রিমু, আমি আর আমরা | daily-sun.com

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত রিমু, বিপাশা ও অনিরুদ্ধের স্মরণে (পরের অংশ)

রিমু, আমি আর আমরা

আবদুল্লাহ আল মোহন     ২০ মার্চ, ২০১৮ ১৮:০৩ টাprinter

রিমু, আমি আর আমরা



১.
বিষাদের চিতা জ্বালানো ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডু’র ত্রিভুবনের তিনটি উড়ে যাওয়া প্রিয় পরাণ পাখিসহ অন্যরাও মাটির দেখা পাবে আজ। আজ রাতেই শেষ যাত্রা রিমুদের পৈতৃক শিকড় নোয়াখালির সোনাইমুড়ি উপজেলার কেশারখিল গ্রামের বাড়িতে।

যেখানকার মাটিতে রিমুর পিতার কবরের পাশে ওরা তিনজন চিরদিনের জন্য শায়িত থাকবে। আর বেঁচে থাকবে ভালোবাসার মানুষের হৃদয়ের মাঝে অনন্তকাল। এত তাড়াতাড়ি, বড় অসময়ে স্বজনদের বিদায় জানাতে হবে, ভাবা যায়? ভাবনারা আসছে, তবুও মনে আসছে-ভাসছে বিক্ষিপ্ত নানা চিন্তার মেঘমালা। বন্ধু রিমুর সপরিবারে অকালমৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত আমরা। আমাদের ভালোবাসার মানুষ, যাদের আমরা হারিয়েছি সেই তারা আসলে বেঁচেই আছে কারণ যে ভালোবাসা আমাদের একাত্ম করেছে তা তো চিরঞ্জীব। রিমু (রফিক জামান), বিপাশা (সানজিদা হক ) আর ওদের স্বপ্ন অনিরুদ্ধ জামান- তোরা যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস রে …। দেখা হবে নিশ্চয় মহাকালের পথের ধারে, অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে।


২.
বিষাদগ্রস্তজনের একান্ত মনে প্রশ্ন জাগে, মৃত্যুর কী মড়ক লেগেছে দেশে? একের পর এক প্রিয় মানুষগুলো মারা যাচ্ছেন! দেশে, পরিবারে একের পর এক প্রিয় মানুষজন মারা যাচ্ছেন, চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে, আর স্মরণাঞ্জলি লিখে যাচ্ছি একের পর এক! যেন হয়ে যাচ্ছি নিয়মিত একজন দু:খভারাক্রান্ত স্মৃতির বিষাদ কথকে। অথচ প্রতিদিন কত প্রিয় বিষয়েই না লেখার আরও অনেক কিছু আছে- থাকে।

প্রয়াত প্রিয়জনের জন্য শোকগাঁথা অথবা শ্রদ্ধাঞ্জলি লেখার দায় কী এড়ানো যায়! এ তো দায়িত্বও মনে হয়। কারণ মনে করি সহানুভূতির নামই জীবন। সহানুভূতি নেই, না হলে সহাবস্থান নেই। যতই বলুন, কাউকে না ভালোবাসলে বাঁচা যায় না। নজরুল লিখছেন কত বছর আগে :'মানুষ মাত্রেই চায় তার বেদনায় সহানুভূতি, তা নইলে তার জীবনভরা ব্যথার ভার নেহাত অসহ্য হয়ে পড়ে যে! দরদি বন্ধুর কাছে তার দুঃখের কথা কয়ে আর তার একটু সজল সহানুভূতি আকর্ষণ করে যেন তার ভারাক্রান্ত হূদয় লঘু হয়। '


