“নারীর অগ্রগতি সকলেরই অগ্রগতি” | daily-sun.com

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৮ উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস এর অপ-এড

“নারীর অগ্রগতি সকলেরই অগ্রগতি”

প্রেস রিলিজ     ১০ মার্চ, ২০১৮ ১৯:৪০ টাprinter

“নারীর অগ্রগতি সকলেরই অগ্রগতি”


নারীর অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে আমরা অবস্থান করছি । ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত যে অসমতা নিপীড়ন ও বৈষম্যের পথ সুগম করেছে, তা এর আগে এতটা প্রকাশ্য হয়নি।

লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ হয়ে এশিয়া, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে, চলচ্চিত্র নির্মাণে, কারখানায়, সড়কে যে যৌন নিপীড়ন, হয়রানি ও বৈষম্য হচ্ছে, তার প্রতি শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন এবং স্থায়ী পরিবর্তনের আহবান জানাচ্ছে নারীরা ।



লিঙ্গ সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়ন আমাদের সময়ের অসমাপ্ত একটি কাজ এবং এটি আমাদের এই বিশ্বে মানবাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে নারীদের সক্রিয়তা ও প্রচারের ইতিবাচক ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে । আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন আরও বেশি মেয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে; আরও বেশি নারী পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করছে এবং বেসরকারি খাত, শিক্ষা, রাজনীতি এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর জ্যেষ্ঠ ভূমিকায় রয়েছে নারীরা । অসংখ্য আইনে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে এবং লিঙ্গচ্ছেদ ও বাল্যবিবাহ বহু দেশেই বেআইনি ঘোষিত  হয়েছে ।



তবে গুরুতর বাধাগুলো রয়ে যাবে যদি আমরা ঐতিহাসিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা চিহ্নিত না করি, যেগুলো বৈষম্য ও শোষণকে জোরালো করেছে ।

বিশ্বজুড়ে এক’শ কোটিরও বেশি নারী পারিবারিক যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত । বৈশ্বিকভাবে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর পার্থক্য ২৩ শতাংশ, যা প্রত্যন্ত এলাকায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় । আর নারীর বিনাপারিশ্রমিকের বহু কাজই অস্বীকৃত রয়ে যায় । জাতীয় আইনসভায় (পার্লামেন্ট) নারীর প্রতিনিধিত্ব গড়ে এক চতুর্থাংশেরও কম, আর সিদ্ধান্তকমিটিতে তা আরও কম । সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তী দশকে আরও লাখো মেয়েশিশু ও কিশোরী জননেন্দ্রীয়ে ছেদের শিকার হবে ।



যেখানে আইন রয়েছে, সেখানে প্রায়ই তা উপেক্ষিত হয় এবং যে নারীরা আইনি প্রতিকার প্রত্যাশা করে, তাদের সন্দেহ ও হেয় করা হয় এবং তাদের অভিযোগ খারিজ করে দেওয়া হয় । আমরা এখন জানি, লিঙ্গ সমতার রেকর্ড যেসব দেশকে গর্বিত করে, সেসব দেশের কর্মক্ষেত্রে, সর্বসাধারণের চলাচলের জায়গায়, ব্যক্তিগত বাসা বাড়িতে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন ক্রমেই বাড়ছে ।



জাতিসংঘের উচিত বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ সৃষ্টি করা ।

আমি স্বীকার করি, সবসময়ই এমনটা হচ্ছে না । গত বছর আমার মেয়াদ শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘের সদরদপ্তরে, আমাদের শান্তিরক্ষা মিশনে এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের কার্যালয়গুলোতে আমি কিছু পরিবর্তন এনেছি।

আমরা এখন আমাদের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা দলে প্রথমবারের মতো লিঙ্গ সমতা আনতে পেরেছি এবং পুরো সংঘেই এই সমতা অর্জনের বিষয়ে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার ব্যাপারে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রতিবেদন ও জবাবদিহিতার উন্নয়নে সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি । শান্তিরক্ষা মিশনে যৌন শোষণ ও নিপীড়ন চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করতে এবং ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা দিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমরা নিবীড়ভাবে কাজ করছি ।



আমরা যারা জাতিসংঘে আছি, তারা সবাই বিশ্বজুড়ে যে নারীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে- প্রত্যন্ত এলাকায় যে নারীরা পারিশ্রমিকের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ছে, নগরের যে নারীরা পরিবর্তনের জন্য সংঘবদ্ধ হচ্ছে, শোষন ও নিপীড়নের ঝুঁকিতে থাকা নারী শরণার্থী, অথবা যে নারীরা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে : বিধবা, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার নারী, প্রতিবন্ধী নারী এবং যেসব নারীর ক্ষেত্রে লিঙ্গের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসৃত হয়নি- আমরা তাদের সবার পাশে রয়েছি ।



টেকসই উন্নয়ন ২০৩০ সালের লক্ষ্যের কেন্দ্রে রয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন । টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় উন্নতির অর্থ হলো, সকল ক্ষেত্তে সকল নারীর উন্নয়ন । ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে নেওয়া এই উদ্যোগ সমতা প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেবে ।

আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, নারীর প্রতি এটি কোনো অনুগ্রহ নয় । লিঙ্গ সমতা মানবাধিকারের বিষয় হলেও পুরুষ ও বালক, নারী ও বালিকা- সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য । নারীর প্রতি লিঙ্গ অসমতা ও বৈষম্য আমাদের সবার জন্যই ক্ষতিকর ।



এমন প্রচুর প্রমাণ রয়েছে যে, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, এমনকি দেশের উন্নয়নে নারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর উপায় । নারীর অংশগ্রহণে শান্তিপ্রক্রিয়া আরও দৃঢ়, সমাজ আরও প্রাণবন্ত এবং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে । যেখানে নারীরা বৈষম্যের শিকার, সেখানে অনেক সময়ই আমরা দেখি এমন সব নিয়ম ও বিশ্বাসের প্রাধান্য যা সবার জন্য ক্ষতিকর । মাতৃত্বকালীন ছুটি, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন এবং সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার আইন সবাইকে লাভবান করে ।



নারীর অধিকার নিশ্চিত করার এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে- নারীর পাশে পুরুষের দাঁড়ানো, তাদের কথা শোনা এবং তাদের থেকে শেখার উপযুক্ত সময় । নারীর পূর্ণ সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে এবং আমাদের সবার উন্নয়নে, গোষ্ঠী, সমাজ ও অর্থনীতির বিকাশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জরুরি ।

আমি গর্বিত এই আন্দোলনের অংশীদার হতে পেরে এবং আমি আশা করছি, জাতিসংঘ ও বিশ্বজুড়েই এর অনুরণন অব্যাহত থাকবে ।

 
 

Top