অপারেশন সার্চলাইট : পাখির চোখে দেখা | daily-sun.com

অপারেশন সার্চলাইট : পাখির চোখে দেখা

আবদুল্লাহ আল মোহন     ২৫ মার্চ, ২০১৮ ২২:০৮ টাprinter

অপারেশন সার্চলাইট : পাখির চোখে দেখা



১.
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন ভয়ানক রাত আগে কখনো আসেনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত।

পাকিস্তানে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মুক্তিকামী বাঙালিদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনী যে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে সামরিক কর্তৃপক্ষ একে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে অভিহিত করে। এ অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলিতে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনে হত্যা, সামরিক আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্রাগার, রেডিও ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখলসহ প্রদেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে প্রদেশে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় ২৫ মার্চ রাত সাড়ে এগারটা থেকে মধ্য মে পর্যন্ত বড় বড় শহরে অভিযান পরিচালিত হয়। শুরু হলো বাঙালি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এক পরিকল্পিত সামরিক অভিযান, যার নাম অপারেশন সার্চলাইট। একই সঙ্গে সূচনা হয় বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় কালরাত। এ রাতের মধ্য দিয়েই শুরু হয় আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এ রাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক অভিযানে পাকিবাহিনী নির্বিচারে এদেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পথের শিশুরাও। উল্লেখ্য যে, দেশি বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে ওই রাতে শুধু ঢাকায় ৭ হাজার বাঙালি নিহত হয়।  

 


২.
অপারেশন সার্চলাইটকে নিছক বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের একটি সামরিক চেষ্টা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ, দেশজুড়ে সে সময় চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। সবার মুখে কেবল একটিই স্লোগান ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা যমুনা মেঘনা’ এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। ’ প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল এক ভয়াল গণহত্যার নীলনকশা, গোপনে গোপনে যার প্রস্তুতি চলছিল অনেক আগে থেকেই। পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের মনে বাঙালিরা সব সময়ই ছিল নীচু শ্রেণির, যাঁদের ভাষা-সংস্কৃতি থেকে জীবনাচরণ—সবই ছিল ‘অপাকিস্তানি’। অখণ্ড পাকিস্তানের নামে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী সেই অপাকিস্তানিদের ‘শুদ্ধ’ করার জন্য অপারেশন সার্চলাইট শুরু করেছিল। যার ফলে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয় বাংলাদেশে। অপারেশন সার্চলাইটের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বেশ আগেই, একাত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক রবার্ট পেইনের ম্যাসাকার বইতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এক সামরিক বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের খতম করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সেনা বৈঠকে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘ওদের ৩০ লাখ মেরে ফেলো। বাদবাকিরা আমাদের হাত থেকেই খেয়ে বেঁচে থাকবে (কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম, অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস)। ’

 


৩.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে বাংলাদেশের গণহত্যাকে অন্যতম ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী আর জে রুমেল। তিনি তাঁর ডেথ বাই গভর্নমেন্টস বইতে লিখেছেন, ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী আধা সামরিক বাহিনীগুলো প্রতি ২৫ জন বাঙালির একজনকে হত্যা করেছে। যার সবচেয়ে কদর্য ও কুৎসিত চেহারা দেখা গেছে একাত্তরের ২৬৭ দিনে। নয় মাসব্যাপী গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের অর্ধেকই ছিলেন নারী। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য নারী পাকিস্তানি সেনা ও সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের ধর্ষণের শিকার হন। গবেষক সুসান ব্রাউনমিলার অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন-উইমেন অ্যান্ড রেপ বইতে লিখেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আট বছরের শিশু থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাকে পর্যন্ত বর্বরভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

 


৪.
‘অপারেশন সার্চলাইটের’ মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, নিউমার্কেট, ঠাটারি বাজার, পুরান ঢাকা, ফরাশগঞ্জ, বিকে দাস লেন, শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার, ভোলা গিরি আশ্রম, অভয়দাশ লেন, টিকাটুলি, হাটখোলা, আরকে মিশন রোড, গেন্ডারিয়া সাধনা ঔষধালয়সহ বিভিন্ন এলাকা। সংবাদপত্র অফিসের মধ্যে লক্ষ্য ছিল ‘পিপলস অফিস, ইত্তেফাক ও সংবাদ। ’ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সে রাতে পাকিস্তানিরা কমপক্ষে ১০ হাজার সাধারণ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। যার মধ্যে ছিল রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের ৫ শতাধিক পুলিশ ও ৩ শতাধিক নিরীহ শিক্ষার্থী। মধ্যরাতে পাকি ট্যাঙ্কগুলো কামান উঁচিয়ে ঢুকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সঙ্গে লরি বোঝাই সৈন্য। প্রথমে তারা গুলি চালায় ইকবাল হলে। এতে মারা যান শতাধিক ছাত্র। এরপর জগন্নাথ হলে ঢুকে সাব-মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে আরো দেড় শতাধিক ছাত্র-শিক্ষককে। রোকেয়া হলও আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি। গুলি চালিয়ে তারা হত্যা করে অনেক ছাত্রীকে। কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচায়। মেডিক্যাল কলেজ এবং হোস্টেলেও গুলি করে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে হায়েনার দল।