৩.
কার রচনায় যেন পড়েছিলাম, প্রতিটি মানুষই তার জন্মমুহূর্তে ঈশ্বরের থেকে একটি ফতোয়া উপহার পেয়ে থাকেন। আর সেটি হল মৃত্যুর উপহার, মৃত্যুর সরবত পানের উপহার। আমৃত্যু মানুষ সরবত পানের এই ফতোয়া কাঁধে নিয়েই এগিয়ে চলে, মৃত্যুতৃষা থাক আর না থাক। উল্লাসে-প্রেমে-বিচ্ছেদে-প্রতিশোধে-ঈর্ষায়-আনন্দে-বেদনায়-সংরক্ত সেই চলার সঙ্গে সঙ্গে গুঁড়ি মেরে থাকা ওই ফতোয়াটিও চলে। মনে প্রশ্ন জাগে, মৃত্যুর সঙ্গে মানুষকে যদি পদচারণা করতেই হয় তবে জীবনের উপযোগী সময় কোনটি? ফ্রয়েড বাণী দিয়েছেন সকল প্রাণীই একসময় প্রাণহীন ছিল। জীবনের অবসান অর্থ মৃত্যু। মৃত্যু এক অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন সম্রাজ্ঞী যিনি একাধারে আমাদের পূর্বসূরী এবং উত্তরসূরী। মাঝে মাঝে সে রহস্যময় ঘোমটার আড়াল থেকে মৃত্যু তার মুখ দেখায়। আমরা তখন ততটা বুঝি না। অবশেষে একদিন সেই ভয়ঙ্কর রাতটি আসে যখন আমরা এই ধোঁয়া-ধুলো-নক্ষত্র পরিকীর্ণ পৃথিবীতে শেষ বারের মতো পা রাখি। রিমুরা সেটাই জানান দিয়ে গেলো।


৪.
রিমু বেড়ে উঠেছে প্রগতির কোলে, চিন্তা করতে শিখেছে আধুনিক মানুষের সান্নিধ্যে থেকে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা কলেজ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির আলোয়। প্রগতি মনস্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার এই আকালে রিমু ছিলো উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। মতবাদ আসক্তিতে অন্ধজন বৃদ্ধির মহামারিকালে, প্রযুক্তি প্রাধান্য বিশ্বের জঙ্গিবাদী চিন্তাধারা সক্রিয় হয়ে ওঠার কালে রিমু ভাবতে শিখেছিলো মানবিক পৃথিবীর কথা, চেতনায় ধারণ করতো সমাজ কল্যাণ, ফলে নিরলসভাবে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেছিলো প্রতিবন্ধিদের কল্যাণ কাজে । এভাবেই রিমুর সাধনার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলো Protibondhi Nagorik Shangathaner Parishad – PNSP.


৫.
রিমু-বিপাশাদের দাম্পত্য ছিলো ভালোবাসার জারক রসে প্লাবিত। ফলে ঘরে-বাইরের সর্বত্রই ওদের কাজে-কথায় অপ্রীতির বেদনা গীতি ছিলো না, ছিলো আনন্দ ভৈরবী সুর। যে ভালোবাসার আলো রিমু,বিপাশা-অনিরুদ্ধরা জ্বালিয়ে গেছে তারই উজ্জ্বলতায় রিমু-বিপাশাদের আমাদের মনে থাকবে। তারা বেঁচে থাকবে স্বজন-বান্ধবদের স্মৃতিতে। কারণ আমরা জানি, কিছু মানুষের স্মৃতি বেঁচে থাকা মানুষের মস্তিষ্ককোষে থেকে যায়, কখনো কখনো প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গ মুহূর্তে জেগে ওঠে তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা, অপ্রাপ্তির ইতিবৃত্ত।


