উচ্চ আদালতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা: মওদুদ | daily-sun.com

উচ্চ আদালতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা: মওদুদ

ডেইলি সান অনলাইন     ১৯ মার্চ, ২০১৮ ১১:২৩ টাprinter

উচ্চ আদালতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা: মওদুদ

- ফাইল ফটো

 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত এবং কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিতাদেশকে উচ্চ আদালতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘আগে নিম্ন আদালত গ্রাস করা হয়েছিল, এখন উচ্চ আদালত গ্রাস করা হচ্ছে।


সোমবার (১৯ মার্চ) সাড়ে ৯ টার দিকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের দেয়া জামিনের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল গ্রহণ করে জামিন আদেশ আগামী ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে এ মামলার সব পক্ষকে আপিল শুনানির জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেয়ার নির্দেশ দেন।

 

এ আদেশের পরপরই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মওদুদ আহমদ এ মন্তব্য করেন।  


তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত কী হয় সেটা দেখার বিষয়। আমরা যেহেতু এখন আইনি লড়াই চালাচ্ছি সেহেতু রাজপথেও আন্দোলন করতে পারব না। ’

 

আদালত প্রথমে আদেশে বলেছিলেন, ২২ মে পর্যন্ত খালেদার জামিন স্থগিত। সে অনুযায়ী টেলিভিশনগুলো স্ক্রলও দেয়, খবর আসে অনলাইন গণমাধ্যমগুলোতে। কিছুক্ষণ পর আদালত আদেশ ‘মোডিফাই’ করে ৮ মে পর্যন্ত জামিন স্থগিত করেন।


আদালতে আজ খালেদার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার রফিকুল হক, দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশিদ আলম।


এর আগে গতকাল রবিবার (১৮ মার্চ) খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা পৃথক দুটি নিয়মিত আপিল আবেদনের (লিভ টু আপিল) শুনানি শেষে আদেশ দেয়ার জন্যে আজকের দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।   


আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এজে মোহাম্মদ আলী।

 

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (১৫ মার্চ) সকালে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিভ টু আপিল দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক। এর আগে বুধবার (১৪ মার্চ) খালেদা জিয়ার হাইকোর্টের দেওয়া চার মাসের জামিন রবিবার পর্যন্ত স্থগিত করে লিভ টু আপিল দায়েরের জন্য দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।


এর আগে সোমবার (১২ মার্চ) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে চার গ্রাইন্ডে (যুক্তি) চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তার জামিনের আদেশ দেন।


হাইকোর্টের দেওয়া ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে গত মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) চেম্বার আদালতে আবেদন করেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ‘নো অর্ডার’ দিয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। এরপর বুধবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এর ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।  


অপরদিকে জামিন আদেশের দিনই (সোমবার, ১২ মার্চ) কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ৮ যাত্রী হত্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশসহ ২৮ মার্চ তাকে আদালতে হাজির রাখতে নির্দেশ (পি.ডব্লিউ) দিয়েছেন কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুস্তাইন বিল্লাহ।


উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় অপর একটি মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।   গত বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ এবং দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।


রায়ের পর পরই খালেদা জিয়াকে আদালতের পাশে নাজিমউদ্দিন রোডের ২২৮ বছরের পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্জন এই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে গত ৪০দিন ধরে কারাভোগ করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।


শুরুতে খালেদা জিয়া ডিভিশন না পেলেও পরে আদালতের নির্দেশ ১১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়া হয়। ওদিনই তার সঙ্গে গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগমকেও রাখার নির্দেশনা দেন আদালত।


১৯ ফেব্রুযারি সোমবার বিকেলে রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিচারক রায়ের কপি সত্যায়ন করার পর এটি খালেদার আইনজীবীদের হাতে তুলে দেন বিশেষ জজ আদালত-৫ এর পেশকার মোকাররম হোসেন।


পরের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়াকে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিতে দ্বিতীয় দফায় সুপ্রিম কোর্ট বারের কনফারেন্স রুমে বৈঠক করেন তার আইনজীবীরা।


২২ ফেব্রুযারি খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আপিল গ্রহণ করে বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়াকে করা অর্থদণ্ড স্থগিতের আদেশ দেন।


একই সঙ্গে এ মামলায় বিচারিক আদালতের সকল নথি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর জামিন আবেদন শুনানির জন্য নতুন দিন ঠিক করে দেন আদালত।


খালেদা জিয়ার করা জামিন আবেদনের ওপর ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানি হয়। নিম্ন আদালতের নথি আসার পরে এ বিষয়ে আদেশ দেয়া হবে বলে জানান হাইকোর্ট। ফলে খালেদা জিয়ার জামিনের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়।


এদিকে খালেদার মুক্তির দাবিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পাঁচ দফায় বিক্ষোভ সমাবেশে, মানববন্ধন, অবস্থান, গণঅনশন, গণস্বাক্ষর অভিযান, স্মারকলিপি পেশ, কালো পতাকা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। এরমধ্যে পঞ্চম দফায় দুই দিনের কর্মসূচিতে গত ৬ মার্চ মঙ্গলবার সারা দেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বিএপি। ওই দিন কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক ঘণ্টার মানববন্ধন কর্মসূচিতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া দেশের মানুষের গণতন্ত্র ও কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার আন্দোলন করছেন। আর সে জন্য তাকে ছলচাতুরী করে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছে সরকার। তিনি আরও বলেন, এখন তাঁর জামিন দিতেও সরকার গড়িমসি করছে।


এরপর ৮ মার্চ সারা দেশে এক ঘন্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দলটির অবস্থান কর্মসূচি থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি দিদারুল রাজকে পুলিশ আটক করে এবং লাঠিচার্জ করে দলটির নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে পণ্ড হয়ে যায় ওই দিনের কর্মসূচি।  


এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের কর্মসূচি পালন করতে না পেরে ২৪ ফেব্রুয়ারি কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। কিন্তু পুলিশি বাধায় তাদের ওই দিনের কর্মসূচিও পণ্ড হয়ে যায়। আটক হন দলের অনেক নেতাকর্মী। অন্যদিকে মঙ্গলবার (৬ মার্চ) মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে যাওয়ার পথে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।


এদিকে ১২ মার্চ আবারও রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকারের কাছে লিখিত অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই আবেদনেও সাড়া মেলেনি।


এরপর ১৯ মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম, ২৪ মার্চ বরিশাল এবং ৩১ মার্চ রাজশাহীতে জনসভা করার কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। সোমবার (১২ মার্চ) সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

আরও পড়ুন:

 

খালেদার জামিন ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত

 

খালেদার জামিনের বিরুদ্ধে দুদকের লিভ টু আপিল

 

খালেদা জিয়ার জামিন রবিবার পর্যন্ত স্থগিত

 

চেম্বারেও খালেদার জামিন বহাল, পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি কাল

 

খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত চেয়ে দুদকের আবেদন

 

খালেদা জিয়ার জামিনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার আপিল

 

যে চার গ্রাউন্ডে জামিন পেলেন খালেদা জিয়া

 

জামিন পেলেন খালেদা জিয়া

 

 


Top