 


৫.
এসব ঘটনা যখন ঘটে ছিল, তখন সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাঙ্ক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে। তারা বাসার সামনে আসার পর একজন অফিসার ইংরেজিতে বলেন, ‘শেখ, আপনি নেমে আসুন। ’ বঙ্গবন্ধু তার বেলকনিতে বেরিয়ে এসে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত, তবে গুলি ছোঁড়ার দরকার ছিলো না। আপনারা আমাকে টেলিফোন করে তারপর আসতে পারতেন। ’ এরপর অফিসারটি ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘আপনাকে গ্রেফতার করা হলো। ’ ভোর ৫টার পর পাকিবাহিনী গোলার আঘাতে উড়িয়ে দেয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা যেন এক নিস্তব্ধ নগরীতে রূপ নেয়। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ চলতে থাকে স্বজনের কান্নার মিছিল।

 


৬.
অপারেশন সার্চলাইট অভিযান শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল ২৬ মার্চ রাত ১টা। কিন্তু ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল না পেয়ে সবাইকে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য তৈরি হওয়ার আহবান জানান। সে রাতেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী বাঙালি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ও এ.এ.কে নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালেক মন্তব্য করেছেন যে, বাঙালি বিদ্রোহীদের প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টির আগেই পাকিস্তান বাহিনী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পৌঁছার লক্ষ্যে অভিযান এগিয়ে ২৫ মার্চ রাত ১১-৩০ মিনিটে শুরু হয়। অবশ্য ৫ আগস্ট প্রকাশিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চ ভোরে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। শ্বেতপত্রে উল্লেখিত এ তথ্যকেও অভিযান এগিয়ে আনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

 

 
৭.
পাকিস্তান বাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং ৫৭ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খান ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি সামরিক অভিযানের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। ১৭ মার্চ চীফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খানের নির্দেশে জেনারেল রাজা পরদিন ঢাকা সেনানিবাসে জিওসি অফিসে অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। পাঁচ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনাটি রাও ফরমান আলী নিজ হাতে লিখেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২৪-২৫ মার্চ জেনারেল হামিদ, জেনারেল এ. ও মিঠঠি, কর্নেল সাদউল্লাহ হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন সেনানিবাসে প্রস্ত্ততি পরিদর্শন করেন। সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ মার্চ রাত ১টায় অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় অভিযানে ঢাকায় নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দিবেন জেনারেল খাদিম রাজা। লে. জেনারেল টিক্কা খান ৩১ ফিল্ড কমান্ডে উপস্থিত থেকে অপারেশনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ছাড়া এ অভিযানকে সফল করার জন্য ইতোমধ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের দু’জন ঘনিষ্ঠ অফিসার মেজর জেনারেল ইখতেখার জানজুয়া ও মেজর জেনারেল এ.ও মিঠঠিকে ঢাকায় আনা হয়।  

 


৮.
অপারেশন সার্চলাইটের আওতায় নিম্নোক্ত পরিকল্পনা নেয়া হয়: 
১. একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু হবে।  
২. সর্বাধিক সংখ্যক রাজনীতিক ও ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার চরমপন্থীদের গ্রেফতার করতে হবে।  
৩. ঢাকার অপারেশনকে শতকরা ১০০ ভাগ সফল করতে হবে। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে হবে।  
৪. সেনানিবাসের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।  
৫. যাবতীয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রেডিও, টিভি, টেলিপ্রিন্টার সার্ভিস, বৈদেশিক কনস্যুলেটসমূহের ট্রান্সমিটার বন্ধ করে দিতে হবে।  
৬. ইপিআর সৈনিকদের নিরস্ত্র করে তদস্থলে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের অস্ত্রাগার পাহারায় নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের হাতে অস্ত্রগারের কর্তৃত্ব দিতে হবে।  
৭. প্রথম পর্যায়ে এ অপারেশনের এলাকা হিসেবে ঢাকা খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটকে চিহ্নিত করা হবে। চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রংপুর ও কুমিল্লায় প্রয়োজনে বিমানযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।  

 


