পশ্চিমা আচরণে হতভম্ব সু চি, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছেই | daily-sun.com

পশ্চিমা আচরণে হতভম্ব সু চি, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছেই

ডেইলি সান অনলাইন     ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১৫:০২ টাprinter

পশ্চিমা আচরণে হতভম্ব সু চি, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছেই

 

জাতিগত দাঙ্গা বন্ধে ব্যর্থতার জন্য জাতিসংঘে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যে জোর প্রচারণা চলছে, সেটা পরিবর্তনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এই জাতিগত দাঙ্গার কারণে নিজেদের রোহিঙ্গা বলে পরিচয় দেয়া মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ মুসলিম পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়া বরাবর মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোরও সমর্থন পেয়েছে মিয়ানমার।


পশ্চিমের আচরণে হতভম্ব হয়ে গেছে মিয়ানমারের বেসামরিক নেতৃবৃন্দ। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে তারা। বেসামরিক নেতারা মনে করছেন, তাদের সাথে বড় ধরনের প্রতারণা করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘের ক্রমবর্ধমান সমালোচনা, যারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান পরিচালনার অভিযোগ এনেছেন। মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দূত ইয়াঙ্গি লি সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাখাইন পরিস্থিতির মধ্যে গণহত্যার সমস্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ এবং এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর বাইরে চরমভাবে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে মিয়ানমার।


তবে অন্যরা – বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর ষড়যন্ত্র-কেন্দ্রীক ব্যাখ্যা রয়েছে।

তারা পুরো বিষয়টিকে দেখছে আন্তর্জাতিক ইসলামী ষড়যন্ত্র হিসেবে, যেখানে নেতৃত্বে রয়েছে অর্গানাইজেশান অব ইসলামিক কান্ট্রিজ (ওআইসি)। মুসলিমদের কর্তৃত্ব আরও পূর্বে বিস্তৃত করার জন্য মিয়ানমারের গোষ্ঠীগত বিরোধকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেহেতু সিরিয়ার মতো অন্যান্য জায়গায় তারা দখল হারাচ্ছে। এতে করে মিয়ানমার সরকার এবং সামরিক বাহিনী মনে করছে, তারা এক ধরনের অবরোধের মধ্যে পড়ে গেছে।


এখন সরকার ও সামরিক বাহিনী উভয়েই তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিশেষ করে পশ্চিমের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারে “বাঙ্কারে আশ্রয় নেয়ার মানসিকতা” গ্রহণ করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার সরকার বুঝতে পারছে যে, এই সময়টাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা তাদের আরও বেশি দরকার, বিশেষ করে যখন রাখাইন রাজ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং উন্নয়নের ধারা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।


তবে অন্তত স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির মধ্যে কিছুটা এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে যে, মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সংলাপে বসতে হবে। এখন যেটা দরকার, সেটা হলো একজন মধ্যস্থতাকারী। গত নভেম্বরে নেপিদোতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন অং সান সু চিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এ কাজের জন্য একটি কন্টাক্ট গ্রুপ গড়ে তুলতে। তার পরামর্শ ছিল, এ কাজে সু চি আসিয়ানকে কাজে লাগাতে পারেন। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়াকে নিয়ে কন্টাক্ট গ্রুপ গড়ে তুলতে পারেন। এই প্রস্তাবকে অবশ্য গ্রহণযোগ্য মনে করেননি সু চি, কারণ আরাকান নিয়ে মালয়েশিয়ার সাথে সম্পর্ক এখন খুবই নাজুক পর্যায়ে।


এরপরও, থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরাকিয়ার্ত সাথিরাথাইয়ের নেতৃত্বে একটা আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গ্রুপ গড়ে তুলেছেন অং সান সু চি। প্রায় এক বছর তদন্তের পর রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কোফি আনান এবং তার টিম যে সুপারিশ করেছিলো, সেগুলো বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য এই উপদেষ্টা গ্রুপের সাথে মতবিনিময় করেন সু চি। উপদেষ্টা গ্রুপে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি স্থানীয় বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন।


টিমের অন্যান্য আন্তর্জাতিক সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রোয়েলফ পেট্রাস মেয়ের, সুইডিশ পার্লামেন্টের স্পিকার উরবান আহলিন এবং ব্রিটিশ লেবার দলের রাজনীতিক ও চিকিৎসক অধ্যাপক লর্ড আরা ডারজি। উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিয়ানমারের পাঁচজন জাঁদরেল নাগরিকও রয়েছেন এই টিমে, যাদের মধ্যে আছেন মিয়ানমারের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব।


সাউথ এশিয়ান মনিটরের সাথে সাক্ষাতকারে থাইল্যান্ডের দূত আশাবাদ জানান যে, এই গ্রুপটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার, আঞ্চলিক সরকার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। এবং বিশেষ করে জাতিসংঘ, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং সিস্টেমের সাথে যত দ্রুত সম্ভব অংশ নিতে হবে। তবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘের জন্য স্থানীয় সীমাবদ্ধতা, বাস্তব পরিস্থিতি এবং সরকারের সীমাবদ্ধতা বোঝাটাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটা হতে হবে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার এবং জাতিসংঘের (এবং সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়) মধ্যে একটা পারস্পরিক আলোচনা।


কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে ক্রমাগত নতুন নতুন প্রমাণ সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন রাজ্যে গত অগাস্ট থেকে নিয়ে কি ঘটেছে, মূল সহিংসতার কারণ এবং এর পরের সামরিক তৎপরতা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়াটা মিয়ানমারের সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং পশ্চিমের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক পুনস্থাপনের জন্য জরুরি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেট কাউন্সিলরকে খোলামেলা বলেছেন, মিয়ানমার যদি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক পুনস্থাপন করতে চায়, তাহলে একটা নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত করাটা জরুরি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনও সম্প্রতি মিয়ানমার সফরকালে অং সান সু চি’কে একই কথা বলেছেন।


এই ধরনের আন্তর্জাতিক দাবিকে সবসময় প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন সু চি। টিলারসন ও জনসনকেও একইভাবে জবাব দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, এটা বাস্তবসম্মত নয় এবং সরকার তার নিজের তদন্ত নিজেই করবে। গত বছরের মার্চে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল যে বিশেষ আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গঠন করে, তাদের মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার। যদিও এতে তাদের তদন্ত থেমে থাকেনি। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে কথা বলে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে তারা। মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে সর্বশেষ রিপোর্ট জমা দেওয়ার আগে জাতিসংঘের বিশেষ দূতকেও সম্প্রতি মিয়ানমারে ঢুকতে দেয়া হয়নি।


কিন্তু রাখাইনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এভাবে বারবার প্রতিরোধ করতে পারবে না মিয়ানমার সরকার। বিশেষ করে যখন গণকবরের অভিযোগ বেড়েই চলেছে। অন্তত একটি গণকবরের প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে দুজন রয়টার্সের সাংবাদিকদের মাধ্যমে, যাদেরকে এখন ঔপনিবেশিক যুগের অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টস লঙ্ঘন করে ছবি তোলার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। সামরিক বাহিনী তৎপর হয়েছে এবং ১৬ জনেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে তারা, এদের মধ্যে সাতজন সেনাসদস্য এবং তিনজন পুলিশও রয়েছে, যারা গণহত্যায় জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কিন্তু এতে করে নিরপেক্ষ স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তা মিটবে না। সবচেয়ে কম করে হলেও মৃতদেহগুলোর বিশ্বাসযোগ্য এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ময়না তদন্ত করা উচিত যাতে বোঝা যায় তারা কারা এবং কিভাবে নিহত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং থাইল্যান্ড উভয় দেশেরই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কেউই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলবে না।


পশ্চিমের সাথে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রশ্নে একটা মাঝামাঝি অবস্থানে আসতে হবে। এটা কার্যকরের জন্য তদন্ত কমিটিকে মিয়ানমার সরকারের কর্তৃত্বাধীন থাকতে হবে এবং সামরিক বাহিনীর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। ইয়াঙ্গুনের সিনিয়র কূটনীতিকরা পর্দার পেছনে মাথা ঘামাচ্ছেন এবং একটা উপায় বের করেছেন যেটাতে কাজ হতে পারে বলে মনে হচ্ছে: আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি তথ্যানুসন্ধানী টিম গঠন করা।


সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যে পরামর্শটি বিবেচনা করা হচ্ছে, সেটা হলো টিমে তিনজন আন্তর্জাতিক ও দুজন দেশী প্রতিনিধি থাকবেন। মিয়ানমার সরকারের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে বাছাই করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের ব্যাপারে ভেটো দিতে পারে তারা।


একদিকে সাধারণভাবে মিয়ানমারের সাথে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক পুনস্থাপনের জন্য এটা সবচেয়ে বড় বাধা। অন্যদিকে, মিয়ানমারের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত নিয়োগের বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দূত বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অ্যান্টনিও গিটারেসের মনোভাব নিয়ে মিয়ানমার সরকার এখনও সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। সরকার মনে করছে, জাতিসংঘ মহাসচিবের মাথায় এখনও শরণার্থীদের বিষয়টি রয়ে গেছে এবং আগে তিনি ইউএন হাইকমিশনার ফর রেফিউজিসের (ইউএনএইচসিআর) যে পদে ছিলেন, সেখান থেকে মহাসচিব পদে পদোন্নতির মানসিক রূপান্তর তার এখনও হয়নি। কিন্তু জাতিসংঘের সাথে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নিয়োগ অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।


জাতিসংঘের ভেতরের সূত্রগুলো মনে করছে যে, বাছাই প্রক্রিয়া অনেক ছোট হয়ে এসেছে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে এখন তালিকায় রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড, সাবেক তিমুর লেস্টের নেতা রামোস হোর্তা, ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুশিলো বামবাং ইউধোয়োনো এবং জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের বর্তমান প্রধান এবং পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফরি ফেল্টম্যান।


লেখক: ল্যারি জ্যাগান


সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম 

 


Top