায়ের ওপর ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। পরে এ সময়সীমা বাড়ানো হয়।


দুই বছর পর ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের দেয়া ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছিল, বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো। এ ধ্বংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট না করা হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয়, সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রমিত করবে। রায়ে ভবনটি ভাঙতে ৯০ দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়। রায়ের কপি হাতে পেয়ে ২০১৩ সালের ২১ মে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করেন বিজিএমইএর সভাপতি, যা শুনানির পর গত বছরের ২ জুন আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে যায়।


এরপর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। ওই রায়ে বলা হয়, অবিলম্বে ভাঙতেই হবে এই বহুতল অবৈধ ভবন। ভবন ভাঙার যাবতীয় খরচ বিজিএমইএকেই বহন করতে হবে। বিজিএমইএ না ভাঙলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউককে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। এ জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা বিজিএমইএর কাছ থেকে নিতে বলা হয়েছে। বিজিএমইএর লিভ টু আপিল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।


প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পাশে বেগুনবাড়ী খালপাড়ের এ জায়গাটি নির্ধারণ করে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কেনে। ওই বছরেরই ২৮ নভেম্বর ভবনটি তৈরির কাজ শুরু হয়, যা শেষ হলে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভবনটির উদ্বোধন করেন।

 


Top