রিমু, আমি আর আমরা | daily-sun.com

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত রিমু, বিপাশা ও অনিরুদ্ধের স্মরণে

রিমু, আমি আর আমরা

আবদুল্লাহ আল মোহন     ১৯ মার্চ, ২০১৮ ১৫:১৬ টাprinter

 রিমু, আমি আর আমরা



১.
বিপাশা আমার বন্ধু রিমুর বউ হলেও আমাদের সম্পর্কটা ছিলো ভাই-বোনের মতোন। রিমুদের বাড়িরই একজন সদস্য হিসেবে বিবেচিত করতো বিপাশা আমাকে। রিমুর সাথে দেখা নিয়মিত না হলেও রিমুদের পরিবারের সকলের খবারাখবর নিয়মিত পেতাম, তারাও আমার খোঁজ নিতেন বিপাশার মাধ্যমে। আর তাই বিপাশার কর্মস্থল হাঙ্গার প্রজেক্টে গেলে ভাইয়ের প্রীতিই পেতাম সবসময়। আমিও কখনো বিপাশাকে ‘ভাবি’ বলেছি বলে মনে পড়ে না। তবে তুমি না বলে রিমুর প্রতি সম্মান জানিয়ে সবসময় ‘আপনি’ করেই বলেছি বিপাশাকে, নাম ধরে ডাকলেও। এমনই সম্প্রীতির জালে আটকে ছিলাম আমরা। দেবর-ভাবির রসে-বশে থাকার সরসতা উপভোগ করা হয়ে ওঠেনি আমাদের তাই।

 


২.
হাঙ্গার প্রজেক্টে আমার প্রশিকার প্রাক্তন সহকর্মী ও প্রিয় মানুষ জমির ভাই ও বন্ধু তনুজার টানে প্রায়ই যেতাম আমার বাসার পাশেই অফিস ছিলো বলে । তাছাড়া হাঙ্গার প্রজেক্টের ও সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) হয়েও বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রশিক্ষক হিসেবে মাঝে মাঝে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতাম। আমার ভাসানটেক সরকারি কলেজের মঙ্গল আসরের জন্যও জাতীয় নারী নীতিসহ নানাবিধ পোস্টার-লিটারেচার-বই-পত্র শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে বিতরণের জন্য সংগ্রহ করতেও যেতে হতো।

হাঙ্গার প্রজেক্ট অফিসের সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেতাম। একজন না থাকলে আরেকজন হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। এক্ষেত্রে বিপাশার ভূমিকা থাকতো সবসময়ই অগ্রণী। বন্ধু তনুজার কাছ থেকে আমার জন্য নিয়মিত ‘বিশেষ বরাদ্দ’ সংগ্রহ করতে ভুল করতাম না কিন্তু তনুজা অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে থাকলে আমার সেই ‘লস’ পুষিয়ে দিতে বিপাশা উৎসাহ দেখাতো, ভূমিকা পালন করতে আগ্রহ প্রকাশ করতো আমার পাওনার বিষয়টি জানতো বলে। কিন্তু বন্ধুর কাছ থেকে প্রাপ্য অধিকার সুদাসলে আদায় করা ‘ফরজ’ হলেও স্নেহধন্য বোনের নিকট থেকে সেই উপহার গ্রহণ ছিলো ‘নাজায়েজ’। আহারে সেই লেন-দেনের কথোপকথন মধুর স্মৃতি ভুলি কী করে বিপাশা, প্রিয় বোনটি আমার ?

 


৩.
বিপাশার হাঙ্গার প্রজেক্ট আর আমার বাসা দুটোই আসাদ এভিনিউতে হওয়ায় প্রায়ই আমাদের রাস্তাতেও দেখা হতো। আমি হয়ত সকালে কলেজে যাবার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছি তখন যেমন বিপাশার সাথে দেখা হয়েছে তেমনি কলেজ থেকে ফেরার পথেও কতবারই না হাসি বিনিময় করেছি আমরা। আর কুশলাদি তো ছিলোই। মাঝে-মধ্যেটাউন হলের শওকত তেহারি ঘরে বিপাশা অফিসের অনেকের সাথে দলবেধে খেতে আসতো আর আমার আড্ডাস্থল ছিলো সেটারই সামনে শাহীনের চায়ের দোকান, দু’জায়গাতেই আমাদের দেখা হতো, কথা হতো। আজো আমার নিত্য পদচারণা টাউন হলে, বসবাস আসাদ এভিনিউতে, কিন্তু বিপাশার সাথে এই পথে, আসা-যাওয়ার পথের মাঝে ইশারা ভাষাতেও কথা হবে না, তা কী হয়, না হতে আছে? আহারে বোন আমার, আর হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতোন চিত্ত ঝলমল করা তোর আর দেখা পাবো না এমনটি হয় নাকি? না, আমি আর ভাবতেই পারছি ? কেন চলে গেলি রে বোনটি আমার এভাবে বড্ড অসময়ে, অকালে, আকস্মিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রিয়জন রিমু, অনিরুদ্ধকে সঙ্গের সাথী করে ?

 


৪.
ফিরে ফিরে আসে স্মৃতির পাখিরা। আমি ছড়িয়ে গিয়ে জড়িয়ে থাকা অশেষ স্মৃতির ঘোরে আক্রান্ত থাকি, নিরব-নিথর থাকি। অতীতের শিহরণ ঘোর আমার আর যে কাটে না, কাটছে না আমাদের, রিমু আর বিপাশার বন্ধু-স্বজনদেরও যেমনটি। ঘরে, ঘরের বাইরেও রিমু, বিপাশা আর অনিরুদ্ধ আমাকে টানে বলেই চরম সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার পরেও সকল নিয়ে বসে থাকি ‘অপার হয়ে’ পারাপারের অপেক্ষায় … ।

 

 

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারি অধ্যাপক

সরকারি ভাষাণটেক কলেজ, কাফরুল, ঢাকা


Top