৬.
রিমুদের মৃত্যৃ মেনে নিতে পারি না বলেই ‘মরণ’ কামড় দিয়ে ভাবতে হয় ‘মৃত্যু’কে নিয়েই। রিমু জানতো, আমাদের সাথেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাঠ নিয়েছিলো আমাদের প্রিয় গ্রন্থ ‘ম্যাক্সিম’। ফরাসি মহাজ্ঞানী লা রোশফুকো যেখানে লিখেছিলেন, মৃত্যুর চেয়ে মৃত্যুর ভয় ভয়ংকর। আমরা কেন্দ্রের আমতলায়, ছাদে কতই না তর্কে-আলোচনায় মেতে উঠতাম মৃত্যুর মতোন আরো অনেক বিষয় নিয়ে। সেইসব আড্ডার স্মৃতিতে ভেসে আসে নানান কথোপকথন, খাপছাড়া কথামালা। আমাদের আলোচনায় উঠে আসতো যেমন, মৃত্যু আসলে অনাদি-অনন্ত সময় নামক আত্মায় মিশে যাওয়া। তেমনি শাস্ত্রকাহিনিও স্মরণে আসে বারেবারে, ঘুরেফিরে। আমরা জেনেছিলাম, মহাভারতে মৃত্যু হল ইহলোক ও পরলোকের সেতু। মহাভারতে মৃত্যু হলেন এক জন অধিদেবতা, তিনি নারী। মৃত্যুর জন্ম আছে। তিনি ব্রহ্মার ক্রোধ থেকে জন্মেছেন। সেই ক্রোধে সৃষ্ট ভয়ংকর কিংবা ‘শ্যাম সমান’ মৃত্যু আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে গানের বেদনা বানী, সুরের বিরহী ধারাপাত। অতুলপ্রসাদের গানের বাণী মনে আসে-বেদনার সুর ভাসে- ‘ক্রন্দসী পথচারিণী,/ তুমি কোথা যাও তুমি কারে চাও?/ যে ব্যথা তব অন্তরে ও বিষাদিনী,/ মোরে বলে যাও। /বন্ধুর পথ জান না, বন্ধুর পথ অজানা। /বলো পথিকে কত শুধাবে ‘কোথা গেছে সে/ মোরে বলে দাও’?/ সংকটময় ভুবনে ভ্রমিবে একা কেমনে?/ কোন চঞ্চল তাড়নে বঞ্চিলে নিজ ভবনে?/ এসো গো মম অঙ্গনে এসো গো গো মম অঙ্গনে;/ দেখো তল্লাসি এই অন্তরে, তুমি যারে চাও/ যদি তারে পাও । ’


৭.

যক্ষের প্রশ্নটি ছিল, 'জগতের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি কী'? এর উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, 'প্রাণিকুল প্রতিদিন যমালয়ে যাচ্ছে। তা দেখেও মানুষ চিরজীবী হবার অভিলাষ পোষণ করে। জগতে এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কী হতে পারে?’ সেই পরমাশ্চর্যের, বিস্ময়ের বিষয়ই- মৃত্যু। আমাদের প্রিয়জনদের মর্মান্তিক মুত্যৃ কেবলই কাঁদাচ্ছে কারণ প্রতিনিয়তই তাদেরকে আমরা ভীষণভাবে অনুভব করছি। মাথার মধ্যে বার বার ভীড় করছে নানা স্মৃতি। স্মৃতিচারণকালে, সেসব কথা লিখতে বসে অবধারিত মৃত্যু সম্পর্কে হাছন রাজার গানের বাণীতে মন চলে যায়, ‘মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে/ কাঁন্দে হাছন রাজার মন ময়না রে/ পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছট্ ফট্ করে/ মজবুদ ও পিঞ্জিরা ময়নায়/ ভাঙ্গিঁতে না পারে রে/ কাঁন্দে হাছন রাজার মন ময়না রে...। ’ মানতে কষ্ট হয় রবি কবির বাণীও, ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু …’। উপনিষদ শ্লোকও মনে আসে, গোপনে ভাসে, ‘অসতোমা সদগময়, তমসোমা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতমগময়, ওম শান্তি শান্তি শান্তি৷’ (‘আমাকে অজ্ঞতা থেকে সত্যের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, মৃত্যু থেকে অমরত্বের দিকে নিয়ে চলো৷ সমগ্র জীব জগতের জন্য শান্তি বিরাজ করুক৷’)। আর তাই বড্ড অকালে, অসময়ে আমাদের ছেড়ে রিমুদের চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় বলেই মনে করি। শ্রীজাতের কাব্যভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, ‘মৃত্যু তবু মিথ্যে হোক’। রিমুদের মৃত্যু কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না। রিমুদের অকাল প্রয়াণ আমাদের কাতর করে,তীব্রভাবে বিষন্ন করে। তুই, তোরা ভাল থাকিস বন্ধু রিমু, প্রিয় বিপাশা, প্রিয় অনিরুদ্ধ। দেখা হবে আবার …

 

 

লেখকঃ  আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারি অধ্যাপক

সরকারি ভাষাণটেক কলেজ, কাফরুল, ঢাকা

 


Top