বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে মুচলেকা চাইলেন আপিল বিভাগ | daily-sun.com

বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে মুচলেকা চাইলেন আপিল বিভাগ

ডেইলি সান অনলাইন     ২৭ মার্চ, ২০১৮ ১১:০৮ টাprinter

বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে মুচলেকা চাইলেন আপিল বিভাগ

 

রাজধানীর বেগুনবাড়ী খালপাড়ে (হাতিরঝিলে) জলাধার আইন ভঙ্গ করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) ১৬তলাবিশিষ্ট ভবনটি ভাঙতে বারবার সময় চাওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগ। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ভবনটি ভাঙতে এক বছর সময় চেয়ে আবেদন করার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।


আদালত বিজিএমইএর আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ভবন কতদিনের মধ্যে ভাঙবেন সে বিষয়ে মুচলেকা দিতে হবে। অন্যথায় কোনো সময় আবেদন গ্রহণ করা হবে না। বার বার সময় আবেদন করেন। এতে আমাদেরই লজ্জা লাগে।


মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।  


আদালতে বিজিএমইএর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী। রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মঞ্জিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। পরে আদালত বলেন, সময় আবেদনের বিষয়ে মুচলেকা দেওয়ার পরেই আদেশ দেওয়া হবে।


এ সময় আদালত ভবনটি ভাঙতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন।


এর আগে গত ২৫ মার্চ বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে ভবন ভাঙতে এক বছর সময় চেয়ে আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ বিজিএমইএ’র আবেদনের ওপর আদেশের জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেছিলেন।


এর আগে গত ৫ মার্চ বহুতল ভবনটি ভাঙতে আরো এক বছর সময় চেয়ে আবেদন করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।


গত বছরের ৮ অক্টোবর ভবনটি ভাঙতে বিজিএমইএ’র একবছর সময় চেয়ে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারকের আপিল বিভাগ ৭ মাস সময় বেধে দিয়েছিলেন। ওই দিন শুনানিতে বিজিএমইএর আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, 'এটাই শেষ সুযোগ। এরপর আর সময় চাইবেন না। এর মধ্যে যা করার করবেন। '


সে হিসাবে ভবনটি ভাঙতে আদালতের দেওয়া নির্ধারিত সময় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হচ্ছে। এর আগেই আবার সময় চেয়ে আবেদন করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।


এর আগে গত বছরের ৮ মার্চ ওই ভবন থেকে বিজিএমইএ'র কার্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নিতে সাড়ে তিন বছর সময় চেয়ে একটি আবেদন করে কর্তৃপক্ষ। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ওই বছরের ১২ মার্চ প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ছয় মাসের মধ্যে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।  


এর আগে গত বছেরের ৫ মার্চ আপিল বিভাগ ভবনটি ভেঙে ফেলতে দেয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেন। তখন ভবন ভাঙতে কত দিন সময় লাগবে, তা জানিয়ে আবেদন করতে বলেন। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ভবন সরাতে তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন করে। ১২ মার্চ আপিল বিভাগ আবেদন নিষ্পত্তি করে ছয় মাস সময় দেন ভবন সরাতে।


এরও আগে, ২০১৬ সালের ২ জুন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ভবনটি ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ওই বছরের ৮ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিজিএমইএ'র পক্ষ থেকে রিভিউ আবেদন করা হয়।


প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২ অক্টোবর রাজউকের অনুমোদন ছাড়া বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ বিষয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের দৃষ্টিতে আনেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মুনিরউদ্দিন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৩ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। রুলে ভবনটি ভাঙার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।


চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ভূমির মালিকানা স্বত্ব না থাকা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জলাধার আইন ভঙ্গ করায় বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন এবং ভবনটি ভাঙার নির্দেশ দেন। এতে স্থগিতাদেশ চেয়ে করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৫ এপ্রিল চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায়ের ওপর ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। পরে এ সময়সীমা বাড়ানো হয়।


দুই বছর পর ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের দেয়া ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছিল, বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো। এ ধ্বংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট না করা হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয়, সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রমিত করবে। রায়ে ভবনটি ভাঙতে ৯০ দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়। রায়ের কপি হাতে পেয়ে ২০১৩ সালের ২১ মে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করেন বিজিএমইএর সভাপতি, যা শুনানির পর গত বছরের ২ জুন আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে যায়।


এরপর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। ওই রায়ে বলা হয়, অবিলম্বে ভাঙতেই হবে এই বহুতল অবৈধ ভবন। ভবন ভাঙার যাবতীয় খরচ বিজিএমইএকেই বহন করতে হবে। বিজিএমইএ না ভাঙলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউককে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। এ জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা বিজিএমইএর কাছ থেকে নিতে বলা হয়েছে। বিজিএমইএর লিভ টু আপিল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।


প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পাশে বেগুনবাড়ী খালপাড়ের এ জায়গাটি নির্ধারণ করে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কেনে। ওই বছরেরই ২৮ নভেম্বর ভবনটি তৈরির কাজ শুরু হয়, যা শেষ হলে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভবনটির উদ্বোধন করেন।

 


Top