দীর্ঘ সময় ঘুমানো নাকি গভীর ঘুম কোনটি বেশি প্রয়োজন? | daily-sun.com

দীর্ঘ সময় ঘুমানো নাকি গভীর ঘুম কোনটি বেশি প্রয়োজন?

ডেইলি সান অনলাইন     ১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১৮:১৭ টাprinter

দীর্ঘ সময় ঘুমানো নাকি গভীর ঘুম কোনটি বেশি প্রয়োজন?

আমরা প্রায়ই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু আপনি জানেন কি বিষয়টি আপনার জন্য উপকারীও হতে পারে।

বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে উত্তরোত্তর এটাই প্রমাণিত হয়ে চলেছে যে মানুষের টানা আট ঘণ্টা ঘুমানোর অভ্যাসটি স্বাভাবিক নয় এবং অপ্রাকৃতিক।

 

শিল্পবিপ্লবের পর মানবজাতির স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিন ব্যাপকভাবে বদলে গিয়েছে। ফলে ইউরোপ সহ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এখন অ-প্রাকৃতিক এবং অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছে! এমনটাই মত বিজ্ঞানীদের।

 

বিজ্ঞানীদের মতে, রাতের প্রথম অংশে ঘুমাতে না পারলে ঘুমের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। অর্থাৎ, রাতের প্রথম অংশে ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমানো আর রাতের শেষ অংশ থেকে দুপুর পর্যন্ত ৭/৮ ঘণ্টা ঘুমানো একই কথা। 'একটানা ৭/৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হয়' বলে যে কথাটি এখন সমাজে প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। ঘুম নির্ভর করে গুণগত মানের ওপর, পরিমাণের ওপর নয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর রজার ইকার্চ এ নিয়ে একটি চমৎকার বই লিখেছেন। নাম At Day's Close : Night in Times Past

রজার ইকার্চ ১৬ বছর গবেষণা করে এ বইটি লেখেন। তাঁর মতে, অতীতের মানুষেরা সন্ধ্যার পর অর্থাৎ সূর্যাস্তের দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তেন। এরপর, ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমাতেন। তারপর, ঘুম থেকে উঠে ১ থেকে ২ ঘণ্টা ধর্মীয় উপাসনা বা ইবাদত অথবা ব্যক্তিগত কাজ করতেন। তারপর, আবার কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমাতেন। এবং সকালে তাড়াতাড়ি উঠে যেতেন।

 

এ কথাটি প্রমাণ করার জন্যে রজার ইকার্চ তাঁর বইতে ৫০০টি ঐতিহাসিক রেফারেন্স দেন। ক্লাসিক্যাল বিভিন্ন সাহিত্যের বই, মেডিক্যাল বই, আদালতের নথিপত্র, নৃতাত্ত্বিক তথ্য ও ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ থেকে তিনি প্রমাণ করেন যে, আগেকার মানুষরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন না; এবং একটানা ৭ বা ৮ ঘণ্টা ঘুমাতেন না। আগেকার মানুষরা প্রকৃতির সাথে সাথে ঘুমিয়ে যেতেন, প্রকৃতির সাথেই জেগে উঠতেন। মাঝখানে দু-এক ঘণ্টার জন্যে জেগে স্রষ্টার উপাসনা বা ইবাদত করতেন অথবা ব্যক্তিগত কোনো কাজ সেরে নিতেন। এটাই ছিল মানুষের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘুমের অভ্যাস।

 

কিন্তু, সুস্থ-স্বাভাবিক এই ঘুমের অভ্যাসটি ধ্বংস হতে শুরু করে ১৭ শতাব্দীর শেষের দিকে। যখন শিল্পবিপ্লব শুরু হয়। ১৬৬৭ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় প্রথম মোমবাতি লাগানো শুরু হয়। ২ বছর পর তেলের বাতি আবিষ্কার হয়। এরপর, লন্ডন সহ ইউরোপের প্রায় ৫০টি শহরের রাস্তায় রাস্তায় তেলের বাতি লাগানো শুরু হয়। উদাহরণ স্বরূপ Leipzig নামক জার্মানের ছোট্ট একটি শহরের কথা উল্লেখ করা যাক। এই শহরে মাত্র ১০০ জন মানুষ কাজ করত। কিন্তু শহরটির বিভিন্ন রাস্তায় ৭০০টি বাতি বসানো হয়েছিল।

 

এসব কৃত্রিম আলো সৃষ্টি করার কারণে মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিনটি বদলে যায়। মানুষ আস্তে আস্তে ভাবতে শুরু করল যে, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া মানে হলো সময় অপচয় করা। দিনের কাজ দিনের আলোর মধ্যে শেষ করে ফেলার যে তাড়না অতীতের মানুষের মধ্যে ছিল, তা আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে অলসতা ও বিলাসিতা চলে আসে। দিনের কাজ দিনের আলোর মধ্যে শেষ না করে মানুষ তা রাতের জন্যে রেখে দিত। ফলে অনিবার্য কারণেই রাতের ঘুমটি দিনের আলোর মধ্যে প্রবেশ করল, এবং মানুষ তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিনটি হারিয়ে ফেলল।

