কিশোরী ক্লাবের কোমলমোতিরাই রুখে দিলো বাল্য বিয়ে | daily-sun.com

কিশোরী ক্লাবের কোমলমোতিরাই রুখে দিলো বাল্য বিয়ে

ডেইলি সান অনলাইন     ২৪ আগস্ট, ২০১৬ ১৮:২৬ টাprinter

কিশোরী ক্লাবের কোমলমোতিরাই  রুখে দিলো বাল্য বিয়ে

 

 

‘আমার অনেক স্বপ্ন। লেখাপড়া শেষ করে স্বনির্ভর হয়ে আমি বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। অথচ কিছুদিন আগে আমার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিশোরী ক্লাবের বন্ধুরা না থাকলে যে কি হতো! ভাবতেই আমার গা শিহরিয়ে উঠে।’- এ কথাগুলো বলেছিল রেশমা খাতুন। 

 

রেশমার বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার চিৎলা গ্রামে। বাবা আব্দুর রাজ্জাক এবং মা রোকসানা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় রেশমা। 

 

অভাব-অনটনের সংসারে মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার সমস্ত বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন রাজ্জাক মিয়া। রেশমা নবম শ্রেণির ছাত্রী। বিয়ের খবর মায়ের কাছ থেকে শুনে সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েছিল। উৎকণ্ঠিত রেশমা তার হতাশার কথা ‘চিৎলা উজ্জীবিত কিশোরী ক্লাবের’ বন্ধুদেরকে জানায়। বন্ধরা মিলে সিদ্ধান্ত নেয় এই বিয়ে যে ভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে। কারণ তারা কিশোরী ক্লাবে বাল্য বিয়ের কুফল সম্পর্কে জানতে পেরেছে। পরিকল্পনা মাফিক কিশোরী ক্লাবের বন্ধুরা রেশমার বাবা-মায়ের কাছে বাল্য বিয়ের নানবিধ কুফল তুলে ধরল।

 

এ বিষয়ে কিশোরী ক্লাবের সদস্য বন্যা বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের কিশোরী ক্লাবের ১৯ জন বন্ধু মিলে খালা-খালুকে (রেশমার বাবা-মা) বোঝাই। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে যে নানারকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে তা বুঝিয়ে বলি। আমরা তাদেরকে এটা বোঝাতে সক্ষম হই, রেশমার বিয়ে বন্ধ করে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে পরিবারসহ সবার জন্য ভালো হবে। চিৎলার কিশোরীদের এই সাহসী উদ্যোগ বৃথা যাইনি। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর রেশমার বাব-মা মেয়ের কল্যাণের জন্য পরিকল্পিত বিয়ে ভেঙে দেন। বেঁচে যায় একটিম মেয়ে এবং তার পরিবারের ভবিষ্যৎ। সাথে সাথে সৃষ্টি হয় এই এলাকায় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। চিৎলার কিশোরীদের এই সাফল্য গাঁথা আর তার বাবা-মায়ের এই সংবেদনশীলতার গল্প এখন সবার মুখে মুখে।’

 

এ প্রসঙ্গে রেশমার বাবা বলেন, ‘কি ভুলটাই না করতে গেছিলাম। আমার ওতোটুকুন মেয়ে। আমরা মূর্খ-সুর্খ মানুষ এতো কি আর জানি। ওই ক্লাবের মেয়েরা বুঝিয়ে বললে আমরা বাল্য বিয়ের খারাপ দিকগুলো জানতে পারি। সব জেনে শুনে নিজের মেয়ের সর্বনাশ করতে চাইনি। আমি চাই ও লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক।’

 

জানা গেছে, রেশমা এখন পুরোদমে আসন্ন মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চোখে-মুখে স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞার প্রতিফলন। 

 

এ ঘটনার পর হাসতে হাসতে রেশমা বলে, কিশোরী ক্লাবের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। এখান থেকে যেমন আমরা জেনেছি আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে, তেমনি সেই জ্ঞান আমরা ছড়িয়ে দিচ্ছি আমাদের বাবা-মা, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের মধ্যে।

এ ব্যাপারে পিকেএসএফর উজ্জীবিত প্রকল্পের সমন্বয়কারী এ কে এম নূরুজ্জামান বলেন, কিশোরীদের অপরিণত বয়সে বিয়ের মধ্য দিয়ে একদিকে তাদের স্বপন যেমন থমকে যায় অপরদিকে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ সমস্যা উত্তরণে বাল্য বিবাহ বন্ধ করা খুব জরুরী। এক্ষেত্রে ‘চিৎলা উজ্জীবিত কিশোরী ক্লাব’ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। সামনের দিনগুলোতে কিশোরী ক্লাব গঠনের মাধ্যমে গ্রামাষ্ণালে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আন্দোলন আরও বেগবান করা হবে”।

 

উলেখ্য, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন উজ্জীবিত প্রকল্পের আওতায় খুলনা বিভাগের পাঁচটি জেলায় ৪৫টি কিশোরী ক্লাব রয়েছে। এই ক্লাবসমূহ কিশোরীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ মেয়েদের বিষয়ে নানা সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে।

 


Top