মালদ্বীপ সঙ্কট এবং চীন-ভারতের দাবা খেলা | daily-sun.com

মালদ্বীপ সঙ্কট এবং চীন-ভারতের দাবা খেলা

ডেইলি সান অনলাইন     ১৮ মার্চ, ২০১৮ ১৩:৩১ টাprinter

মালদ্বীপ সঙ্কট এবং চীন-ভারতের দাবা খেলা

 

মালদ্বীপের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের শুরু হয় ৬ ফেব্রুয়ারি। প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লা ইয়ামিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং সাবেক প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার নির্দেশ দেয়া এবং জরুরি অবস্থা জারির পর এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সঙ্কটটাকে হয়তো সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর আরও ব্যাপক ভূরাজনৈতিক শাখাপ্রশাখা রয়েছে, এবং এটা ভারত ও চীনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে গিয়ে ঠেকেছে।


এই সঙ্কটের গোড়া খুঁজতে গেলে ২০১৩তে ফিরে তাকাতে হবে। ইয়ামিন সে সময় একটা ক্যু সাজান এবং দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন। সেই থেকে নাশিদ শ্রীলংকায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। গত মাসে ইয়ামিন জরুরি অবস্থা জারির পরপরই নাশিদ ভারতের সাথে যোগাযোগ করেন এবং সঙ্কট সমাধানের জন্য ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


ভারত সরকার ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করে এবং পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ধারাবাহিক কয়েকটি বিবৃতি দেয়, যেগুলো উদ্ধতভাবে প্রত্যাখ্যান করে মালদ্বীপ। হোয়াইট হাউজও একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয় মালদ্বীপ পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং এজন্য উদ্বেগ জানিয়েছেন।


বৃহত্তম আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে, ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে ভারত।

নাশিদ ভারতের কাছে যে সামরিক সাহায্য চেয়েছেন, সেটার একটা ঐতিহাসিক অতীত রয়েছে। ১৯৮৮ সালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে ভারত একদল ভাড়াটে ও বিদ্রোহীদের ক্যু প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়। ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের দ্বিপাক্ষিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিদান হিসেবে মালদ্বীপ ‘ভারত প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেছে।

 

 

আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় এবং মালদ্বীপের প্রধান আঞ্চলিক সহযোগী হিসেবে ভারতের ভূমিকা সম্প্রতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভারতে চীন-পন্থী হিসেবে পরিচিত ইয়ামিন যখন ভারত মহাসাগরে মালদ্বীপের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে এক শক্তির সাথে অন্য শক্তির দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দিয়েছে, তখনই এ সমস্যার শুরু হয়েছে।


মালদ্বীপে চীনের স্বার্থ মূলত অর্থনৈতিক। চীনের প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সাথে মালদ্বীপও যুক্ত হয়েছে। ২০১৪ সালে চীন এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শুরু করে, যেগুলো চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো বাস্তবায়ন করছে। মূলত দুটো বড় প্রকল্পে মনোযোগ দিয়েছে তারা। একটা হলো ব্রিজ যেটার নির্মাণকাজ এখন চলছে। রাজধানী মালের সাথে আরেকটি দ্বীপ যুক্ত হবে এই ব্রিজের মাধ্যমে। আরেকটি হলো রাজধানীর বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ কাজ। এটার কাজও ২০১৪ সালে একটি চীনা কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। চীনা একটি এন্টারপ্রাইজের কাছে ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্য মালদ্বীপের একটি জনশূণ্য দ্বীপকে (ফেইধু ফিনোলহু) ৫০ বছরের জন্য লিজও দিয়েছে মালদ্বীপ। এই দ্বীপটিতে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর, চীন ও মালদ্বীপ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে।


২০১৪ সালে দেশের বাইরে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে ভারতে আসেন ইয়ামিন। সেখানে তিনি বলেন, চীনের সাথে মালদ্বীপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও কোন সম্পর্কই ভারতের সাথে সম্পর্ককে ছাপিয়ে যাবে না, কারণ এই সম্পর্ক অনেক বেশি মূল্যবান। তবে, তার কাজের সাথে ওই কথার মিল পাওয়া যায় না। এ মুহূর্তে মালদ্বীপের যে জাতীয় ঋণের পরিমাণ, তার ৭০ শতাংশই হলো বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য চীন থেকে নেয়া ঋণ। নির্বাসনে যাওয়ার পর থেকেই নাশিদ অভিযোগ করে আসছেন যে, ইয়ামিন সরকার চীনাদের মালদ্বীপের দ্বীপ, প্রধান অবকাঠামো এবং এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও দখলের ব্যাবস্থা করে দিচ্ছে। তার বিবেচনায় এটা যে শুধু মালদ্বীপের স্বাধীনতাকেই খাটো করছে, তা নয় বরং পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এটা উদ্বেগের বিষয়। নাশিদের অভিযোগকে অবশ্য ‘চরম অবাস্তব’ হিসেবে নাকচ করে দিয়েছে চীন।

 


গত মাসে মালদ্বীপে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক হার্শ প্যান্ট ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশান্সকে বলেন, “ভারতের সুযোগ এখন অনেক সীমিত হয়ে গেছে। ”


প্যান্ট বিশ্বাস করেন যে, বর্তমান সঙ্কটে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ভারতের আঞ্চলিক শক্তির মর্যাদা অনেকটাই মেঘে ঢাকা পড়েছে। তিনি বলেন, ভারত এখন যেটা করতে পারে সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং সৌদি আরবের মতো বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে মালদ্বীপের উপর চাপ সৃষ্টি করা। যে দেশটি বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের উপর ভিত্তি করে টিকে আছে, তাদের উপর এ ধরনের চাপ ফলপ্রসু হতে পারে।


সুনয়না কুমার একজন ভারতীয় সাংবাদিক। ড. অ্যাঞ্জেলা স্ট্যানজেল ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশান্সের এশিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র পলিসি ফেলো।

 


সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top