৯.
অপারেশন সার্চলাইটে ঢাকা শহরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রাধান্য দিয়ে পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়: 
১. পিলখানায় অবস্থিত ২২নং বালুচ রেজিমেন্ট বিদ্রোহী ৫ হাজার বাঙালি ইপিআর সেনাকে নিরস্ত্র করবে এবং তাদের বেতার কেন্দ্র দখল করবে।  
২. আওয়ামী লীগের মুখ্য সশস্ত্র শক্তির উৎস রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এক হাজার বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করবে।  
৩. ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট শহরের হিন্দু অধ্যুষিত নবাবপুর ও পুরনো ঢাকা এলাকায় আক্রমণ চালাবে।  
৪. ২২নং বালুচ, ১৮ ও ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বাছাই করা একদল সৈন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (জহরুল হক হল), জগন্নাথ হল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াকত হল আক্রমণ করবে।  
৫. বিশেষ সার্ভিস গ্রুপের এক প্লাটুন কমান্ডো সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ ও তাঁকে গ্রেফতার করবে।  
৬. ফিল্ড রেজিমেন্ট দ্বিতীয় রাজধানী ও সংশ্লিষ্ট বসতি (মোহাম্মদপুর-মিরপুর) নিয়ন্ত্রণে রাখবে।  
৭. শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশে এম ২৪ ট্যাংকের একটি ছোট্ট স্কোয়াড্রন আগেই রাস্তায় নামবে এবং প্রয়োজনে গোলা বর্ষণ করবে।  
৮. উপর্যুক্ত সৈন্যরা রাস্তায় যেকোন প্রতিরোধ ধ্বংস করবে এবং তালিকাভুক্ত রাজনীতিবিদদের বাড়িতে অভিযান চালাবে।  

 


১০.
পাকিস্তান সৈন্যরা ১১.৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে ফার্মগেটে মিছিলরত বাঙালিদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা ঘটায়। এরপর পরিকল্পনা মোতাবেক একযোগে পিলখানা, রাজারবাগে আক্রমণ চালায়। রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হলসহ শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে ৯ জন শিক্ষকসহ বহু ছাত্রকে হত্যা করে। একই পরিকল্পনার আওতায় পুরনো ঢাকা, তেজগাঁও, ইন্দিরা রোড, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ঢাকা বিমানবন্দর, গণকটুলী, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান প্রভৃতি স্থানে আক্রমণ চালায়। এ রাতে চট্টগ্রামে পাক সেনাদের গুলিতে অনেকে হতাহত হয়। মার্চ মাসের মধ্যেই অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনায় সেনানিবাসকে কেন্দ্র করে পাকবাহিনী তান্ডব চালায়। এ ছাড়া বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে সমর্থনের কারণে ইত্তেফাক, সংবাদ ও দি পিপলস অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। বহু সংবাদকর্মী আগুনে পুড়ে মারা যান।  

 


১১.
এত ভয়াবহ ও গণবিধ্বংসী গণহত্যা খুব কম দেশেই হয়েছে। এত কম সময়ে এত বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়তো আর কোনো দেশে হয়নি। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় ইপিআর সদস্য বাঙালি জওয়ানেরা। এ অভিযানের আরও উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, টেলিগ্রাফসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ধ্বংস করে দেওয়া, আওয়ামী লীগ এবং এর ছাত্রসংগঠনসহ সর্বোচ্চ সংখ্যায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা করা, ঢাকাকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা প্রভৃতি। এসব উদ্দেশ্য সফল করার জন্য পাকিস্তানিরা ওই রাতে মেশিনগানকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। রবার্ট পেইনের মতে, অভিযানের প্রথম রাতে শুধু ঢাকা শহরেই ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর গণহত্যা চলতে থাকে শহর পেরিয়ে গ্রামে।

 


১২.
অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম পর্যায় শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং একই সঙ্গে আক্রমণ চালানো হয় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটে। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলা এ সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। দেশের এমন কোনো স্থান ছিল না, যেখানে বাঙালি নিধন করে পাকিস্তানি সেনারা লাশ নদীতে ভাসায়নি বা গণকবর দেয়নি। এর মধ্যে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে সম্ভবত সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে। একাত্তরের ২০ মে চুকনগরে এক দিনে প্রায় সাত থেকে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। এ ছাড়া রংপুরের ঝাড়ুয়ার বিল, পাবনার ঈশ্বরদী, খুলনার প্লাটিনাম জুটমিল, গাইবান্ধার বোনারপাড়া, ঢাকার রায়েরবাজার ও মিরপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। আর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের অব্যাবহিত পূর্বে ঢাকার মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র পরিণত হয়েছিল বুদ্ধিজীবী নির্যাতন কেন্দ্রে। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে সেখানে নির্যাতন করত পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী আলবদররা, আর পরে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হতো।

 

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়াসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

 

 লেখকঃ আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারি অধ্যাপক  

সরকারি ভাষাণটেক কলেজ, কাফরুল, ঢাকা


Top