 

১৯২০ সালের দিকে এসে শহরের মানুষ তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক ঘুমের নিয়মটি একেবারেই ভুলে গেল। সূর্যাস্তের ২/৩ ঘণ্টা পর ঘুমিয়ে যাওয়া, ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমানোর পর দু-এক ঘণ্টার জন্যে রাত জেগে ধর্মীয় উপাসনা বা ইবাদত অথবা ব্যক্তিগত কাজ করা, এরপর আবার কিছুক্ষণের জন্যে দ্বিতীয় ঘুম দেওয়া, তারপর দিনের আলো আসার সাথে সাথে আবার জেগে ওঠা- এ নিয়মগুলো তখন মানুষের কাছে কাল্পনিক মনে হতে লাগল।

 

রাতের ঘুম চলে আসলো দিনের আলোতে, এবং দুই বা ততধিক ঘুমের পরিবর্তে মানুষ একটি ঘুমের অভ্যাস করে ফেলল। মানুষ তাদের প্রাকৃতিক অভ্যাস ত্যাগ করল, ফলে প্রকৃতিও মানুষের সাথে বিদ্রূপ আচরণ শুরু করল। দিনের বেলা ঝিমুনি, মাথাব্যথা, হতাশা, কাজে অমনোযোগ, অলসতা, দুর্বলতা, অযথা রাগান্বিত হওয়া সহ নানা কিছু মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হলো।

 

১৯৯০ সালে সাইকোলজিস্ট থমাস ওয়েহর (Thomas Wehr) একদল মানুষের ওপর গবেষণা পরিচালনা করেন। ওই মানুষদেরকে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হতো। এভাবে এক মাস রাখা হলো। ফলে, তাদের ঘুমের অভ্যাসটি পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পর পরই ঘুমিয়ে পড়ত, ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ১/২ ঘণ্টার জন্যে জেগে থাকত। এরপর আবার দ্বিতীয় ঘুম দিত, এবং সূর্যোদয়ের আগেই জেগে উঠত। এই গবেষণাটির পর ঘুম বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘুমের রুটিন এটাই।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম একজন 'ঘুম বিশেষজ্ঞ' হলেন Dr Charles Czeisler। তাঁর মতে, ঘুম হচ্ছে সবচেয়ে ভালো এবং উপকারী ওষধের নাম। সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের জন্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘুমানো উচিত। অবশ্যই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো উচিত। এবং দুপুরের পর কিছুক্ষণ ঘুমানো উচিত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দুইবার ঘুমানো উচিত।

 

চার্লস সিজলার এর মতে, সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরপরই মানুষের ঘুমের হরমোনগুলো কাজ করতে শুরু করে। মানুষ যদি রাতের প্রথম অংশ না ঘুমায়, তাহলে ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও বিষণ্ণতা সহ অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। রাতের প্রথমাংশে ঘুমালে খুব সহজে এসব অসুখগুলো শরীরে দানা বাঁধতে পারে না।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম ফাউন্ডেশন এর তথ্য অনুযায়ী, মানুষ রাতের প্রথমাংশে না ঘুমানোর প্রধান কারণ হলো ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ই-রিডার, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং টেলিভিশন জাতীয় টেকনোলোজিক্যাল পণ্য সমূহের ব্যবহার। ভালোভাবে ঘুমানোর লক্ষ্যে সূর্যাস্তের সাথে সাথেই এসব টেকনোলোজিক্যাল পণ্য সামগ্রীর ব্যবহার থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত।

 

স্মার্টফোনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আসক্তি নিয়ে মনোবিজ্ঞানী Jean M. Twenge একটি চমৎকার গবেষণামূলক বই লিখেন। বইটির নাম iGen অর্থাৎ 'ইন্টারনেট প্রজন্ম'। তাঁর মতে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্ম অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যে বয়সে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার কথা ছিল, সে বয়সে তারা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাচ্ছে না। এবং ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সুস্থ-স্বাভাবিক সামাজিক আচরণেও অভ্যস্ত হতে পারছে না। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন যে, ই-প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা রাত জেগে স্মার্টফোন ব্যবহার করছে, ফলে তারা নিয়মিত ও যথেষ্ট ভালো মানসম্পন্ন ঘুম ঘুমাতে পারছে না।

 

জিন টুইঙ্গের মতে, ইন্টারনেট প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যতবেশি সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করছে, ততবেশি তারা অসুখী, একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা অনুভব করছে, এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।
সূত্র : বিবিসি

 


Top